ব্রজমাস্টার হচ্ছে এ অঞ্চলের নামকরা টিপকলের মিস্তিরি, শ্যালো আর টিউবওয়েল বসানোর কাজে তার মতো এ তল্লাটে আর কেউ নেই। ব্রজমাস্টার মরুভূমি থেকেও জল বের করতে পারে। মজুরিটি ন্যায্য, কাজে গাফিলতি নেই, কথার খেলাপ হয় না। ব্রজমাস্টারের তাই সারা বছর দম ফেলার সময় থাকে না। শুধু নতুন কল করাই তো নয়, পুরোনো কল খারাপ হলে মেরামতির কাজেও তাকেই চতুর্দিক থেকে ডাকাডাকি।
ব্রজমাস্টারের সাকরেদ হওয়াও চাট্টিখাঁটি কথা নয়। পিছন–পিছন ঘুরলেই হবে না। ব্রজমাস্টার যাকে নেয় দেখেশুনেই নেয়। যারা বেশি খায় বা বেশি ঘুমোয় তারা প্রথমেই খারিজ। একবারে কথা বুঝতে পারে না বা বেশি ফড়ফড় করে তারাও বাতিল। যারা কথা কইতে ভালোবাসে বা নেশাভাঙ বেশি করে ফেলে তাদেরও সুবিধে নেই। ব্রজমাস্টার নেয় শুধু কাজের লোক।
ঘটু কাজের লোক কি না, তা সে নিজেও জানে না। কানাই মণ্ডল হল ব্রজ মিস্তিরির ভগ্নীপোত। ঘটু আজ বছরতিনেক কানাইয়ের তাঁবেদারি করে যাচ্ছে। সব কাজেরই যে ফল ফলে তা নয়। তবে কানাই ঘটুর জন্য এটুকু করেছিল। ব্রজ মিস্তিরির সঙ্গে জুতে দিল তাকে। খোরাকিটা হয়ে যায়। দু-পাঁচ টাকা হাতে থেকেও যায়। আপাতত এটুকুই। তবে কাজ শিখে যদি হাতযশ হয় তাহলে হাত উপুড় করলেই পর্বত।
তা ঘটু লেগে আছে। ছিনে জোঁকের মতোই লেগে আছে। কারণ তার যাওয়ার জায়গা নেই। তাদের সমাজে মা মরলেই বাপ তালুই। অর্থাৎ তখন বাপে আর তালুইমশাইতে তফাত থাকে। বাপ আবার বিয়েতেও বসেছে। সুতরাং ওদিকের পাট চুকেবুকে গেছে বলে ধরাই ভালো।
পিছনের দিকটার ঝাঁপ পড়ে গেছে বটে, কিন্তু সামনের দিকটা খোলা। ব্রজমাস্টারের হাতের কাজটি নিজের হাতের তুলে নিতে পারলেই হল। তুলছেও ভালো। গোরাচাঁদের পাম্প মেশিনে জল উঠছিল না। ব্রজমাস্টার তখন অন্য কাজে ব্যস্ত। বলল , যা দিকিনি, ব্যাপারটা দেখে এসে আমায় বল। ডিফেক্টটা যদি ধরতে পারিস তবে বুঝব কাজ শিখেছিস।
তা গিয়ে দেখেশুনে এসে ঘটু বলল , কেসিং পাইপে ফুটো হয়ে হাওয়া ঢুকে যাচ্ছে। নতুন করে পাইপ বসাতে হবে বলে মনে হচ্ছে।
ব্রজমাস্টারও গিয়ে দেখল, তাই। বলল , ঠিকই ধরেছিস তো!
