সাধু আর তারানাথের বাক্যালাপ থেমে গেছে। গুরুপদও উঠে বসেছে অন্ধকারে।
তারানাথ চাপা গলায় বলল , শুনলে?
গুরুপদ বলল , শুনলাম।
সাইকেলের দরদাম জানে না ঘটু। দুশো টাকায় কি হয়? হোক–না-হোক, সাইকেলটা যেন আবডাল থেকে খুব খুশির ঘণ্টি বাজাতে লাগল। সে এসে পড়তে চাইছে।
মাস্টার হাঁক মারল, গুরুপদ! ও গুরুপদ, একবার আয় তো এদিকে ভাই।
গুরুপদ উঠে পড়ল। সঙ্গে সাধু গায়েন আর তারানাথও।
ঘটু গুরুতর কথায় থাকে না। তবে আড়ালে কান খাড়া করে রইল সে।
এই যে গুরুপদ, বাবু কী বলছে শোন। পারবি চার দিনে কাজ তুলে দিতে?
দশদিনের কাজ চার দিনে? ও বাবা।
মহিম মণ্ডল বলল , বাপু হে, হওয়ার কথাটা ভাবো, না হওয়ার কথাটা ভেবো না। দশ দিনে। পারলে চার দিনেও পারা যায়। খাটুনিটা বাড়িয়ে দেবে।
আজ্ঞে মানুষের শরীর তো?
মানুষ কি কম কিছু করছে? পাহাড়ে উঠছে, সমুদ্দুর পেরোচ্ছে সাঁতরে, আরও কত কথা শুনি। আমার যে সম্মানের প্রশ্ন হে!
আজ্ঞে মজুরিটা কত দেবেন।
যা পাও তার তিনগুণ, আর দুশো টাকা করে বকশিশ।
মাপ করবেন, ওতে পারব না।
কত চাও?
মজুরি চার ডবল করুন। আর হাতে–হাতে তিনশো করে টাকা।
সুযোগ বুঝে বাড়াচ্ছে হে!
আজ্ঞে না। শরীরের রসকস নিংড়ে দিতে হবে যে। চার দিন না ঘুমিয়ে, জিরিয়ে কাজ করলে মানুষের কী অবস্থা হয় তা তো জানেন।
মহিম মণ্ডলের পয়সা আছে, পয়সার গরমও আছে। হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তাই পাবে। লেগে পড়ো, বুধবার বেলা বারোটার মধ্যে কাজ সারা চাই। জামাই আসবে সাড়ে পাঁচটায়। তার আগে এমন করে সব সারতে হবে যে, সদ্য হয়েছে বলে বোঝা না যায়।
তা হয়ে যাবে।
আজ রাত থেকেই শুরু করে দাও। আমি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সাধনকে খবর দিচ্ছি, সে এসে একটা ডুম জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিক লাইন টেনে।
যে আজ্ঞে।
ও ঘটু, পচা আর হাঁদুকে দৌড়ে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বেশিদূর যায়নি বোধ হয়।
তারানাথের হাঁক শুনে ঘটু উঠে ছুটল। আর ছুটতে ছুটতে তার মনে হল, এই অবস্থায় একখানা সাইকেল থাকলে? আঃ, শুধু প্যাডেল মারো আর উড়ে যাও।
পচা আর হাঁদু গাঁ পেরোনোর আগেই ধরে ফেলল ঘটু। বৃত্তান্ত শুনে তারা পড়ি–কি–মরি করে ছুটে এল। সাজো সাজো রব।
মহিম মণ্ডল ভারী খুশি হয়ে বলল , এই তো চাই। ভালো করে কাজ করো বাবাসকল, আজ রাতে খাসির মাংস খাওয়াব।
ব্রজমাস্টার হাত জোড় করে বলল , ওটি করবেন না। গুরুভোজন হয়ে গেলে সবাই চুলবে, কাজ এগোবে না। বরং রুটি তরকারির বন্দোবস্ত করুন। ঊন–পেটে থাকলে রাত জাগতে সুবিধে হয়।
