সাতকড়ি চুপ করে থাকে।
সাধুর চোখ জুলজুল করে–মাইরি, নিজের ঘরে আগুন দিলাম তবু কেউ বললে না, কাজটা মরদের মতো করেছে সাধু। একজনও তো বলবে!
–তুমি পাগলা আছ। নিজের ঘরে আগুন দিলে কী আর হাতিঘোড়া হয়!
–হয় সাতকড়ি হে, হয়। এই যে আমি নিজের ঘরে আগুন দিলাম, তার জন্যই এখন তোমার ঘর আমাকে বেঁধে দিতে হচ্ছে। আর তুমি বলছ, আমি সাধু বটে।
–বলছি। তোমার মনটা ভালো।
–এইরকম কত লোকের ঘর আমি এবার থেকে বেঁধে দিব। আর লোকে বলবে, লোকটা সাধু বটে। বুঝলে সাতকড়ি হে, যে লোকটা বসে থাকে না, সে দাঁড়ায়। দেখো, পরের ঘর বাঁধতে–বাঁধতে আমি একদিন ঠিক সাচ্চা সাধু হয়ে যাব।
সাপ
বাপ্পা তার বাবার সঙ্গে এই বাগানে এল। সে, তার বাবা আর রেনি।
শরৎকাল এখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বাগানের ফুল, ঘাসের রং আর রোদের তাপ থেকে তার আন্দাজ পাওয়া যায়। যে ঘাসগুলো বর্ষার জলে ঘন সবুজ হয়ে উঠেছিল তা এখন নিষ্প্রভ। এই রোদ, ঘাস আর ফুলের রং–সব কিছুই যেন স্তিমিত, নিঃশেষপ্রায়। আর এখন না-দুপুর না বিকেলের সময়টাতে সব কিছুই খুব নিস্তব্ধ। এই শব্দহীনতা যেন সরু সুতোয় ঝোলানো কোনও ভারী জিনিসের মতো দুলছিল। যেন একটু নাড়া পেলেই সুতো ছিড়বে, হরিণের মতো ত্রস্ত পায়ে নিঃশব্দ সময়টা পালাবে।
বাপ্পা জানে যে ইচ্ছে করলেই এই নিঃশব্দতাকে সে ছিঁড়ে দিতে পারে না। একেবারেই যে শব্দ নেই তা নয়। বাগানের নিষ্প্রভ চারাগাছগুলোর দীর্ঘ ছায়া পড়েছে ঘাসে। সেই আলোছায়ায় কয়েকটা মৌমাছি উড়ছিল। তাদের উড়বার শব্দ ঘড়ির শব্দের মতো একটানা, একঘেয়ে। সেই শব্দটাকে শব্দ বলে মনে হচ্ছিল না বাপ্পার।
এখন এই বাগানে লাল কাঁকরের রাস্তার ওপর বাবার হাত ধরে বেড়াতে তার বিশ্রী লাগছিল। রোজই লাগে। কেমন নিস্তেজ অবসন্ন বিকেল। যাই–যাই ভাব। এক্ষুনি আলোটুকু যাবে। অন্ধকার হয়ে আসবে একটু পরেই।
হাঁটতে-হাঁটতে বাপ্পা পথের পাশে সাজানো ত্রিভুজের মতো উঁচু হয়ে থাকা ইটগুলোকে দেখছিল। এক দুই করে গুনে যাচ্ছিল ইটগুলোকে। রেনি মাটি শুকতে–শুকতে এগিয়ে যাচ্ছিল। গেটের কাছে রেনি একবার থমকে দাঁড়াল। ফিরে তাকাল। এমনিভাবে ফিরে তাকালে রেনীর লম্বা সরু শরীরটা ধনুকের মতো সুন্দর একটা বাঁক নেয়। চাবুকের মতো সরু লেজটা আছড়ে পড়ছে পিঠের ওপর।
এবার একটা কিছু বলতে পেরে বাপ্পা বেঁচে গেল। বলল , ‘বাবা ওই দ্যাখো!’
