সন্ধের পর একটু ফাঁক পেয়েই কমললতা বুড়োমানুষটার ঘরে আসে। ডিসপেন্সারি থেকে উঠে এসে কখন বিছানায় শুয়েছে। লণ্ঠনের আলোয় কমললতার মুখের দিকে চাইল। বলল –মাছিটা কেবল বসছে।
–কোথায় মাছি?
–কপালে। সকাল থেকে উড়ে–উড়ে বসছে!
কমললতা কপালটা দেখে। বলে–নেই তো।
–আছে।
কমললতা যতীন ডাক্তারের মুখখানা দেখে ভালো করে। চোখ ঘোলা আর লালচে। শ্বাস গরম। কপালে হাত চেপে ধরলে বোঝা যায়, শিরার মধ্যে রক্ত লাফাচ্ছে। কমল বলে–আমি কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি।
–তুমি থাকো।
–থাকার জো কী? বিষ্ণুচরণ এলেই তাড়াবে।
–না। তুমি থাকো।
–আচ্ছা, শরীরটা কি খারাপ?
–না। বড় একা লাগে।
–একা কেন? সবাই রয়েছে।
–কেউ নেই।
কমললতার চোখে জল আসে। গাল বেয়ে নামে। নাকে সর্দি টানার শব্দ হয়। একটা গাঢ় শ্বাস ফেলে সে। সংসার বড় মায়াহীন।
ডাক্তার দেখে কমললতা চাঁদকে লণ্ঠনের মতো ধরে আলো দেখাচ্ছে। ডাক্তার ওঠে। বলে–দাঁড়াও, ওষুধ বানাচ্ছি।
–বানাও।
এ ওষুধে দুজনের সব সেরে যাবে, বুঝলে কমল?
–জানি। তুমি ধন্বন্তরী।
ডাক্তার জ্যোৎস্নার লণ্ঠনে কমললতার সঙ্গে পথ চিনে বাগানে যায়। ফুল তুলে আনে। চুপিচুপি ডিসপেন্সারিতে ঢোকে দুজন। ডাক্তার একটা ঝিনুকে ফুল টিপে মধু ফেলে ক’ফোঁটা। একটু জ্যোৎস্না মেশায়। একটু চোখের জল তার সঙ্গে। আর দু-ফোঁটা অ্যাকসিস।
–অমৃত। ঝিনুকটা তুলে ডাক্তার বলে।
–জানি।
–দুজনে খাই, এসো।
স্বপ্নটা ভেঙে যায়। ডাক্তার জাগে। কেউ কোথাও নেই। মাথার মধ্যে তীব্র যন্ত্রণা সব বোধ গুলিয়ে দেয়।
যতীন ওঠে। তারপর শূন্য ডিসপেন্সারিতে গিয়ে ঢোকে। অন্ধকার। খোলা জানালা দিয়ে দুধের মতো জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে ঘর।
আধছায়ায় যতীন ডাক্তার উলটোদিকের চেয়ারটায় গিয়ে বসে। তারপর নিজের বসা শূন্য চেয়ারটার দিকে চেয়ে বলে–ডাক্তারবাবু, আমার বড় অসুখ। বড় অসুখ।
হরিচরণ তখন বউকে জড়িয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে হাতে পায়ে বেঁধে রেখেছে। নারায়ণী ঘুমের মধ্যে ঠেলা দিয়ে বলে–আঃ, দম আটকে মারবে নাকি বাপু?
হরিচরণ ঘুমচোখে বলে–তুমি যা দুষ্টু হয়েছ।
উঃ সরো বাপু। গরম লাগছে।
হরিচরণ বলে–তোমার জন্যে সবসময়ে ভয়ে-ভয়ে থাকি।
নারায়ণী পাশ ফিরে বলে–ইঃ।
তখন হামলে তাকে আদর করতে থাকে হরিচরণ। বাধা মানে না।
.
বিষ্ণুচরণ বউয়ের গা–ঘেঁষা ভাব পছন্দ করে না। লাইনের ওধারে তার আবার মেয়েছেলে রাখা আছে। এক কাতে শুয়ে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কাঁচা ঘুমটা ভাঙিয়ে বউ বলল –কমল কিন্তু অনেক সেবা–টেবা করেছে।
–করুকগে। আর ঢুকতে দিও না।
মায়া পড়ে গেছে তোমাদের ওপর।
–হুঁ। শেষমেশ বাড়ির অংশ চাইবে। তা ছাড়া কলঙ্ক। আপদ যখন বিদেয় হয়েছে, আর না।
–কোলেপিঠে করেছে তোমাদের।
–খুব দরদ যে!