পুবের আকাশে সূয্যি ঠাকুরের মতো মাংসটা উদয় হচ্ছিল, কিন্তু অস্তও হয়ে গেল। বেজার মুখে ঘটু কাজে নেমে পড়ল।
কাজও বড় সোজা নয়। কার্তিক মাস, হিমেল হাওয়া দিচ্ছে। দু-খানা ডুমের আলোয় বড় বড় ছায়া ফেলে তারা কেসিং-এর পাইপ পুঁততে লাগল। হ্যামার মারতে মারতে হাঁদু, পচা আর ঘটুর গা ঘেমে গেল কয়েক মিনিটেই। তা ঘামুক, মণ্ডলের পো পুষিয়ে দিচ্ছে।
ভোর হতে না হতেই চারখানা পাইপ নেমে গেল নীচে।
ব্রজমাস্টার একখানা ঢিবির ওপর বসে দেখছিল সব। বলল , এবার যাও, চোখেমুখে জল দিয়ে একটু জিরিয়ে নাও। মুড়িটুড়ি যা জুটবে খেয়ে ঘণ্টা দুই ঘুমোও। একেবারে না ঘুমোলে। শরীর দেবে না। কাজটা তোলা চাই। শরীর পাত হয়ে গেলে কাজ তুলবে কে? মুড়ি এল, সঙ্গে সেই গুড় তো আছেই, মণ্ডলের পো একধামা বেগুনিও পাঠিয়েছে গরমাগরম। কিন্তু ব্রজমাস্টার। বেগুনির ধামা সরিয়ে নিল। বলল , ও জিনিস চলবে না। খাটুনির পর এসব ভাজাভুজি পেটে গেলে আর দেখতে হবে না।
শেষ অবধি দয়াপরবশ হয়ে দু-খানা করে দিল।
দুপুর অবধি কাজ অনেকটাই এগোল। দুপুরে যখন পেটে খাণ্ডবদাহনের খিদে তখন যা জুটল তা ব্রজমাস্টারের হুকুমেই। তেতোর ডাল, একটা ঘ্যাঁট আর ভাত। সঙ্গে আলু সেদ্ধ। ব্রজমাস্টার বলল , গুরুপাক খেলে শরীর দেবে না। উন খাওয়াই ভালো। কাজ তুলে দে, তারপর বিয়ের ভোজ তো আছেই।
খাওয়ার পর ফের ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলে তারা। তারপর ফের কাজ। পাইপ নামছে। কাজ এগোচ্ছে। তবে রাতের মধ্যেই ঘটু বুঝতে পারল শরীরের নাম মহাশয়। চোখে ঢুলুনি। হাত পায়ে সেই দুনো জোর আর নেই। তিনশো টাকা আর তিন ডবল মজুরিতে তার সাইকেলখানা হয়ে যাবে, এই আশায় হ্যামার মারতে লাগল ঘটু। গুরুপদ খাটছে, দু-হাজার টাকার খানিক উশুল করবে বলে। সাধু গায়েন বউকে উঞ্ছবৃত্তি থেকে রেহাই দেবে। তারানাথ বিয়ে বসবে। পচা আর হাঁদু টাকাটা ওড়াবে ইচ্ছেমতো, কিছু বাড়িতেও দেবেথোবে। নানান ধান্ধায় মহিম মণ্ডলের শ্যালো নামছে মাটিতে। গভীরে।
সোমবার উদয়পুরের হাট। মহিম মণ্ডলের বাড়ির পাশের মাঠ থেকেই হাটের শুরু। রবিবার বিকেল থেকেই ব্যাপারীরা এসে হাজির হচ্ছিল পিলপিল করে। সোমবার সকালে হাঁকেডাকে জমজমাট।
খাওয়াটা তেমন জুতের হচ্ছে না, বুঝলে? আরে খাটলে পিটলে একটু পোস্টাইও তো চাই। এই বলে পচা আর হাঁদু যখন ব্রজমাস্টার সকালে মাঠপানে গেছে, তখন হাটে গিয়ে ভরপেট ঘুগনি মেরে এল। মহিম মণ্ডলের চারটে মোষ আর বারোটা গরু। পিছনের উঠোনে সকাল বিকেল যখন দোয়ানো হয় তখন মচ্ছব লেগে যায়। পচা আর হাঁদু এক ফাঁকে গিয়ে এক ঘটি করে মোষের দুধ কাঁচাই গিলে এল। রাখাল লোকটা দিলও, কারণ বাবুর গুরুতর কাজ হচ্ছে, মিস্তিরিরা জান কয়লা করে খাটছে, না দেবেই বা কেন?
