যেমন করেই হোক, মানুষকে দাঁড়াতে হয়। ওই যে নিরাপদ–ছ’মাস আগেও জ্ঞাতিদাদা হারু ঘোষের আটাকলের পার্টনার ছিল। চালের আড়ৎ, আটাকল একা সামলাত। সারা শরীরে, চুলে, লোমে, জ্বতে আটা মেখে দাদা হারু ঘোষ তাকে একদিন ডেকে বলল –এবার থেকে মাইনে নিয়ে থাক, পার্টনারশিপ আর নয়। নিরাপদর বড় লেগে গেল কথাটা। দাদার কারবার থেকে তার সামান্য পুঁজি তুলে দেড়শো গজের মধ্যে আবার দোকানঘর ভাড়া নিল, কিনল আটাকল, খুলল চালের কারবার। পাকুড়তলায় বসে ওই দেখা যায় নিরাপদকে–পিছনে গোঙাচ্ছে চাকি, ফিতে ঘুরছে, ধুলোর মতো উড়ছে আটা ময়দা, কালো নিরাপদ সাদা হয়ে খাটছে, মাপছে, দিচ্ছে, নিচ্ছে, এক মুহূর্তের অবসর নেই। দাঁড়িয়ে গেল মানুষটা। বসে না থাকলে মানুষ দাঁড়ায় ঠিক।
পাকুড়তলায় বসে সাধু এইরকম তার ভবিষ্যৎ ভাবত। নুলো সাতকড়ির ডানহাতে সাড় নেই। হাতটা শরীরের সঙ্গে লেগে থেকে লাঠির মতো ঝোলে। অমন হাত ফেলে দিলেই হয়, তবু সাতকড়ি রেখেছে। হাঁটতে চলতে হাতটা লটরপটর করে, বাজারে হাটে লোকের সঙ্গে ধাক্কা খায়। হাতটা। আর একটা হাতে সাতকড়ি রেল ইঞ্জিনের মতো গেলাসে চামচ নেড়ে চা বানায়। তার ছোঁকরা নেই, একার দোকান। পাটকল মজুর, স্টার সেলুনের আড্ডাবাজ আর ইটের কাজের। জোগানিরা দশ পয়সায় চা মারে। একটুখানি ছাপরার দোকান, গোটা দুই বেঞ্চ, একটা চায়ের টেবিল, দু-চারটে কৌটোবাউটো–ব্যস। গুড় মেরে রস করে রাখে সাতকড়ি–গুড়ের চা সাত পয়সা। সাধুর ঝোঁপড়ার চার হাতের মধ্যে একহেতে সাতকড়িও দাঁড়িয়ে গেল বুঝি! মানুষ দাঁড়ায় বসে না থাকলে।
কথাটা সে তার চেলাদেরও বলে। কিন্তু চেলারা ভঙ্গি বদলায় না। দিনকাল ভালো যায় না সাধুর। দেড়েল চানু ছাড়া তার আর কোনও চেলা হাত উপুড় করে না। মেটে হাঁড়ি কলসি বেচে দিন যায়।
নেশাখোর নানকুর দোকানটা বিলেৎ বাকি পড়ে উঠে গেল গত বছর। সাহেব বাগানের জমিটা দর পেয়ে বেচে দিল। উঠে গেল ইটখোলার দিকে। ওয়াগন ভাঙিয়েদের দলে ভিড়ল কিছুদিন। তারপর পোষাল না বলে সব ছেড়ে ছুঁড়ে এখন মাল টেনে পড়ে থাকে। জ্ঞান ফিরলে নিখরচার হাট করতে বেরোয় থলি হাতে। একটা বউ দুটো বাচ্চা তার। হাটবাজার না করলে চলে কী করে? তাই আর পাঁচজন লোকের মতোই সে যায় হপ্তা বাজারে। দোকান থেকে আনাজপত্র। তুলে নেয় খুশি মতো, পয়সা দেয় না। দোকানিরা ব্যাজার মুখে চুপ করে থাকে। ফেরার পথে ঝন্টুর দোকান থেকে চা খায়, স্টার সেলুনে দাড়ি কামিয়ে ফিটফাট হয়ে নেয়, শুটকের দোকান থেকে ভালো জর্দা দেওয়া পান খায়, এক প্যাকেট পছন্দসই সিগারেট পকেটে পোরে, ঘোষের দোকান থেকে চাল তোলে, মুদির দোকান থেকে সওদা নেয়–এমন অনায়াসে সব তুলে নেয় যেন অদৃশ্য পয়সা গুনে দিচ্ছে। নিখরচায় সব সেরে ফেরার পথে–পাকুড়তলায় সাধুর ঝোঁপড়ার বাইরে দাঁড়িয়ে হাঁক পাড়ে–সাধে, এই শালা সাধো–
পুরো একটা ছিলিম টেনে নেয় শালা। তারপর অনেকক্ষণ ঝিম মেরে থাকে। উঠবার সময় হলে আবার সাধুকে ডেকে সামনে দাঁড় করায়। পাছায় একটা লাথি কষিয়ে বলে–পাকুড়তলাটা কি বাপের জমিদারি? সরকারি খাজনা লাগে না?
