একটা বাচ্চা ছেলে দৌড়ে এসে চেঁচিয়ে খবর দেয়–মেলোমশাই, আপনাদের কেলে গরু খোঁটা উপড়েছে দেখুনগে…
সত্যিই তাই। হারামি গরুটা ছাড়া জমি পার হয়ে রেলরাস্তায় ঢালু বেয়ে উঠছে। চিৎকার করে ডাকি। গলা শুনে একবার পিছনে ফিরে দেখে তারপর জোর কদমে ভারী শরীর টেনে উঠে পড়ে রেলরাস্তায়। পাথরে কাঠের খোঁটার খটখট শব্দ হয়। আপ–ডাউন দুটো লাইন পাশাপাশি। আপ লাইনটা পার হওয়ার চেষ্টা করছে আমার কালো গরু। এইখানে রেল লাইনে একটা গভীর বাঁক। গাড়ি এলে দূর থেকে ড্রাইভার গরুটাকে দেখতেও পাবে না…
–হারামির বাচ্চা। আমি ছুটতে থাকি। গরুটা টের পায়। লাইনটা আর পার হওয়ার চেষ্টা না করে লাইন ধরে ছোটে। আমার কোমর ভেঙে আসে। মেরুদণ্ড দিয়ে একটা ছুরির ফলা লকলক করে চমকে ওঠে। ঢাল বেয়ে উঠতে আবার দম বেরিয়ে যায়। পাথর, খোয়া,। রেলের স্লিপারে হোঁচট খাই। গোরুটা ‘বাহা’ বলে ডাক দেয়, ছুটতে থাকে। রেল লাইনের গভীর বাঁক এখানে–আমার অবোধ দুধেল গাইটা বুঝতেও পারে না।
চনচনে রোদে, খালি পায়ে কোমরের সেই ব্যথা নিয়ে আমি প্রাণপণে খানিকটা তাড়া করি। তারপর দাঁড়াই, হঠাৎ মনে হল ভগবান ওকে দেখবেন।
অবাধ্য গরুটাকে যেতে দিয়ে রেলরাস্তা থেকে নামবার আগে আমি সংসারের দৃশ্যটা ভালো করে দেখি। পিছনে বহুদুরে ওই জি টি রোড যেখানে কাল তিনটে মৃতদেহ পড়ে ছিল। পটল সারাদিন বাড়িতে নেই। ডানধারে রেল লাইনের গভীর বাঁক ধরে হেঁটে যাচ্ছে আমার দুধেল গাই। কোথায় সে যাবে কে জানে! সামনে কলাঝোঁপের আড়ালে দেখা যাচ্ছে আমার পলেস্তারাহীন অসম্পূর্ণ বাড়িটা। ওটা কোনওদিনই শেষ হবে না। রেলিঙহীন ছাদে ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে তারপর দ্রুত সুতো গুটিয়ে নিচ্ছে হাবু। ওই অনেকটা সুতো নিয়ে তার সাদা ঘুড়ি টাল খেয়ে-খেয়ে ভেসে যাচ্ছে। আনন্দে গোত্তা খেয়ে ওপরে উঠে ঘুরপাক খাচ্ছে কালো ঘুড়িটা।
কয়েক পলক স্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আমি সংসারের অসম্পূর্ণতাকে দেখে নিই, অনুভব করি। ব্যর্থতাগুলি। সাদা কাটা ঘুড়িটা আমার মাথার ওপর দিয়ে ভেসে যায়।
হঠাৎ তড়িৎস্পর্শের মতো আমার হাত ছোঁয় সুতোর হালকা স্পর্শ, মাঞ্জার কড়া ধার। আমি সংসারের দৃশ্য থেকে মুখ ফেরাতেই নীল আকাশে সাদা হাসিটির মতো দোল খাওয়া ঘুড়িটাকে দেখি। সুতোটা আমার হাত ছুঁয়ে আবার সরে যাচ্ছে। আমার পিছনে রাজ্যের ছেলের পায়ের শব্দ আর চিৎকার শুনি। তারা ঘুড়িটার দিকে ছুটে আসছে।
