বিকেলের মধ্যেই দুজনের পেট নামল সাংঘাতিক। কাজ করবে কি, হাতের জলই শুকোয় না। তার ওপর তারানাথের এল কম্প দিয়ে জ্বর।
এঃ, এ যে তীরে এসে তরী ডুবতে বসল দেখছি। বলে মুখ বেজার করল ব্রজমাস্টার।
মহিম মণ্ডল বলল , গতরে খাটার লোক দিতে পারব। তবে তারা এ ব্যাপারে আনাড়ি।
তাই দিন। কাজ তো চালাতে হবে।
দুটো মুনিশ আর ঘটু মিলে ফের লেগে পড়ল। সোমবার মাঝরাতে কেসিং-এর পাইপ তিনশো ফুট নামল বটে, কিন্তু ঘটুর তখন হাতে–পায়ে সাড়া নেই।
মাঝখানের পাইপ নামানো সাবধানের কাজ। রেঞ্চ দিয়ে ঠিকমতো আটকে না রাখলে একখানা পাইপও যদি পিছলে ভিতরে পড়ে যায় তো চিত্তির। সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে। এ কাজ আনাড়ি দিয়ে হওয়ার নয়। জ্বর গায়েই তারানাথ এসে হাত লাগাল। পচা আর হাঁদুও লেগে পড়ল ফের। হাঁদু চুপিচুপি ঘটুকে বলল , আমার ঠাকুরদা রক্ত আমাশায় মারা গিয়েছিল। আমারই সেটাই হয়েছে, তলপেটে বড় যন্ত্রণা।
সাত-আট ঘণ্টা খাটার পর দু-ঘণ্টা ধরে ঘুমোচ্ছে তারা। কিন্তু তাতে শরীরের আবল্যি যাচ্ছে না। পাইপ নামানোর সময় রেঞ্চ ধরা হাত দু-খানা থরথর করে কাঁপছিল ঘটুর। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রইল। চোখ বুজলেই সাইকেল। সাইকেলখানা দেখতে পেলেই বুকখানা যেন ভরে যায়। নীচু হ্যান্ডেল, শ্যাওলা সবজে রং, ঝকঝকে ক্যারিয়ার।
হড়াক করে একটা শব্দ হওয়ায় চটকা ভাঙল ঘটুর। সবাই চেঁচাচ্ছে, গেল! গেল! রেঞ্চ তার ঘুমন্ত হাত থেকে আলগা মেরে পাইপ সরসর করে নেমে যাছিল। ঘটু প্রাণ হাতে নিয়ে দুহাতে সাপটে ধরল পাইপ। কাদা জলে পিছল হাত। আর চারখানা জোড়ের ভারী পাইপ। ধরে রাখতে হাতির জোর চাই। তবু ধরে রইল ঘটু। অন্য সবাই হাত না লাগালে হয়ে যেত।
না, ব্রজমাস্টার বকল না। বরং বলল , ওর দোষ কী? শরীর বলে কথা। ও ঘটু, যা বরং জর্দা দিয়ে একটা পান খেয়ে আয় ঘুমের চটকাটা যাবে।
পান আর খেতে হল না। দু-খানা হাতের তেলোর দিকে চেয়ে ঘটু জলভরা চোখে দেখল, হাত দু-খানা ছড়ে কেটে একশা। ভারী পাইপ ধরে রাখতে গিয়ে কেসিং-এর কানায় চেপে গিয়ে গর্ত হয়ে কেটেছে পঞ্জার তলার দিকটা। কলের মতো রক্ত পড়ছে। সাধু গায়েন রেঞ্চটা নিজের হাতে নিয়ে বলল , যা, ঘাস ঘেঁতো করে লাগা।
তাই লাগাল ঘটু। বাবুভাইদের হাত হলে ভোগাত। মিস্তিরির হাত বলে তেমন গা না করলেও চলে। তবে বসে থাকতে ভয় হচ্ছে ঘটুর। মহিম মণ্ডল যদি কথা তোলে, আমার মুনিশ খাটছে, তোমার লোক বসে আছে, আমি মজুরি কাটব। মুনিশ দুটোকেও তো দিতে হবে। তারা তো মাগনা খাটছে না!
