সবাই জানে–এ সাধুটো ঝুট আছে। সাট্টা সাধু মেকি। সেবার যখন শীতলবাড়ির পাশে মজুমদারদের নতুন ভাড়াটের বউটাকে রাত বারোটায় তেঁতুলবিছে কামড়াল, তখন অত রাতে উপায় না দেখে তারা এসে সাধুকে ডেকেছিল, যদি সাধু এসে ঝেড়ে ফুকে দেয়। সাধু বিপদ বুঝে তেড়ে গাল দিতে লাগল–বিছেটাকে মেরে ফেলেছ তোমরা? অ্যাঁ? মেরে ফেলে আবার আমাকে ডাকতে এসেছ? বলি, ঝাড়ব যে, তা বিষটা টানবে কে? বিছেটা মেরে ফেললে–তা বিষটা কি আমি মুখ দিয়ে টানব?
তখনই বোঝা গিয়েছিল যে, সাধুটা সাট্টা। মজুমদার ভাড়াটেরা তখন জি টি রোড থেকে বিখ্যাত ঝাড়ুনী বুড়িকে নিয়ে এসেছিল। বুড়ি এসে প্রথমটায় দুধ আর জল দিয়ে ঝাড়ল, তারপর ঝাঁটার কাঠি দিয়ে। ব্যাপারটা দেখতে জমকালো, কিন্তু কাজ হল না। কিন্তু সাধু পদ্ধতিটা দেখে রাখল মন দিয়ে। অন্য জায়গায় চালাবে। তাকেও করে খেতে হবে তো?
গোলবাজারে বুড়ো শেখ সাহেব বসতেন এক সময়ে। দারুণ গেঁজেল। তাঁকে ঘিরে ছিল সারা হপ্তা রেসুড়েদের ভিড়। শুক্রবারে ভিড় হত সবচেয়ে বেশি। শেখসাহেব ভ্রূক্ষেপ করতেন না। গাঁজা টানতেন, আর টানতেন। তারপর নিমীলিত চোখে কখনও হুঙ্কার দিয়ে বলতেন–এক লাঠি। তার মানে হচ্ছে এক। এক নম্বর ঘোড়া ধরো তো তোমরা। কখনও বলতেন–দো রোটি। তার মানে হচ্ছে–আট। কখনও বা–তিন কাঠি। তার মানে হচ্ছে–চার। এইরকম ঠারে ঠোরে টিপস দিতেন শেখসাহেব। ঘোড়া রেসের ময়দানে শেখ সায়েবের কথা মতো চলত।
সাট্টা সাধু কায়দাটা শিখে রেখেছিল। পাকুড়তলায় গাঁজা টানতে-টানতে সে-ও মাঝে-মাঝে চিৎকার দেয়–এক লাঠি। কিংবা–তিন কাঠি। কিংবা দো রোটি।
লোকে প্রথমটায় খেয়াল করেনি। রেলের গ্যাংম্যান চানুর বাহারি দাড়ি আছে বলে তার নামডাক দেড়েল চানু বলে। দেড়েল চানু সাধুর টিপস ধরে পয়লা বারে একশো আঠারো টাকা, দ্বিতীয় দফার শ’দেড়েক টেনে আনল তারপর দিশি মদ গিলে এসে সাধুর পায়ের ওপর বডি ফেলে কাঁদতে–কাঁদতে বলল –মন্তর দাও। আজ থেকে আমি তোমার চেলা।
তা দেড়েল চানুই সাধুর প্রথম শিষ্য। মন্তর বলে যে একটা ব্যাপার আছে, তা সাধু খেয়ালই। করেনি। স্বপ্নেও তার ভাবা ছিল না যে, তারও একদিন শিষ্য জুটবে। ছেলেবেলায় সে তার বাপকে দেখত, ঘুম থেকে উঠেই হাই তুলতে-তুলতে চেঁচাত–ওঁ তৎসৎ। সেই মন্তরটা জানা ছিল। দেড়েল চানুর কানে-কানে সেই মন্তরটা দিয়েছিল সে। আর ধরিয়ে দিল গাঁজার কলকে। বর্ষার পর দেড়েল চানু তার ঝোঁপড়াটা নতুন খড় দিয়ে ছেয়ে দিল, ভিতরে তৈরি করে দিল একটা বাঁশের মাচান, নতুন একটা লোমের কম্বল কিনে দিল। আরও গোটাকয় শিষ্যও দিল জুটিয়ে। কিন্তু চানু ছাড়া সবক’টা শিষ্যই হাড়হাভাতে। গুরুর পয়সায় গাঁজা টানে, তারই সঙ্গে সমানে বসে খিস্তিখাস্তা করে, ঝোঁপড়ায় বসে থুথু ছিটিয়ে ঘর নোংরা করে যায়। সাধু রাগ করে চেঁচায়, অশ্লীলতম কথা বলে গাল পাড়ে। কিন্তু চেলাগুলো তখন তার সঙ্গে ডাকটিকিটের মতো সেঁটে গেছে, মা-বাপ তোলা গালাগাল শুনে গোলাপি রঙের হাসি হাসে।
