–ওই তো সাতকড়ি।
সাতকড়ির দৌড়োনোর দৃশ্যটা খুবই করুণ। সবাই ঘাড় ফিরিয়ে দেখল। ঘামে তেলতেলে মুখ, গালে বিজবিজে দাড়ি, জতে পাকা চুল, লটপটে নুলো হাতটা, ছেঁড়া গেঞ্জি, বুকের হাড়গোড়–সব মিলিয়ে ক্ষয়াভাব চেহারাতে। ভিড়টা সেই দৃশ্য দেখে খেপে গেল।
–নুলো সাতকড়ির ঘর কে বানিয়ে দেবে?
–দুটো লোক ঘরে ছিল, তুমি তাদের সুদু আগুন দিয়েছিলে। শালা খুনে।
–গভর্নমেন্টের জমি, বেদখল করে—মামাদোবাজি—
সাধু বিড়িটা ফেলে উঠে দাঁড়ায়। বিপদ। উত্তুরে হাওয়া টেনে দিয়েছে আগুনটাকে, কিন্তু হক কথা, সে সাতকড়ির দোকানে আগুনটা যাক–তা চায়নি, সে কথাটা ভালোভাবে বলবার আগেই পোড়েলদের বেঁটে ছেলেটা চড় কষাল।
পেটে ভালো খাবার পড়ে না বহুকাল, তার ওপর নেশাভাঙ। সাধু ঝিম হয়ে আবার বসে পড়ে। তারপর বেজায়গায় এক লাথি খেয়ে জমি নিল কোলবালিশের মতো। ধুলোয় গড়িয়ে চিৎকার করে বলল –মেরে ফেল, কেটে ফেলে দাও আগুনে–
–তাই দিচ্ছি। তার আগে বল, কেন আগুন দিয়েছিস—
সাধু ধুলোয় গড়ায়, আর লাথি খায়, আর বলে–নিজের ঘরে দিয়েছি, তাতে কার কী? আমার আগুন–
–তোর আগুন অন্যের ঘরে যায় কেন?
জটিল প্রশ্ন। যন্ত্রণার মধ্যে প্রশ্নটার জুতসই জবাব ভেবে পায় না সে। তবু মুখে রক্ত তুলে বলে –ওই শালারা কেন চানুকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছে? কেন দুখন, মোধে, নিধে আমার ঘরে গেড়ে বসে গাঁজা খায়, কেন নানকু আমাকে রোজ সাঁঝের বেলায় লাথি মারবে, কেন হারু ঘোষ–
সবটা বলা হয় না। দাড়ি মুঠো করে ধরে কে যেন তাকে তোলে। সে বুঝতে পারে, তার সঙ্গে পাবলিকের কোনও খানাপিনা নেই। তার কথার উত্তরে তখন পাবলিক বলতে থাকে–
–তুমি যে দেড়েল চানুকে শুষে নিচ্ছ হারামজাদা—
–ভদ্রলোকের যাতায়াতের পথে তেড়েল গেজেলের আড্ডা বসিয়েছ—
–গভর্নমেন্টের জমি মেরেছ শালা।
ঝাড়ফুঁক মন্তর জানে না, গুল-চাল মেরে মানুষের মাথা খাচ্ছে—
–সাতকড়ির দোকানে যে তোমার আগুন গিয়ে লাগল—
সাধুর ঝোঁপড়া আর সাতকড়ির দোকান জুড়ে দপ করে যেমন আগুনটা ধরেছিল তেমনি কয়েক মিনিটেই নেতিয়ে গেল আবার। দু-চারটে ছাঁচ বেড়া, মাচান, দুটো টুলবেঞ্চি তো আর আগুনের বেশিক্ষণের খোরাক নয়। কিন্তু আগুনটা নিভতে–নিভতেই সাধুর মুখ ফুলে ঢোল, টসটস করে রক্ত ঝরছে নাকে, কপাল বেয়ে। দাড়ি ছিঁড়ে হাওয়ায় ওড়ে, ছেঁড়া জটার চুল মুঠো থেকে রাস্তায় ফেলে দিচ্ছে মারকুটেরা। কে যে মারছে শালা কে জানে। সবাই এখন পাবলিক। সে একা। সাধু। বিড়বিড় করে কেবল বলে–মার শালা, মেরে ফেল। কেটে ফেলে দে আগুনে, দুনিয়া থেকে পাতলা হয়ে যাই।
