ঘটু বলল , তা হলে তোমার পরিবার থাকে কোথায়?
সে অনেক বৃত্তান্ত। নব দাস নামে এক গেরস্তবাড়িতে আমার বউ কাজের লোক। তা সেই বাড়িতেই গোয়ালঘরের পাশে একখানা লাকড়ির চালায় থাকে। জায়গা মোটে নেই। সেখানে আবার আমার থাকা বারণ। দিনমানে গিয়ে দেখা করা যায়, সন্ধের পর আর নয়। বর্ষাকালে ঘরে একহাঁটু জল হয়, তার মধ্যেই বউ দুটো বাচ্চা নিয়ে থাকে কোনওক্রমে।
তারানাথ খুব হাসছিল। বলল , ওই জন্যই তো বিয়েটা করিনি। বোনের বিয়ে দিতে গিয়ে সব ফরসা হয়ে গেল। দাঁতে কুটো চেপে এই পড়ে আছি মাস্টারের সঙ্গে। মাস্টার যদি কোনওদিন পেছুতে লাথি মেরে তাড়ায় তা হলেই হয়ে গেল।
গুরুপদ বলল , আহা, একাবোকা মানুষের আর চিন্তা কীসের? নিজের একখানা পেট ও ঠিক চলে যাবে। কাজও শিখছিস তো!
এ কাজের ভরসা কী বলো! লাইনে মিস্তিরি কিছু কম আছে? আর একাবোকাই কি চিরটাকাল থাকার ইচ্ছে ছিল?
ওরে কলের মিস্তিরির ভাত মারে কে? লেগে থাকলে কখনও না খেয়ে মরবি না।
পচা আর হাঁদুর বয়স কম। তাদের বিয়ে–টিয়ে হয়নি। তবে সংসারের খাঁই আছে। তারা ইদিকে কান না দিয়ে মুড়ি খেতে-খেতে হিন্দি সিনেমার গল্প করছিল। পরশু রাত্তিরেই একখানা মেরে এসেছে ভিডিও হল–এ। পচা মুড়ি খেতে-খেতেই সেই ছবির একখানা হিট গানের কলি গলায় খেলানোর চেষ্টা করছিল।
ঘটুর বয়স পচা বা হাঁদুর মতো কম নয়। তার বাইশ চলছে। সেও একাবোকা লোক। তারও থাকার জায়গা নেই। কিন্তু সেসব নিয়ে তার মাথা গরম হয় না। চোখ বুজলেই সে একখানা সাইকেল চোখের সামনে ভাসতে দেখে। মানুষ মেলা যন্তর আবিষ্কার করেছে বটে, কিন্তু সাইকেল হল একেবারে গন্ধমাদন। নিঝঞ্ঝাট জিনিস। পাঁইপাঁই করে উধাও হয়ে যাও। আবার সময়মতো ধীরেসুস্থে ফিরে এসো।
তা গুরুপদ যদি মাস্টারকে ছেড়ে নিজের ব্যাবসা খোলে তা হলে একটা জায়গা খালি হবে।
সেই জায়গায় উঠবে সাধু গায়েন। সাধু গায়েনের জায়গায় এক ধাপ উঠবে তারানাথ। তখন ঘটুর চাকরি পাকা হবেই।
চাকরি পাকা হলে মজুরি বাড়বে।
মজুরি বাবদেব্রজমাস্টারের কিছু গণ্ডগোল আছে। ব্রজমাস্টার একটা মোটা হিসেবে খদ্দেরের কাছ থেকে টাকা নেয়। কর্মচারীদের দেয় নিজের হিসেবমতো। গুরুপদ বা সাধু গায়েন যা পায় তারানাথ তা পায় না। তা সে হতেই পারে। পুরোনো লোক বলে কথা! কিন্তু সেই হিসেবে পচা বা হাঁদুর চেয়ে বেশি পাওয়ার কথা ঘটুর। কেন না সে ওদের চেয়ে মাস ছয়েকের পুরোনো। কিন্তু কে সে কথা বলতে যাবে?