গাঁয়েগঞ্জে গেলে গাহেকের বাড়িতেই থাকা–খাওয়া। খাবারদাবারও বেশিরভাগ সময়েই সুবিধের নয়। মোটা ভাত, ডাল, একটা ঘ্যাঁট হলেই যথেষ্ট। তবে উঁচু নজরের লোকও কি নেই? মাঝে-মাঝে তারাও আছে বলেই ঝপ করে পাতে একটা মাছের টুকরো বা একখানা আস্ত ডিম নেমে আসে।
তবে সব মিলিয়ে ফুর্তিতেই আছে ঘটু। এক জায়গায় বাঁধা জীবন নয়। এ-গাঁ ও-গাঁ–গঞ্জ ঘুরে ঘুরে বেশ কাটে সময়। তে কাঠির বাঁশ, পুলি, রেঞ্চ বয়ে–বয়ে বেড়ানো।
সাইকেলের বাইটা চাপল পিরপুরে গিয়ে। পিরপুর বড় জায়গা, মস্ত পিরের দরগা আছে। হরেরাম মুস্তফির বাড়িতে কাজ হচ্ছিল। বিকেলের দিকটায় একটু ফুরসত পেয়ে মুস্তফির বাড়ির বাইরের মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে ঘটু দেখছিল, মুস্তফির তেরো-চৌদ্দ বছরের ছোট ছেলেটা সাইকেল চালাচ্ছে। হঠাৎ সেই ছেলেটা তাকে বলল , চালাবে? চালাও।
ছেলেটা দেখতে যেমন ফুটফুটে সুন্দর তেমনি বড্ডই ভালো। এরকমধারা আজকাল কি আর কেউ কাউকে বলে? ঘটু খুব খুশি। কিন্তু সমস্যা হল সে জন্মে সাইকেল চালায়নি। সে কথা বলতেই ছেলেটা বলল , আরি বাঃ, তা হলে শিখে নাও। খুব সোজা।
কথাটা সোজা হলেও কাজটা সোজা ছিল না। আর সাইকেলও সোজা জিনিস নয় মোটেই, কেবল এ-কাত ও-কাত হয়ে ঢলে পড়ে। ঘণ্টাটাক অনেক কসরত করল ঘটু। বারদশেক আছাড় খেল। শিখতে পারল না বটে, কিন্তু সাইকেল সেই যে তার মাথায় ঢুকল আর বেরোতে চায় না।
উদয়পুরে কাজ হচ্ছে। মহিম মণ্ডলের বাড়িতে শ্যালো বসছে। পাইপ টেনে খেত বরাবর নিতে হবে। অনেক টাকার কাজ। সন্ধের পর কাজের ছুটি হল। মহিম মণ্ডল বড় গেরস্ত। সাঁঝবেলায় ধামাভরতি মুড়ি আর কয়েক চাকা গুড় পাঠিয়ে দিলে ঝিয়ের হাতে।
গুরুপদ, সাধু গায়েন, তারানাথ, পচা, হাঁদু আর ঘটু গোল হয়ে বসে গেল মুড়ি খেতে। গুড়টার স্বাদ বড় ভালো।
গুরুপদ বড় মিস্তিরি। নিজের কারবার খোলার তালে আছে। মুড়ি খেতে-খেতে বলল , আর হাজার দুই টাকা পেলেই আমার হয়ে যায়।
কী হয়ে যায় সবাই জানে। গুরুপদর বাড়ি জমি মহাজনের কাছে বাঁধা আছে। খেটেপিটে রোজগার করে কর্জটা মেরে এনেছে প্রায়। বাড়ি জমি ছাড়াতে পারলেই গুরুপদ নিজে ব্যাবসা করবে। কাজও জানে ভালোই।
ঘটু বলল , তা দুহাজার হতে আর কতদিন লাগাবে মনে হয়?
মেরেকেটে দুটো মাস।
তারপর তো তুমি রাজা।
গুরুপদ উদাস সুরে বলল , ধুর। রাজা গজা আবার কী রে? বাপ পিতেমোর ভিটে, সেইটুকু রক্ষে করতে পারলেই যথেষ্ট। কুলাঙ্গার বলেই না বাঁধা রেখেছিলাম। তা ওই ভিটেটুকু আর তিন বিঘের চাষ ছাড়া আর কী আছে যে রাজা হব! তবে এটুকু হাতে এলে একটা মনের জোর হয়। তখন লড়া যায়।
পাম্প মিস্তিরির কাজই করবে তো?
তা ছাড়া আবার কী? একটু টাকা-পয়সা হলে একখানা মুদির দোকান দেওয়ার ইচ্ছে আছে। বউ সেটা চালাবে। আমাদের গাঁয়ে মুদির দোকান তেমন নেই। হরি সাউয়ের একখানা দোকান আছে বটে, কিন্তু লোকটা বড় ক্যাচালে। কেউ তাকে তেমন পছন্দ করে না।
সাধু গায়েন মুড়ি চিবোতে চিবোতে বলে, তাও তোমার একখানা বাড়ি আছে, আমার তো তাও নেই। যাও-বা ছিল তা সব বেচেবুচে দিয়ে সেবার মায়ের চিকিৎসা করালাম। তা মাও বাঁচল না।
