শান্তশীলের দুটি মেয়ে আছে। এ সময়ে তাদের স্কুল। রোজ নয়, তবে মাঝে-মাঝে তারা দুটি করুণ উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে বাবাকে দেখতে আসে। মধুশ্রী আসে রোজ। আসে নিজস্ব গাড়িতে। ফেরার পথে মার্কেটিং করে যায়।
শান্তশীল খুব স্থির অপলক চোখে মধুশ্রীর দিকে চেয়ে রইল। এইভাবে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কটাকে খুঁজে দেখছিল। কীরকম সম্পর্ক, কোন সম্পর্ক, কোথায় তাদের যোগসূত্র? এ একটি নারী, সে একজন পুরুষ সেটাও একটা সম্পর্ক বটে, কিন্তু বড্ড পলকা। আরও গভীর কিছু নেই? আরও অবিনশ্বর কিছু?
তুমি তো ভালোই আছ এখন। ডাক্তার গুহ বলছিলেন–আর এক সপ্তাহ পরে ছেড়ে দেবেন।
এক সপ্তাহ! এক সপ্তাহে ক’টা দিন? কত ঘণ্টা? কত মিনিট? কত সেকেন্ড? মধুশ্রী কি জানে নার্সিংহোমের এই ঘরে এক-একটা সেকেন্ড কত লম্বা হয়?
শান্তশীল নির্বিকার মুখে বলল , ওঃ।
একটা সপ্তাহ দেখতে-দেখতে কেটে যাবে।
যেদিন তার হার্ট অ্যাটাক হয় সেদিন সকালে মধুশ্রীর সঙ্গে তার বিশ্রী একটা শো-ডাউন হয়েছিল। ঝগড়া তাদের মধ্যে কমই হয়। আসলে সেলস ইঞ্জিনিয়ার শান্তশীলকে কলকাতার বাইরে যেতে হয় খুব বেশি, অফিসের কাজ তার সময়টুকু রাক্ষসের খাবার কেড়ে খেয়ে নেয়। দুটি ফুটফুটে মেয়ে আর অভিমানী বউয়ের সঙ্গে কাটানোর মতো সময় আর তার হাতে বিশেষ থাকে না। কিন্তু সেদিন হয়েছিল। সাংঘাতিক শো-ডাউন। বুকের ব্যথার শুরু সেই থেকে। দুপুরে অফিসে ব্যথা বাড়ল। সন্ধেবেলা আরও। রীতিমতো তীব্র ব্যথা। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেল। একটা ক্লাব–ডিনার ছিল বিকেলে। শান্তশীল মদ দিয়ে ব্যথাটাকে ধুয়ে দিতে চেষ্টা করেছিল। সিগারেট খেয়েছিল পর পর। ব্যথা উঠতে লাগাল মাথায়। বিপদ বুজে সে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল পার্টি থেকে। গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছোতে পারলেই যথেষ্ট।
পারেনি। তবে গাড়ি পার্ক করার চত্বর অবধি চলে গিয়েছিল সে। তারপর বুক চেপে ধরে বসে। পড়ল মাটিতে। ড্রাইভার নঈম তাকে দেখতে পেয়েছিল আরও কিছু পরে। লোক জড়ো করে শান্তশীলকে সে ধরাধরি করে গাড়িতে তোলে এবং বুদ্ধিমানের মতো সোজা নিয়ে আসে নার্সিংহোমে। তারপর বাড়িতে খবর দেয়।
মেয়েরা দাম্পত্য কলহের কথা সহজে ভোলে, ছেলেরা ভোলে না, শান্তশীলের জিবে যে বিস্বাদ এখনও লেগে আছে, তা ওই দিনের ঝগড়ার স্মৃতি জড়িয়েও।
মধুশ্রী এমনিতে দেখতে খারাপ নয়। রাস্তায় ঘাটে পুরুষরা দু-একবার ফিরে তাকাতে পারে। পঁয়ত্রিশ, কিন্তু পঁয়ত্রিশ বলে মনেও হবে না। তা এই মধুশ্রীকে দেখে শান্তশীলের কোনও প্রতিক্রিয়া হচ্ছেনা। লক্ষণটা কী খারাপ?