কথাটা তারানাথের কানে দিল ঘটু। তারানাথ বলল , না রে, মহিম দিলদরিয়া লোক। কাটবে না।
মঙ্গলবার রাতে যখন পাইপ নেমে গেল, আর মুখ সিল করা হল তখন ঘটুর হাতে বড় বড় ফোস্কা। লেবুকাঁটা দিয়ে ফোস্কা গেলে মরা চামড়া সরিয়ে দিল সে নিজেই। তারপর বিষহরি তেল লাগাল। গরিবের হাত এতেই সারে। না সারলে কি চলে?
সারারাত জল ঢালা হল পাইপে। প্রথমে গোরবগোলা, তারপর সাদা জল। পাম্প চালিয়ে জল বের করা হতে লাগল। সবাই টান টান। জলের প্রেশার যেমন, ঠিকমতো মোটা নালে ওঠে কি না। ওঠে।
বুধবার ভোরবেলা ভোগবতী মহিম মণ্ডলের পাইপ বেয়ে উঠে এলেন। ফুরফুরে জল। পরিষ্কার ঝকঝকে।
বিয়েবাড়ির তুমুল হইরইয়ের মধ্যেও মহিম ছুটে এসে পিঠ চাপড়ে দিল ব্রজমাস্টারের কাজ দেখালে বটে বাপু! তাজ্জব!
জল ট্যাঙ্কে উঠে যাচ্ছে ডিজেল পাম্পে। বিয়েবাড়ি ভাসাভাসি।
কাজ শেষ করে তারা বাইরের দিককার ঘরের বারান্দায় বসে আছে পাশাপাশি। সামনের ফাঁকা মাঠে রাতারাতি মস্ত ম্যারাপ বাঁধা হয়ে গেছে। এই ম্যারাপের নিচেই সাঁঝবেলায় বিয়ের আসর বসবে। মণ্ডলের পো জামাইকে ঢেলে দিচ্ছে। স্কুটার, টিভি, আরও কী-কী সব যেন। জামাইও জম্পেশ। মস্ত চাকরি।
কাজের মেয়ে বলে গেছে আজ মুড়ির সঙ্গে গরম বোঁদে দেওয়া হবে, আর দুখানা করে সন্দেশ। আর বেগুনিও। কিন্তু কারোই তেমন গা নেই। শরীর নিংড়ে দিতে হয়েছে গত চার দিনে। কাজটা উঠে গেছে এই যা একটা ভালো খবর।
গুরুপদ হিসেব কষছিল। কষে বলল , আরও হাজারখানেক হলেই হয়ে গেল।
সাধু গায়েন দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসেছিল। বলল , আমার এখনও ঢের দেরি। যতীন মজুমদারের জমিটা আড়াই কাঠা। তাও দশ হাজার চাইছে।
এইসব কথাবার্তা হচ্ছিল। সকলেরই দমসম অবস্থা। গড়িয়ে নিতে পারলে হয়। হঠাৎ একটা শোরগোল মতো শোনা গেল ভিতরবাড়ি থেকে।
গুরুপদ সোজা হয়ে বসে বলল , গোল কীসের?
তারানাথ বলল , বিয়েবাড়িতে অমন হয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পুরোনো খার থাকে কিনা।
একটু বাদেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল ব্রজমাস্টার, ওরে, সর্বনাশ হয়েছে। বাবুর মেয়ে পালিয়ে গেছে।
সবাই সোজা হয়ে বসল।
ব্রজমাস্টার উত্তেজিত হয়ে বলল , সকালে কুয়োপাড়ে মুখ ধোয়ার নাম করে গিয়েছিল। সেখান একটা ছোঁকরা সাইকেল নিয়ে তৈরি ছিল। রডে তুলে নিয়ে হাওয়া।
তারানাথ বলল , তা হলে কী হবে?
কী আর হবে। মহিমবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। গিন্নি মূৰ্ছা গেছেন। চারদিকে লোক গেছে মেয়ে খুঁজতে। কিন্তু খুঁজে পেলেও লাভ নেই। রা পড়ে গেছে। পাত্রপক্ষ গায়ে হলুদের তত্ব নিয়ে এসেছিল, তারাও জেনে গেছে। বিয়ে ভেস্তেই গেল ধরে নাও।
