–কী বলছেন?
–ওঃ! যতীন নাড়া খেয়ে ভারী ভয় পেয়ে যায়। মাথার মধ্যে লাল আলো নিভে একটা সাদা আলো জ্বলে। আবার সাদাটাও নিভে যায়।
–শিগগির আসুন।
–কোথায়?
–আপনার বউমাকে সাপে কামড়েছে।
ভিতরে একটা হুলুস্থূলের শব্দ হচ্ছে! সেই শব্দ থেকেই বড় বউ গলা তুলে বলে–সাপে কামড়াল কোথায়! কামড়ায়নি! পড়ে গেছে বাপু।
হরিচরণ বাবাকে একটা খোঁচা দেয়–পড়ে গেছে। বাচ্চাটা নষ্ট হতে পারে। আসুন।
–পড়ে গেছে। যতীন বড়-বড় চোখ করে চারিদিকে চায়। শালার মাছিটা। ঠিক বসে আছে এখন নাকের ডগায়। ছাড়ছে না। যতীন বলে–কী করব!
–একটু দেখুন।
–ডাক্তার ডাক।
–ডাকতে পাঠিয়েছি। সে তো দু-মাইল দূর থেকে আসতে যেতে তিন ঘণ্টা। তার মধ্যে কিছু যদি হয়ে যায়।
ডাক্তার ভাবে ওষুধের নাম কিছুই মনেই পড়ে না। অনেক ভেবে বলে—থুজা টু হানড্রেড।
–কী বলছেন?
–উঁহু। ডানদিকে ব্যথা তো? লাইকোপোডিয়াম দেওয়াই ঠিক হবে।
–ডানদিকে না কোনদিকে কে জানে। আপনি আসুন।
ছেলের দিকে ভীত চোখে চেয়ে থাকে ডাক্তার। বলে–আমি কিছু জানি না বাপু, আমার কিছু মনে পড়ছে না।
তার হাত ধরে একটা হেঁচকা টান দিয়ে হরিচরণ বলে–তা বলে একবার চোখে এসে দেখবেন না। আপনারই তো ছেলের বউ।
বিড়বিড় করে ডাক্তার বলে ছেলে না ইয়ে। তোমরা আমার কেউ না। বলতে-বলতেও ডাক্তার সঙ্গে-সঙ্গে যায়। হ্যাঁচকা টানে বুকের বাঁ-দিকে একটা খিচ ব্যথা ওঠে। মাথাটা দুটো টাল খায়। আলোটা দপ করে জ্বলে ফুস করে নিভে যায়।
ভিতরের ঘরে লোকজন জুটেছে মন্দ নয়। মেজবউ শুয়ে আছে খাটে। কোঁকাচ্ছে। শ্বাসকষ্টের কোঁকানি, চোখের তারা স্থির। মুখে গাঁজলার মতো কষ গড়াচ্ছে।
বিড়বিড় করে যতীন ডাক্তার বলে–নাক্স ভমিকা টু হানড্রেড! শিগগির।
হরিচরণ ছুটে যাচ্ছিল ডিসপেনসারিতে ওষুধ আনতে।
ডাক্তার মাথা নেড়ে বলে–না। ভুল।
–তবে?
–সালফার থার্টি।
–কী সব বলছেন?
–ভুলে যাই যে বাবা।
হরিচরণ কী করবে ভেবে পায় না। হাঁ করে চেয়ে থাকে অপদার্থ বাপের দিকে। যতীন ডাক্তার বিড়বিড় করে বলে–পুত্র আর মূত্র একই পথ দিয়ে আসে। বুঝলে? পুত্র যদি পুত্রের কাজ না করে সে তো মূত্র। নাকী?
কথাটা অবশ্য হরিচরণের কানে যায় না। কিন্তু সে লক্ষ করে এই দুঃসময়েও তার বাবা বিড়বিড় করে বকছে। এরকম কখনও করত না তো বুড়ো! পেগলে গেল নাকি!
বাঙালিয়া বাঁ-হাতে খৈনির গুঁড়োর ওপর ডান হাতে একটা আনন্দিত চাপড় মারে। কনুইয়ের ভাঁজ থেকে দুধের খালি বালতি ঝুলছে, মনে অনেক আশ্চর্য আলো এসে পড়েছে আজ। ভারী অন্যমনস্ক সে। একটা দেশওয়ালি গান গুনগুন করে গায় সে। হাতে একটা নরম স্পর্শ লেগে আছে এখনও।
কমললতার সঙ্গে দেখা।
–ক্যায়া হো কমলদিদি।
–ও বাড়িতে কী হয়েছে রে বাঙালু?