দেড়েল চানু সাট্টা সাধুটার পিছনে হকের পয়সা ঢালছে–এটা লোকের সহ্য হয় না। চানুকে এখানে সেখানে পাড়ার লোকে পাকড়াও করে তোমার সংসার ভেসে যাচ্ছে চানু হে। ফুটো নৌকোর সওয়ারি তুমি–ওই শালা জোচ্চোরটার পিছনে–ইত্যাদি। তখনই লোকের চোখ টাটায় সরকারি বেওয়ারিশ জমি, বেদখল করে শালা বসে গেছে পাকুড়তলায়, এত লোকের যাতায়াতের রাস্তার ধারে, কারো নজরেও পড়ে না নাকি! সরকারি জমি, সরকার বুঝবে, কার বাবার কী? কিন্তু তবু লোকের চোখ টাটায়। চানুটা চেলা হয়েই সাধুকে ঝোলালে।
পাটকল মজুরদের কুঠরিগুলোয় প্রায় দিনই হাঁড়ি ফাটে। রাত বিরেতে দিশি মদের ঝোঁকে মরদরা এসে বউয়ের ওপর খামোখা টং হয়, অন্ধকারে এধার ওধার লাথি চালায়। দু-চারটে বাচ্চা লাথি খেয়ে কোঁতকোঁত করে উঠে চেঁচায়, বউগুলো উড়োখুড়ো চুলে দৌড়ে বেরোয়, ছুটাছুটি করে। সেই হুড়–দৌড়ের মধ্যে পুরুষেরা ভাতের মেটে হাঁড়ি ভাঙে, উনুন ভাঙে, আরও কত কাণ্ড করে। সাধু দেখেশুনে তার ঝোঁপড়ায় একটা দোকান দিয়েছিল। মেটে হাঁড়ি কলসী মালসার দোকান। মাকালতলায় কুমোরদের ঘর থেকে বয়ে এনে পাটকলের মজুরদের ঘরে প্রায় দিনই হাঁড়ি কলসী বিকোয়।
শীতলাবাড়িতে রোজকার সকালের প্রণাম সেরে নিরাপদর দাদা হারু ঘোষ ফেরার পথে পাকুড়তলায় দাঁড়িয়ে চারধারটা চোখে-চোখে জরিপ করে নেয়কতটা জমি নিয়েছিস রে, অ্যাঁ?
সাধু তার হাঁড়ি কলসির মাঝখানে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে উদাস গলায় বলে–তা কাঠাদুয়েক হবে।
হারু ঘোষ হাসে-দূর ব্যাটা, দু-কাঠায় তিনতলা উঠে যায়! আধ কাঠা বড় জোর, তা জায়গাটা ভালোই। গেড়ে বসেছিস একেবারে। এ আবার কী–গাছ–টাছ রুয়েছিস নাকি?
সাধু তেমনি উদাস জবাব দেয়–আমি রুইব কেন? জমি আমার বাবার নয়, যখন তুলে দেবে উঠে যাব। গাছ–গাছালি যার–যার মনমতো উঠছে।
–দেখিস বাপু।
কী দেখব, তা সাধু ভেবে পায় না। থুথু ফেলে সে খুব ভাবে। রাতারাতি একটা মন্দির তুলে ফেলতে পারলে পাকাঁপাকিভাবে বেওয়ারিশ জমিটাতে শেকড় চালানো যেত। সিমেন্ট না জোটে চুনসুরকি দিয়ে হাতদশেক উঁচু একটা মন্দির, ওপরে লাল নিশেন উড়ছে-এরকম একটা স্বপ্নের ছবি সে দিন–দুপুরেই দেখে। কিন্তু সকলেই চোখ পেতে আছে–মন্দির ওঠাতে গেলেই খিচাং বেঁধে যাবে। শিষ্য–সাবুদরাও কেউ মানুষ না। দিনদুপুরেই হল্লা–চিল্লা করে গাঁজা খায় ঝোঁপড়ায় বসে। সাধু লাথি মেরে বের করার চেষ্টা করে দেখেছে। নড়ে না। শালখুঁটির মতো শক্ত হয়ে গেড়ে গেছে শালারা। এদের দিয়ে মন্দির? সাধু আবার থুথু ফেলে।