তবে মাস্টার খুব একটা মন্দ লোক নয়। কর্মচারীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে না। ধর্মভীরুও আছে। আর খুব কাজ পাগল লোক।
গাঁ দেশে সন্ধের পর আর কিচ্ছুটি করার থাকে না। মুড়ি খেয়ে গুরুপদ বারান্দার এক কোণে মাদুর বিছিয়ে শুয়ে পড়ল। সাধু গায়েন আর তারানাথ বসে-বসে নানা সুখ দুঃখের কথা কেঁদে বসল। পচা আর হাঁদু বেরিয়ে পড়ল ফের ভিডিও দেখবে বলে। উদয়পুর থেকে মাইলটাক উজিয়ে গেলেই মেহেরগঞ্জে আজ হাট। ভিডিও সেখানে আছেই। পচা একবার আলগোছে জিগ্যেস করল বটে, যাবে নাকি ঘটুদা? ঘটুর ইচ্ছে হল না। ঝাড়পিট আর আশনাই আর নাচা গানা সবসময়ে ভালো লাগে না। বরং চোখ বুজে একখানা স্বপ্নের সাইকেলে সওয়ার হলে অনেক ভালো।
সাইকেলখানা দিব্যি দেখতে পাচ্ছিল ঘটু। শ্যাওলার মতো সবজে রং ঝকঝকে ক্যারিয়ার, গোল ডিবের মতো বেল, একটু নীচু হ্যান্ডেল। সাঁই সাঁই করে যাচ্ছে পাকা রাস্তা ধরে। সিটের ওপর ঘটু…
ব্রজমাস্টার আর মহিম মণ্ডল কথা কইতে কইতে ভিতর–বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
ব্রজমাস্টার কথা বলছিল, এত তাড়াতাড়ি কি এসব কাজ হয় মহিমবাবু? সবে তো বাঁশটাশ লাগানো হল। এরপর বড় পাইপ ঢুকবে। তারপর জলের পাইপ, চাট্টিখানি কথা তো নয়। আজ শনিবার, সামনের শনিবারের আগে হচ্ছে না, যদি তাও হয়।
মহিম মণ্ডল ঠান্ডা গলাতেই বলল , সবই বুঝি হেব্রজ। বলছি তো তিনগুণ মজুরি দেব।
করে দাও। মেয়ের বিয়েটা হুট করে ঠিক হয়ে গেল কিনা। বুধবার বিয়ে। তুমি বুধবার সকালের মধ্যে কাজ সেরে দাও।
বুধবার যে অসম্ভব মহিমবাবু। তিনশো ফুটের ওপর পাইপ ঢোকান কি চাট্টিখানি কথা?
তুমি ওস্তাদ লোক, মন করলে কী না পারো! দিনরাত কাজ করলে হয়ে যাবে। মজুরি চারগুণ দেব।
টাকা বাড়ালেই তো হবে না। এগুলো তো মানুষ, মেশিন তো নয়। চারদিন টানা চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করলে যে মরে যাবে।
আমার সম্মানটা রাখো মাস্টার। পাত্রপক্ষ বড়লোক, তাদের কথার নড়চড় নেই। পাত্র গোরক্ষপুর থেকে এসেছে, বিয়ে করে শুক্রবার বউভাত সেরেই চলে যাবে কাজের জায়গায়। এ পাত্র হাতছাড়া হলে তো চলবে না।
কী মুশকিল! পাত্র হাতছাড়া হতে যাবে কেন? হোক না বিয়ে, আমরা না হয় বিয়েটা ফাঁক রেখে দু-দিন পরেই কাজ করব।
আহা, আমি যে শ্যালো বসালুম তা তাদের দেখাতে হবে না? তারা বড়লোক, কিন্তু আমিও কম কীসে? শ্যালোতে ভটভট জল উঠবে, ট্যাঙ্কে জমা হবে, হুড়হুড় করে পাইপ দিয়ে পড়বে, দেখে তাদের চোখ ট্যারা হয়ে যাবে, তবে না!
এ যে বড় মুশকিলে ফেললেন মশাই। আমি রাজি হলেও আমার লোকেরা কি রাজি হবে ভাবছেন?
ডাকো তাদের, মজুরি চারগুণ তো পাবেই, তার ওপর আমি প্রত্যেককে দুশো টাকা করে বকশিস দেব।
