এইবার? শান্তশীল দেখল তার স্টিলের বেডটা বেশ উঁচু। সে কি নামবে? পারবে নামতে? পড়ে যাবে না তো? উচিত হবে কি নামাটা?
আরও সাত দিন এই অবরোধে কাটানোটা অর্থহীন। তার বাবা মারা গিয়েছিল অনেক অনাদরে, প্রায় বিনা চিকিৎসায়, তার পরিবারের ডাক্তার ডাকার বা ওষুধ খাওয়ার রেওয়াজই ছিল না একটা সময়ে। তার দাদার করুণ মৃত্যুর কথা এখনও এত স্পষ্ট মনে পড়ে। কী হবে তার? মৃত্যুর বেশি আর কী হতে পারে?
শান্তশীল তার পায়জামা পরা পা–দুটো ঝুলিয়ে দিল নীচে। তারপর সামান্য দ্বিধাজড়িত কয়েকটা সেকেন্ড।
শান্তশীল মেঝের ওপর দাঁড়াল। হাঁটু ভেঙে পড়তে চাইছে। শরীরে একটা অদ্ভুত থরথরানি। বিছানায় ভর রেখেই সে এই দুর্বলতা সামাল দিল। হাঁটবার জন্য এখন তাই দুর্জয় সাহস। বুকের থরথরানি, শরীরের অভ্যন্তরে ঝিঝির ডাক, মাথার চক্কর এসব নিয়ে হাঁটবার চেষ্টা করাটাও যে বিপজ্জনক তা শান্তশীল জানে।
এক-পা এক-পা করে সে কয়েক পা এগিয়ে গেল। শরীরে তেমন ভারসাম্য থাকছে না। সে টলছে। সোজা যেতে গিয়ে বেঁকে যাচ্ছে। জানলার কাছ বরাবর এসে পরদাটা সরিয়ে বাইরে তাকাল। বেলা দশটার কাছাকাছি কি এখন? বা আর একটু বেশি? এ-ঘরে একটা দেওয়াল ঘড়ি আছে। কিন্তু সেদিকে তাকাল না সে। ক’টা বাজে জেনে তার লাভ কী? তার জানলার নীচেই একটা পার্ক, পার্কে জলাশয়। নিবিড় গাছপালা আছে চারদিকে।
শান্তশীল খানিকক্ষণ তৃষিতের মতো চেয়ে রইল সেই দিকে। একটা রাধাচূড়া গাছের তলায় বেঞ্চে ময়লা জামাকাপড় পরা একজন বুড়ো মানুষকে দেখতে পাচ্ছিল সে। বসে ঝিমোচ্ছে।
শান্তশীল ধীর পদক্ষেপে হেঁটে দরজার কাছে এল। সাবধানে দরজাটা খুলে দেখল করিডোর ফাঁকা। বাইরে বেরিয়ে এল শান্তশীল। দরজাটা সাবধানে ভেজিয়ে দিয়ে সিঁড়ি ধরে নামতে থাকল। নীচে। লিফট নিল না। দরকার কী?
সাত বা আটতলা থেকে নামারও কিছু পরিশ্রম আছে। শান্তশীল রেলিং–এ হাত রেখে নামতে লাগল। নামতেই লাগল। একটার পর একটা ধাপ। অশেষ। অনেক উর্দিপরা লোক তাকে দেখল। কয়েকজন নার্সও। কিন্তু কেউ কিছু বলল না। যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত। কারও তেমন সময় নেই।
খালি পায়ে নীচে নেমে এল শান্তশীল। বুক ভার, শরীরে অবসাদ, তবু তেমন কিছু ঘটল না তার শরীরে। কোনও বিস্ফোরণ নয়, কোনও যবনিকা নয়।
সামনে চমক্কার কংক্রিটের ড্রাইভওয়ে। ঢালু হয়ে নেমে গেছে রাস্তায়। শান্তশীল ধীর এবং দৃঢ় পদক্ষেপে পথটুকু পেরিয়ে রাস্তায় নামল।
চারদিকে জমজম করছে কলকাতা। অবারিত পৃথিবী। শান্তশীলের মাথার মধ্যে একটা পংক্তি আপনা থেকেই চলে এল, বন্ধন হোক ক্ষয়। রবীন্দ্র জয়ন্তীতে কতবার গানটা শুনেছে। কিন্তু মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল ওই একটি লাইন, বন্ধন হোক ক্ষয়…
শান্তশীল এত মুক্ত কোনওদিন বোধ করেনি। তার পকেটে একটি পয়সাও নেই, পায়ে জুতো। নেই, পরনে শুধু পায়জামা আর বুশ শার্ট গোছের। কয়েকদিন দাড়ি কামানো হয়নি। তাকে। কেমন দেখাচ্ছে কে জানে?