–কী! বাবার গলাটা খুব গম্ভীর।
আঙুল উঁচু করে রেনিকে দেখিয়ে বলল বাপ্পা, ‘ওই দ্যাখো রেনি পালাচ্ছে।’
বাবার ভ্রূ দুটো জোড়া লাগল। ‘কোথায় পালাচ্ছে! ও তো গেটের ভিতরেই রয়েছে।’
–ও পালাবার পথ খুঁজছে। আর পালিয়ে গিয়ে ও যা–তা খেয়ে আসে। বাড়িতে এসে বমি করে।
সে ভেবেছিল এবার বাবা তার হাতটা ছেড়ে দিয়ে রেনিকে গিয়ে ধরবে। বকলশটা ধরে টানতে-টানতে বাবুর্চিখানার খালি ঘরটাতে নিয়ে বেঁধে রাখবে রেনিকে। সেই ফাঁকে বাপ্পা এক ছুটে গেটটা খুলে বেরিয়ে যাবে, দুই লাফে রাস্তা পার হয়ে ওপাশে শেখ-এর বাড়িতে পৌঁছে যাবে। সমশের হয় এখন মাটি কোপাচ্ছে নয়তো মুরগিকে দানা দিচ্ছে। যে অবস্থাতেই থাক, তার ঘাড়টা ধরে কাছে টেনে এনে বলবে, ‘রাত্রিতে আমার পড়ার ঘরে আসিস। দুজনে লুডো খেলব।’
কিন্তু বাবা কিছুই বলল না। তার বাঁ-হাতটা যেভাবে বাবার প্রকাণ্ড মুঠোটার মধ্যে ধরা ছিল সে ভাবেই রইল। তেমনিভাবেই আস্তে-আস্তে সে তার বাবার পাশে-পাশে হাঁটতে লাগল। বাবার পায়ের রবারের চটির কোনও শব্দ হচ্ছে না।
হাঁটতে-হাঁটতে তারা গেটের কাছে আসে। আবার ফিরে যেতে থাকে বারান্দার সিঁড়িটার কাছে। বাপ্পার পায়ের রবারের ‘সোল’ওয়ালা শ্য’টার কোনও শব্দ নেই।
কেমন যেন হাঁফ ধরল বাপ্পার। বলতে ইচ্ছে করল, ‘বাবা আমি আর পারছি না।’ বাবার মুঠোয় ধরা তার হাতটা ঘামছে। ঘামতে–ঘামতে কজিটা যেন গলে যাচ্ছে তার।
রোজই তাকে তার বাবার সঙ্গে এই বাগানে আসতে হয়। এমন দিন খুব কমই গেছে যেদিন সে বাবার সঙ্গে এই বাগানে আসেনি। বারান্দা পেরিয়ে চারটে সিঁড়ি ভেঙে লাল কাঁকরের পথ। পুরানো, চেনা পথ, চেনা বাগান, মরা–মরা গাছ, ঘাস। জানলা দিয়ে তাকিয়ে–তাকিয়ে এই দৃশ্যকে সে সারাদিন দেখে। বিকেলেও আবার এখানেই আসতে হয়। কখনও-কখনও গেট পেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে প্রকাণ্ড উদোম মাঠটার মধ্যে বাবার সঙ্গে গিয়েছে সে। সেই মাঠটার মধ্যে অনেকটা চলে গেলে তাদের বাড়িটাকে খুব সুন্দর ছোট্ট একটা ছবির বাড়ির মতো দেখায়। ওই মাঠটার মধ্যে খুব ছুটে বেড়াতে ইচ্ছে করে বাপ্পার। কিন্তু একা তার এই বাড়ির কম্পাউন্ডের বাইরে যাওয়া বারণ। সে একা-একা কখনও কোথাও যেতে পারে না।
এক সময়ে তার বাবা দাঁড়িয়ে পড়ল। নীচু হয়ে রাস্তার পাশে ডালিয়া গাছটাকে দেখতে লাগল।
বাবা গাছটা দেখছে। বাপ্পা দাঁড়িয়ে রইল। শুকনো ডালিয়া গাছটা কুঁকড়ে ছোট্ট হয়ে গেছে। গাছটা মরেই গেছে। অস্ফুট স্বরে বাবা বলল , ‘আহা মরেই গেল গাছটা! রাখা গেল না।’
বাবা গাছটাকে দেখতে লাগল। বাপ্পা জানে এখন অনেকক্ষণ ধরে বাবা গাছটাকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখবে। আর ততক্ষণ তার কজিটা বাবার মুঠোর মধ্যে ধরা থাকবে।
এখন, এইবার কবজিটা ব্যথা করে বাপ্পার। কেমন যেন অস্বস্তি। কতক্ষণ যে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে কে জানে! ওই একঘেয়ে মরা গাছটা বাবা এখন কতক্ষণ ধরে দেখবে কে জানে!