–বলছিলাম মাঝে মধ্যে আসে যদি আসুক।
–উঁহু। ফের যদি ঢুকতে দাও তো তোমার কপালে কষ্ট আছে।
–কিন্তু ওকে ছাড়া বুড়োমানুষটা যে থাকতে পারে না।
বিষ্ণুচরণ ঝাঁকি মেরে ওঠে–পারে না। অ্যাঁঃ। এই বুড়ো বয়সেও রস আছে নাকি? ভয় খেয়ে বড়বউ চুপ করে যায়।
.
ডিসপেন্সারি থেকে উঠে নিজের ঘরে আসে যতীন। আবার ডিসপেন্সারিতে যায়। তারপর বেভুল হয়ে এ-ঘর ও-ঘর ঘুরতে থাকে হারানো শিশুর মতো। ফুঁপিয়ে–ফুঁপিয়ে একটু কাঁদে। মাছিটা উড়ে–উড়ে বসছে জ্বতে, নাকে, কপালে সুড়সুড়ি পায়ে হাঁটছে, যতীন ডাক্তার চারধারে পৃথিবীর রহস্যটা গুলিয়ে ফেলতে থাকে। চাঁদের আলো, গাছপালা, ঘরদোর–সবকিছুই অবোধ চোখে দেখে। বিড়বিড় করে বলতে থাকে কমললতা মা, মা গো, কমলমা, মাছিটা তাড়িয়ে দাও…মাছিটা তাড়িয়ে দাও…মা…।
সাইকেল
বউ দিয়ে সে কী করবে? তার দরকার একখানা সাইকেল। সাইকেলের মতো জিনিস হয় না। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো করে উঠে পড়লেই হল। তারপর দু-খানা সরু চাকার খেল। এই খেলটাও বড়ই আশ্চর্যের। পড়ে যাওয়ার কথা, কিন্তু পড়ে না। ঘটুর দুনিয়াখানা এখন এসে জড়ো হয়েছে সাইকেলে। আর সাইকেলের রকমারি কম নয়। মদনবাবুর ছেলে কুঁড়োরাম কী জিনিসটাই কিনেছে। সবুজ রং নীচু হ্যান্ডেল, যায় যেন পক্ষীরাজ। হরিপদর সাইকেলে একখানা বাহারি বাতি আছে, পিছনের চাকায় তার কল। কলখানা চাকার গায়ে ঠেসে দিলেই হল, সাইকেল চালালেই টর্চবাতির মতো আলো। অত বাহারের অবশ্য দরকার নেই ঘটুর। নন্তের মতো পিছনের চাকার রডে একখানা পিচবোর্ডের টুকরো বেঁধে নেবে। চালালে চাকার স্পোকে লেগে শব্দ হবে ফটফট–ফটফট, ঠিক যেন মোটর সাইকেল যাচ্ছে।
বউয়ের দরকার না থাক, সাইকেলের জন্য বিয়ে করতেও রাজি আছে ঘটু। কিন্তু তাকে সাইকেল দেনেওলা শ্বশুর কি তল্লাটে ছুঁড়লেও পাওয়া যাবে? হাড়হাভাতে ঘটুকে মেয়েই দিতে চাইবে না কেউ, তো সাইকেল!
তা বলে কি ঘটুর বউয়ের অভাব? তা নয়। হাড়হাভাতে মেয়ের বাপ মেলাই আছে। তারা। মেয়ে পার করতে পারলে বেঁচে যায়, ঘটু চাইলে বিয়ের অভাব ঘটবে না। তা ঘটু সেটা চায় না। সে চায় সাইকেল।
ব্রজমাস্টার অবশ্য ভরসা দেয়। বলে, সাইকেল দেনেওলা শ্বশুর তোরও জুটবে। হাতের কাজটা আর-একটু শিখে নে, তারপর দেখবি। সাইকেল তো সাইকেল, সঙ্গে সেলাইমেশিন, এমন কি রেডিও অবধি পেয়ে যাবি। শুধু চাইলেই তো হবে না, চাওয়ার মতো পাত্তরও তো হতে হবে।