শান্তশীল যথেষ্ট সাহস বোধ করছে, আত্মবিশ্বাসও। শরীরের জড়তা কেটেছে, বুকের ভার ততটা অনুভব করছেনা। সে পায়ে-পায়ে পার্কটায় চলে এল। ফটক ঠেলে ঢুকে পড়ল ভিতরে।
একজন দারোয়ান গোছের লোক গম্ভীর মুখে এগিয়ে এসে বলল , ইঁহা ঘুসনা মানা হ্যায় জি।
শান্তশীল তর্ক করল না। বিনয়ের সঙ্গে বেরিয়ে এল। পার্কটাতেই যে তাকে ঢুকতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সে তো এখন সব দিকেই যেতে পারে। যেখানে খুশি। সুতরাং সে কিছু চিন্তা না করেই হাঁটতে লাগল।
একটু বাদেই সে যখন বুঝতে পারল যে বাড়ির দিকেই হাঁটছে তখন ইচ্ছে হল পথ পালটাতে।
পথ পালটাল শান্তশীল। কিন্তু কোন দিকে যাবে তা স্থির করতে মন চাইল না। উদাসভাবে হাঁটতে লাগল শুধু। দেখল, কোনও লাভ হচ্ছে না। তার অভ্যস্ত সংস্কার, তার জৈব চেতনা তাকে ঠিক নিয়ে যাচ্ছে একটা চেনা পথের দিকেই। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে।
বাড়ির দারোয়ান তাড়াতাড়ি উঠে একটা অভিবাদন জানাল।
সাব, তবিয়ৎ ঠিক তো হ্যায়?
হ্যাঁ।
সিঁড়ি ভেঙে ওঠা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে কি? তার অ্যাপার্টমেন্ট পাঁচতলায়। অনেকটা পথ হেঁটেছে শান্তশীল। অন্তত মাইলতিনেক। সে ঘামছে। একটু হাঁফ ধরেছে তার।
একটু ভেবে লিফটে উঠে দরজা বন্ধ করে দিল শান্তহীন। তারপর চোখ বুজে দম নিল শান্তভাবে।
কলিং বেল একবার মাত্র বাজাল সে। কেউ দরজা খুলল না। তাহলে কি মধুশ্রী এখনও ফেরেনি। কাজের মেয়েটা অবশ্য নেই, দেশে গেছে শুনেছে সে। তাহলে কি ফিরে যাবে শান্তশীল?
দরজাটা হঠাৎ সামান্য একটু ফাঁক হল। খুব সামান্য। একটা চোখ সেই ফাঁক দিয়ে তাকে বিদ্ধ করল।
তারপরই একটা ক্ষীণ ভয়ার্ত গলায় আর্তনাদ, কে?
শান্তশীল বুদ্ধের মতো শান্তভাবে চোখটার দিকে ঘুরে তাকাল। কিছু বলল না। চোখটা মধুশ্রীর। তাকে চিনতেও পারছে। তবু দরজাটা হাট করে খুলল না তো!
খুব ধীরে-ধীরে দরজাটা খুলল মধুশ্রী। তার চোখে অপার বিস্ময়।
তুমি! তুমি কী করে এলে?
শান্তশীল দেখল, মধুশ্রীর চুল এলোমেলো, পরনে তাড়াহুড়োয় চাপানো হাউসকোট, যার বোতামের–সঙ্গে–বোতামের ঘর ঠিকঠাক মেলেনি। বাঁ-গালে টাটকা একটা কামড়ের দাগ।
শান্তশীল ভদ্রভাবে চোখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে বলল , আমার আসবার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু কেন যে চলে আসতে হল। এর কোনও মানে হয় না।
