–না ইলেকট্রিক আলাদা। মাসে দশ টাকা ফিকসড।
–দশ টাকা। মাত্র চারটে পয়েন্টের জন্য দশটাকা।
–গরমকালে পাখা চলবে তো!
–আমাদের পাখাটাখা নেই।
–তা হলেও কলকাতার চেয়ে এখানকার ইউনিটের দর দ্বিগুণ।
লোক দুজন বিতৃষ্ণ চোখে ঘরটা দেখে। পছন্দ হয় না বোধ হয়। গত এক বছর ধরে এরকম বহু লোক এসে ফিরে গেছে। আমি নিস্পৃহভাবে তাকিয়ে থাকি।
লম্বা লোকটা বলে–আমি এখন যে বাড়িতে আছি সন্তোষপুরে–সেটার ভাড়া পঁয়তাল্লিশ, দুখানা ঘর সামনে পিছনে বারান্দা, দক্ষিণের হাওয়া আসে হুড়হুড় করে। তার ওপর সেটা কলকাতা-এরকম গ্রামগঞ্জ নয়–
–ছেড়ে দিচ্ছেন কেন?
–আমার সামনের বারান্দায় বসে পাড়ার ছোঁকরারা বোম বাঁধে মশাই।
অপেক্ষাকৃত বেঁটে লোকটি লম্বা লোকটির শালা। খুব বিনীত হাসি তার মুখে। সসঙ্কোচে বলে –এ ঘরটায় কে থাকে? চৌকিতে বিছানা দেখছি। আঠার শিশি, পোস্টারের কাগজ তুলি রাজনীতির বই–এসব কী ব্যাপার!
–আমার মেজো ছেলে পটল।
–পলিটিকস করে?
–না, পলিটিকসের বোঝে কী? এ সি ই পাস করে বেকার বসে আছে। ওইসব করে সময় কাটায়। ওটা একটা শখ।
লম্বা লোকটাকে চিন্তিত দেখায়!–এসব এলাকা কেমন? ঝঞ্ঝাট–টঞ্ঝাট আছে কিছু?
–আজ্ঞে না, খুব নিরিবিলি।
–কিন্তু খবরের কাগজে যেন দেখেছি এই এলাকাতেও—
–ও, সে ওই অভয়নগর–বেলাবাগান রিফিউজি এলাকায়। এদিকটায় কিছু নেই।
লোক দুজনকে তবু চিন্তিত দেখায়।
আমি তাদের কিছুদূরে এগিয়ে দিই। বুঝতে পারি, তারা আর আসবে না।
গত এক বছর ঘরটা ভাড়া হচ্ছে না। আগের ভাড়াটেরা তিরিশ টাকা দিত, ইলেকট্রিক চার্জ দিত তিন টাকা। তারা ছাড়ার পর আমি ভাড়া বাড়িয়েছি। টাকাটা জমিয়ে বাড়িটাতেই লাগাব। ভাড়া হচ্ছে না বটে, কিন্তু হবে। কলকাতার গণ্ডগোলটা যদি জোর লেগে যায়। লম্বা লোকটার সামনের বারান্দায় যদি ছোঁকরাদের বাঁধা বোমা একটাও একদিন ফাটে–
হাবু এখন ছাদের মাঝখানে আবার সুতো ছেড়েছে। কালো ঘুড়িটা কোথায়? কেটে গেছে নাকি! না সুতো গুটিয়ে একটু সরেছে পুবদিকে। কিন্তু লড়বে! এগোচ্ছে। হাবু ছাদের মাঝখানে দাঁতে ঠোঁট টিপে হাসছে।
বাছুরটা রোদে গা এলিয়ে শুয়ে। পায়ে বাত, ল্যাজের দিকটায় পাতলা গোবরে মাখামাখি। মাথার কাছে একটা কাক বসে মন দিয়ে ওর মুখ দেখছে।
কুয়োর পাড়ে হাত পা ধুচ্ছি, রান্নাঘর থেকে হাবুর মা চেঁচিয়ে বলে–ওরা কী বলে গেল?