সুতোটা আমার মাথার একটু ওপরে দোল খায়। আমি সংসারের সব ভুলে গিয়ে আনন্দে হাসি। লাফ দিয়ে উঠি। সুতোটা সরে যায়। অল্প দূরেই আবার স্থির হয়ে বাতাসে দোল খায়। আমি এগোই। সুতোটা সরে যায়। আমি এগোই। আমি এগোতে থাকি। ক্রমে সংসারের কোলাহল দূরে যায়। নিস্তব্ধ হয়ে যায় পৃথিবী। ঘুড়িটা টলতে টলতে এগোয়। সুতোটা আমার হাতের নাগালে–নাগালে থাকে। ধরা দেয় না।
ক্রমে আমরা আশ্চর্য এক অচেনা পৃথিবীতে চলে যেতে থাকি।
সাধুর ঘর
পাকুড় গাছের তলায় সাধুর ঘরে কে যেন আগুন দিয়েছে। উত্তরে বাতাস বইছে হুহু। দুপুরের রোদে আগুনের তেমন জলুস খোলে না। তবু সাধুর ঝোঁপড়াটা রোদ খেয়ে টনটনে হয়ে ছিল বলে আগুনটা ধরেছে ভালো। কয়েকটা হালকা পাকুড় গাছটার নীচু ডালপালা ধরে ফেলল, কয়েকটা লাফ দিয়ে গিয়ে ধরল নুলো সাতকড়ির চায়ের দোকানটা। দুপুরের খর রোদেও আগুনটার লাল হলুদ রংটা ছড়িয়ে গিয়ে খোলতাই হল। হপ্তা বাজারের রাস্তায় লোক জমে গেল খুব। কর্ড লাইনের ধারের পসারিরা ছুটে এল।
কে আগুন দিল? কে?
সাধু লোক ভালো না। কর্ড লাইনের ধারের বেওয়ারিশ পাকুড়তলার জমি তার বাপের নয়। সরকারের। সরকারের বাঁধুনি আলগা, তাঁর কোচা দিতে কাছা খুলে যায়। তাই গভর্নমেন্টকে ছোলাগাছি দেখিয়ে বছরখানেক সাধু তার ঝোঁপড়ায় গেঁজেল তেড়েলদের আড্ড খুলেছে। মুখোমুখি একঘর পাটকল ম জ্বরের বাস। তাদের ছানাপোনা আঁতুড় থেকেই ধুলোয় গড়ায়, ধুলোমাটিতে হামা টানে। কয়েক গজ দূর দিয়ে বুক কাঁপানো মেল ট্রেন যায়, আর যায় বাহারি রাজধানী এক্সপ্রেস, নিঃশব্দে সাপের মতো চলে লোকাল। ছানাপোনারা সেইসব ট্রেনের চাকা থেকে দু-তিন গজের মধ্যে খেলাধুলা করে পাথর কুড়োয়। মায়েরা ক্ষেপও করে না। বাপেরা ছেলেমেয়ের নামও ভুলে যায়। মানুষের এইসব উদাসীনতার ফাঁকে ফোঁকরে এক-আধজন লোক দুনিয়াতে বসে যায়। সাধুও বসে গিয়েছিল।
সাধুদের রাঙা পোশাক পরতে হয়, মুখ খারাপ করতে হয়, ত্রিশূল বইতে হয়–বোধহয় সেইজন্যই সাধু জটাজুট, রাঙা পোশাক, ত্রিশূল সবকিছুর জোগাড় রেখেছে। আর তার খারাপ মুখ। এমনই অনর্গল অবিরল সারাদিন সে মুখ ছোটায় যে, পাটকল মজুরদের ছানাপোনাদের মুখে প্রথম যে কথা ফোটে, তা হল সাধুর খারাপ কথা। কেউ রাগ করে না অবিশ্যি। শিখবেই তো বড় হয়ে, বাপ যখন মাকে বকবে, কি মাতাল হয়ে হল্লাচিল্লা করবে, কি পাওনাদার যখন এসে বাপকে নেবে একহাত, তখন শেখা হবেই। সাধু শুধু কাজটা এগিয়ে রাখছে। রাখুকগে। সাধু যখন চিল্লায়, তখন সকালবেলায় ছানাপোনার মা দূরের দিকে চেয়ে বসে মাথায় উকুন চুলকোয়, বাপ পাকুড়তলায় ছায়ায় খাঁটিয়ায় শুয়ে আগের রাতের খোঁয়ারি ভাঙে। কেউ সাধুর দিকে ফিরেও চায় না।