–সাপু কাটা নেহি। গিরে পড়ল।
–কে?
–বহুজী। যান না, দেখিয়ে আসন।
বিপদে বারণ নেই। কমললতা তাই এদিক-ওদিক একটু দেখে নেয়। ভয় করে। পঁচিশ বছর কাটিয়েও ভয়। তবু সে ঢুকে পড়ে।
–কী হয়েছে?
বলে সে সোজা ঘরে ঢুকে যায়। কেউ কিছু বলে না, বারণ করে না। সাহস পেয়ে কমললতা বিছানার কাছে উপুড় হয়ে দেখে নারায়ণীকে। মুখটা তুলে বলে–বড়বউমা একটু গরম জল করো, আর মালসায় একটু আগুন। এ কিছু না। ঠিক হয়ে যাবে।
কেউ কিছু বুদ্ধি খুঁজে পাচ্ছিল না। কমললতার কথায় যেন বিশ্বাস খুঁজে পায় সবাই। বড় বউ ধেয়ে যায় রান্নাঘরে। চোখের জল মুছে, উনুন থেকে হাঁড়ি নামিয়ে জল চাপায়।
কমললতা সাহস পেয়ে মেজবউয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসে হাওয়া করে। বহুকাল বাদে নিজের হারানো জায়গাটা যেন পেয়ে গেছে কমললতা। হরিচরণকে ডেকে বলে–তোর বাপের ঘর থেকে অ্যালকোহল দশ ফোঁটা একটু গরম দুধে দিয়ে নিয়ে আয়।
হরিচরণ কমললতার দিকে এক পলক চায়। চোখে কী ফোটে না জানে। তারপর বাপের ঘরের দিকে চায়।
যতীন ডাক্তার খাটের বাজু ধরে দাঁড়িয়ে চেয়েছিল। মেজবউয়ের দিকে নয়। মেজবউ বা পৃথিবী আর কিছুর কোনও অস্তিত্বই তো নেই। সে চেয়েছিল কমললতার দিকে। কাম কবে মরে গেছে, যৌবনের প্রেম বলতে কিছু নেই এখন। কিন্তু বুক জুড়ে আছে সহবাস। সে বিড়বিড় করে ডাকে কমল, কমল, কমল বড় একা ফাঁকা জগৎ। থাকো। এখানেই কেন থাকো না। থাকো।
কমললতা যতীনের দিকে চায়। বুড়োটার চোখ ঘোলাটে লাগে যে? বিড়বিড় করে কী বকছে। আহা, ওরা কি আর যত্ন করে?
সন্ধের দিকেই ঠিক হয়ে যায় মেজবউ। ডাক্তার দেখে গেছে। বলছে, গাইনির ডাক্তার দেখাতে। তবে ভয় নেই। বিকেলের দিকে মেজবউ ওঠা–হাঁটাও করল খানিক। চুল বাঁধল হাসল। হরিচরণ গেছে কলকাতা থেকে বউয়ের জন্য বলকারী ওষুধ আনতে।
সারাদিন কমললতা আজ এ বাড়িতে রয়ে গেল। মেজবউয়ের কাছেই রইল বেশিক্ষণ। যতীন ডাক্তার ডিসপেন্সারিতেই আগাগোড়া বসে আছে আজ। ভাত খেতে বসে অর্ধেক খেয়ে উঠে গেল দুপুরে। শরীরটা খারাপ নাকি! কমললতার বুকের মধ্যে কেমন করে। তিন-চারদিন আগে খবর এসেছে, সাধু মানুষটা মরেছে কুলটির হাসপাতালে। একটু কেঁদেছিল কমল। কান্নাটা মেয়েদের রোগ, নইলে সে মানুষের জন্য কান্নাই কী, দুঃখই কী! কমললতা ভালোবাসা যা পেয়েছে তা এই যতীন ডাক্তারের কাছে। কাছে যাবে সে উপায় নেই। কে কী বলে। বাড়ি থেকে বেরই করে দিল হয়তো। এ বাড়ির বাতাসে শ্বাস না নিলে বুক মরুভূমি হয়ে থাকে। সাধুটা মরে গেল! ডাক্তারও। কেমন যেন করছে। তাই এ বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিল না আজ। মেজবউয়ের সেবার নাম করে সারাটা দিন থেকেছে। বড়বউ ডেকে দুমুঠো খাইয়েছে দুপুরে। সে কথা ভাবতেই মনটা ভালো লাগে।