মারধোরে আর হিসেব রাখে না সাধু। অনেকক্ষণ ধরে ব্যাপারটা চলে। অনেক হাত, অনেক পা। শেষটায় আর ব্যথা লাগে না তেমন। কেমন যেন নেশাড়ু ঘুম–ঘুম ভাব পেয়ে বসে। টের পায়। ল্যাম্পপোস্টের সঙ্গে কারা যেন বাঁধছে তাকে।
–এইখানে থাক শালা, যে যাবে একটা করে লাথি মেরে যাবে।
–মার না শালা। তোরা পারবি নিজের ঘরে আগুন দিতে? বুকের পাটা আছে? সাধু বিড়বিড় করে বলে।
সেই বিড়বিড় কারও কানে পৌঁছোয় না। পৌঁছালে বিপদ ছিল। ঝিমুনির নেশাটা যখন জমে এসেছে, তখন আস্তে-আস্তে পাবলিক ফোটে। চারদিকে কালো ছাই ওড়ে। শ্মশানের কলসির মতো ছাইয়ের মাঝখানে সাধুর কলসি হাঁড়ির স্থূপ পড়ে থাকে। উত্তর দিক থেকে টেনে হাওয়া দেয়। সাধুর ঝোঁপড়ার ছাই চারদিকে ছড়ায়। ল্যাম্পপোস্টের হাতবাঁধা সাধু ত্রিভঙ্গ হয়ে মাথা রেখেছিল ধুলোর ওপর, সেখান থেকেই পিটিপিটির চেয়ে দেখে নুলো সাতকড়ি একা পাকুড়তলায় বসে কাঁদছে, পাশে তার পাঁচ বছর বয়সের ছেলেটা পিলে বের করে দাঁড়িয়ে।
কারও জন্য এই প্রথম সাধুর মায়া হয়। মায়া মানেই বন্ধন। সাধুদের মায়া থাকতে নেই, তবু মাথায় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে বসে সাধু। মাথাটা হালকা লাগছে, মাথার জটটা পরচুলার মতো পড়ে আছে ধুলোয়। সাধু ভ্রূক্ষেপ করে না। নুলো হাত বলেই কি না কে জানে, সাতকড়ি তাকে মারেনি। দূরে বসে কাঁদছে। সে উঠে বসতেই সাতকড়ি মুখ তোলে। আবার নববধূর মতো মুখ। নামিয়ে কাঁদে।
সাধু বলে–কাঁদছ কেন মেয়েমানুষের মতো? বিড়ি থাকে তো দাও।
সাতকড়ি উঠে আসে? মুখে বিড়ি খুঁজে ধরিয়ে দেয়। তারপর বলে–কিন্তু আমার দোষটা কী বলো তো? আমার ঘরটা কেন নিলে আগুনে?
সাধু দাঁতে দাঁত চেপে বলে–আগুনটা আমার বাবার কিনা, তাই–
–তা আমার কী হবে এবারে?
–কী আর হবে? আমার তো মালকড়ি নেই, গতরে খেটে ঘর তুলে দিব। চানুকে বলি, যদি দু-দশ টাকা দেয় তো সে তোমার—
.
ঘর বাঁধতে–বাঁধতে শীত গিয়ে গরম চলে আসে। রোদের হলকা দুপুরের চরাচর চেটে যায়। রাস্তার কুকুরটাও ছায়া ঘেঁষে বসে। সাধু আর নুলো সাতকড়ি মিলে সাতকড়ির দোকানঘর বাঁধে। জটা দাড়ি- ছেঁড়া সাধুর দুই হাত, নুলো সাতকড়ির এক। বাঁশ–বাঁখারি–খুঁটি যত্নে বাঁধে সাধু, সাতকড়ি তার এগিয়ে দেয়, দড়ি ফেরায়। দুজনে কত কথা হয় ভরদুপুর, সারা দিনমান।
সাতকড়ি বলে–তুমি লোকটা সাধুই বটে হে।
সাধু অনাবিল একটু হাসে, বলে–বুঝলে সাতকড়ি, পাকুড়তলায় ঘরটায় যখন তেড়েল গেঁজেদের আড্ডা বসল, লোকের চোখ টাটাল, আমার সুখ ছিল না; নানকু শালা এসে রোজ লাথি মেরে যায়; তখন মাঝে-মাঝে ভাবতাম, মরি যদি তো আরবার গুন্ডা হব। ভাবতে-ভাবতে মনে হল, কিন্তু এ জন্মটায় শালা কেন আমি সাট্টা সাধু? একবার ঝাঁকি মেরে উঠে দেখি না কী হয়! তখন ঠিক করলাম, মরদের মতো কিছু একটা করি।