তুমি নিজে কেমন ফিল করছ?
ভালো।
চোখের কোণে জল কেন বলো তো! কেঁদেছ নাকি?
না। ও এমনিই। চোখ জ্বালা করেছিল।
তোয়ালে দিয়ে চোখ মুছিয়ে দিল মধুশ্রী। তারপর বলল , এরা এত করছে তোমার জন্য যে, আমার আর কিছু করার থাকছে না। আমি দেখি, চলে যাই, কোনও মানে হয়?
কেন, সেবা করতে চাও?
কিছু করতে পারলে ভালো লাগত।
এই তো ভালো।
জানি। দে আর প্রফেশনাল পিপল। আমরা তো এদের মতো পারব না। তবু মনে হয়, আপনজনের অসুখ করলে কিছু করতে পারলে ভালো হয়।
শান্তশীল চোখ বুঝে বলল , ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল।
আমাদের সময়ও কাটছে না। ক’দিন যা টেনশন গেল। কাল রাতে একটু ঘুমোতে পেরেছি।
এতদিন ঘুমোওনি?
হয় নাকি? যা টেনশন।
শান্তশীল জানলায় চড়াই দেখতে পাচ্ছিল। এখন শার্সি বন্ধ। কিন্তু শার্সির বাইরে দুটো চড়াই বরাবর চক্কর খাচ্ছে। হয়তো একটা মেয়ে চড়াই, অন্যটা পুরুষ।
শান্তশীল কোনও দিনই আবেগপ্রবণ নয়। আর পৃথিবীর কোনও মানুষের প্রতিই তার কোনও নাড়ি ছেঁড়া টান নেই। তার মা থাকে শান্তশীলের ছোট ভাইয়ের কাছে। জব্বলপুর। এত গুরুতর অসুখের পরও মা’কে দেখতে ইচ্ছে করেনি তার। তার দুটি ফুটফুটে মেয়েকে সে ভালোবাসে বটে, কিন্তু সেরকম বাড়াবাড়ি কখনও করে না। তবে আবেগহীনতা তাকে মাঝে-মাঝে বিপদে ফেলে দেয়। বাবা মারা যাওয়ার পর কাঁদা দূরের কথা, সে এত স্বাভাবিক আচরণ করেছিল যে মা পর্যন্ত ওই শোকের সময়েও তার ওপর রেগে উঠেছিল।
অবসন্ন শান্তশীল চোখ বুঝে ভেবেছিল, সে কি একটু নিষ্ঠুর? হৃদয়হীন?
যখন চোখ মেলল শান্তশীল তখন মধুশ্রী চলে গেছে। শুধু দম বন্ধ করা গন্ধটা রেখে গেছে ঘরের বাতাসে।
নার্স ঘরে নেই। সবসময়ে থাকে না। সে ঘুমোচ্ছে দেখে হয়তো করিডোরে বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা মারছে। অসুবিধে নেই, হাতের কাছেই কলিং বেল আছে। বোতাম টিপলেই দৌড়ে আসবে। কিন্তু তাকে ডাকবার কোনও প্রয়োজন আপাতত নেই। একটু জলতেষ্টা পেয়েছে। তেমন কিছু নয়, একটু পরে জল খেলেও চলবে। শান্তশীল জানলার দিকে চেয়ে হতাশ হল। রোদ্দুর আসছে বলেই বোধ হয় পুরু পরদায় গোটা জানলাটা ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রেক্ষাগৃহের মতো এই ঘরে আর কতদিন তাকে শরীরে বন্দি হয়ে থাকতে হবে?
শান্তশীল বুকের ভারটা টের পাচ্ছে এখনও। শরীরের অবসাদও। খুব ধীরে সে কনুইয়ের ওপর ভর রেখে উঠে বসবার চেষ্টা করল। মাথার মধ্যে কেমন একটা পাক মেরে চোখে অন্ধকার দেখল কিছুক্ষণ। তারপর সে-ভাবটা কেটে গেল। খুব ধীরে-ধীরে শরীরে যতদূর সম্ভব কম চাপ দিয়ে সে উঠে বসল। এই সামান্য পরিশ্রমেই কি হাঁফ ধরল তার? বড়-বড় শ্বাস ফেলতে লাগল