–নেবে না বোধ হয়। ভাড়া বেশি।
–না নিক। তুমি কমিও না। কলকাতা থেকে তোক চলে আসছে এখন। ধরদের বাড়ি কুষ্ঠরোগীর বাড়ি বলে ভাড়া হচ্ছিল না, গত শুক্রবারে সেটাও আশি টাকায় ভাড়া হয়েছে। তুমি চেপে বসে থেকো।
রোদে দেওয়া তোষক বালিশের ওপর তপুর বেড়ালটা ডন মারছে। বেড়ালটাকে তাড়িয়ে রোদে একটু বসি। একটা সিগারেট টানি। আকাশে সাদা কালো দুটো ঘুড়িই সমান–সমান বেড়েছে। এইবার লাগবে, ছাদে হাবুর পা দাপানোর শব্দ হচ্ছে। ঘুড়ির লড়াইটা কি দেখে যাব? থাকগে। এখন আর সে বয়স নেই। সপ্তাহে এই একটাই তো মাত্র ছুটির দিন! সময় নষ্ট করা ঠিক না।
উঠোনটায় গতবারে বর্ষা থেকে জল জমছে। আগে জমত না। পশ্চিমে একটা মজা পুকুর ছিল, সেখানে নাবালে গড়িয়ে নেমে যেত। গত বছর থেকে এক বড়লোক পুকুরটা কিনে উঁচু করে মাটি ফেলেছে। উঁচু ভিতের বাড়ি গাঁথছে, জলটা এখন উলটোবেগে গড়িয়ে আসে। গরিবের উঠোন ভেসে যায়। কী করব ভেবে পাই না। চিন্তিতভাবে ঘরে আসি। পরশুদিন সন্ধেবেলা কারেন্ট ছিল না, অসাবধানে মোমবাতি জ্বেলে দিল তপু। দেওয়ালে কালো দাগ। সাবান জলে সেই দাগ তুলি। ক্যালেন্ডারের পেরেক পুঁততে গিয়ে দেওয়ালের চালটা উঠিয়েছে পটল। ভ্রূ কুঁচকে দৃশ্যটি একটু দেখি। দোতলা উঠবে, সেই আশায় সিঁড়িঘরটা পোক্ত করে করা হয়নি, বর্ষার জল সেইখান দিয়ে চুঁইয়ে এসে নষ্ট করেছে ইলেকট্রিকের তার। দাঁড়িয়ে সমস্যাটা একটু ভাবি। ছাদের ওপর জমানো আছে লোহার শিক–তাতে জং পড়েছে, বাইরে এক গাড়ি বালি ক্রমে মাটি হয়ে যাচ্ছে, পাথরকুচিগুলো ছুঁড়ে– ছুঁড়ে নষ্ট করেছে পাড়ার ছেলেরা। সারা বাড়ি ঘুরে
আমি এইসব দেখি। বাড়িটা শেষ হতে অনন্তকাল লেগে যাবে মনে হয়। কুয়োতলায় মাথায়। সাবান দিতে বসেছে তপু আমার কালো মেয়েটা। গত জ্যৈষ্ঠে চব্বিশ পার হয়ে গেল। তপুর বিয়ে হলে আমার তিনটে মেয়েই পার হত। কিন্তু কালো বলে তপুই কেমন আটকে গেছে। গতকাল জি টি রোডে তিনটে মড়া পড়েছিল। পটল চারদিন বাড়ি নেই। আমার বেতো বাছুরটা কি বাঁচবে? ফুলকপিগুলো আঁট বাঁধল না, বেগুনে পোকা। ওই লম্বা লোকটা আর আসবে বলে মনে হচ্ছে না। এক বছর একটা ফালতু ঘর পড়ে আছে। কোমরের ব্যথাটা আঁট হয়ে বসেছে। আমার দুটো গরুই হারামি। ভগবান কি সত্যিই হাবুকে দেখবেন?
যদি দোতলাটা তুলতে পারতাম তবে পুরো একতলা ভাড়া দিতাম। দেড় দুশো টাকা নিশ্চিন্ত আয়। দক্ষিণ দিকে দোতলায় আমার একটা নিজস্ব ছোট্ট বারান্দা করতাম। রেলিঙ ঘেঁষে বসাতাম মোরগফুলের টব। ঝোলাম অর্কিড। ছেলেবেলায় সাহেববাড়িতে ওরকম বারান্দা দেখে আমার বড় শখ রয়ে গেছে। চাকরির আর মাত্র আট মাস বাকি। তারপর অখণ্ড অবসর, দক্ষিণের বারান্দায় বসতাম ইজিচেয়ারে, হাতে খবরের কাগজ, মাঝে-মাঝে এক পেয়ালা চা পায়ের কাছে পড়ে–থাকা রোদ…এইসব খুব একটা বেশি কিছু নয়। যে কেউ এইসব চাইতে পারে।