খাজনাটা নানকুই নেয়। তারপর পথে নামে। গান গায়। সাধু বিড়বিড় করে বকে-ইটখোলার দিকে অন্ধকারে মা গোখরো যেন দেয় ঠুকে, হেই ভগবান, ভগবান হে!
এই হচ্ছে সাধু। এইমতো তার দিন যায়।
.
এখন উত্তরে বাতাসে সাধুর ঝোঁপড়াটা ওই জ্বলছে। আগুনটা ধরেছে ভালো। পাকুড়তলা থেকে হাত বাড়িয়ে নুলো সাতকড়ির দোকানটা নিয়ে বাহার খুলেছে আগুনটার। পাটকল মজুরদের ছানাপোনারা নাকে আঙুল পুরে দাঁড়িয়ে গেছে, কাজের লোক নিরাপদ চাকি বন্ধ করে চলে এসেছে, স্টার সেলুনের আড্ডাবাজরা লাফিয়ে পথে নামল, কর্ড লাইনের ধারের ছোট্ট বেআইনি বাজারের খুদে পসারিরা দু-চারজন দৌড়ে আসছে। সাধুর দুই চেলা দুটো শুখো হাঁড়ি জল ছিটিয়ে দেওয়ার ভঙ্গিতে দোলাচ্ছে, তাদের চোখেমুখে এখনও ভ্যাবলা ভাব। গাঁজার নেশা এখনও কাটেনি। একটু দূরেই ধুলোয় বসে সাধু বিড়ি ধরিয়েছে, তার মুখচোখ জুলজুল করছে।
কে আগুন দিল? কে?
সাধু দেশলাইয়ের কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলে বলে, আমি।
সবাই বোকা। বলে–কেন?
–আমার ইচ্ছে। সব জ্বলে যাক শালা।
একটু ব্যোমকে থাকে ভিড়টা। তারপরই হঠাৎ সাধুর যে দুই চেলা শুকনো হাঁড়ি থেকে অদৃশ্য জল আগুনে ঢালছিল তাদের একজন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে হাঁউরে মাউরে করে চেঁচিয়ে বলল –যখন আগুন দেয়, তখন আমরা মাইরি ঘিরে ছিলাম।
পোড়েলবাড়ির বেঁটে ছেলেটা এগিয়ে সামনে এসে জিগ্যেস করে–নিজের ঘরে আগুন দিয়েছ। বেশ। কিন্তু নুলো সাতকড়ির দোকানটা যে গেল–গরিব মানুষ–তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে?
সাধু বেঁঝে উঠে বলে–তা আমি কী করব? আগুন কি আমার বাপের? নিজের ঘরে আগুন দিয়েছি আমি, সে আগুন যদি বাতাস বেয়ে–
বালির বাজারে মাল তুলতে গিয়েছিল সাতকড়ি। চটের থলিতে গুঁড়ো চা, আক্রার চিনি, গুড়। ফেরার পথে দূর থেকে আগুন দেখে দৌড়োচ্ছে। একহাতে ব্যাগ, নুলো হাতটা লটপট করে এধার-ওধার বেমক্কা দোল খাচ্ছে। পরনে খাকি হাফ প্যান্ট, গায়ে ময়লা তেলচিটে গেঞ্জি, গেঞ্জি কুঁড়ে বুকের হাড়গোড় কাঠকুটোর মতো ফুটে উঠেছে। সে চেঁচিয়ে বলছে–আমার একশো টাকার মাল–একশো টাকার-
