লাচ্চুর অতীত বলতে যা, সেটা মনে না রাখলেও চলে। সব ভুলে যাওয়া যায়। একটা দুটো কথা মাঝে-মাঝে হানা দেবে ঠিকই। কিন্তু ওসব মাছির মতো উড়িয়ে দেওয়া যাবে। নতুন একটা সম্পর্ক হোক।
সন্ধেবেলা লাচ্চু গিয়ে দেখল আজ বাড়িটা একটু সাজানো হয়েছে। টেবিলের ওপর তার। বাবার ছবি বসানো, গলায় মালা, সামনে ধূপ জ্বলছে।
এসব কী? সবিতা একটু লজ্জা পেয়ে বলল , বিলু তার বাবার জন্মদিন পালন করছে। আজ কি বাবার জন্মদিন?
হ্যাঁ। এসব বিলুই মনে রাখে। বাবাকে খুব ভালোবাসত তো? আঠাশে কার্তিক কবে আসে ঠিক হিসেব রাখে।
ও।
ওর বাবা ওকে বলত একটা ছেলে ছিল, একটা মেয়ে, কাউকেই আদর দিতে পারিনি। দুটোই হারিয়ে গেল। তোরা হারিয়ে যাস না। আমাকে মনে রাখিস। শোনো, আজ তুমি এখানেই খেয়ে নাও। রান্না করছি।
লাচ্চু খেল। মাথা নীচু করে, শক্ত হয়ে এবং কথা না বলে। এ-বাড়িতে বাবার একটা ছবি ছিল, এটা খেয়াল ছিল না তার। টেবিলের ওপর বাবার গড়ানে বয়সের ছবি থেকে একজোড়া চোখ তাকে স্থির দৃষ্টিতে দেখছিল।
একটা ছবি সব ভণ্ডুল করে দিল নাকি? বড় গ্লানি লাগছে যে ভিতরে।
লাচ্চু পরদিন রাতে প্লেন ধরল। ফিরে এল নিউইয়র্কে তার কুইনসের বাড়িতে। চুপচাপ এবং একা কাটাল দুটো দিন। তারপর সাহস করে একটা এয়ারোগ্রাম বের করে সবিতার ঠিকানায় লিখল। তারপর আরও একটু সাহস করে পাঠ লিখল, শ্রীচরণেষু মা….
সম্পূর্ণতা
ঠিক পুরুষের মতো গলায় একজন বয়স্কা নার্স চেঁচিয়ে ডাকছিল।
–অমিতাভ গাঙ্গুলি কে? অমিতাভ গাঙ্গুলি? বাবার মুখ নোয়ানো। হাতের ওপর থুতনি রেখে বোধহয় চোখ বুজে আছে। ডান গালে স্টিকিং প্লাস্টারে সাঁটা তুলোর ঢিবি। ডাক শুনে মুখ তুলে শমীকের দিকে তাকাল। শমীক উঠে দু-পা এগিয়ে থতমত গলায় বলে–এই যে এখানে।
নার্স হাতের কাগজটার দিকে চোখ রেখেই বলে–ক্যানসার। থার্ড স্টেজ। কিছু করার নেই।
–তাহলে? শমীক প্রশ্ন করে।
উত্তর অবশ্য পায় না। নার্স পরের নাম ধরে ডাকছে–নওলকিশোর ওঝা—
বাবা ওঠে।
–কী বলল ?
শমীক যথার্থ বুদ্ধিমানের মতো বলে–কত ভুলভাল বলে ওরা! এর রোগ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়।
–থার্ড স্টেজ না কী যেন বলছিল! বাবা ধীরে-ধীরে বলে।
–রোগটা প্রাইমারি স্টেজে আছে আর কি। ওষুধ পড়লেই সারবে।
হাসপাতালের বাইরে এসে শমীক বলে ট্যাক্সি নেব বাবা?
–ট্যাক্সি কেন আবার? তিন নম্বরে উঠে শেয়ালদা চলে যাব।
শেয়ালদার হোটেলে ফিরে বাবা তার প্যান্ট ক্রিজ ঠিক করে রেখে যত্নে ভাঁজ করল। হ্যাঙারে টাঙাল জামা। লুঙ্গি পরতে-পরতে বলল –থার্ড স্টেজ মানে কি প্রাইমারি স্টেজ?
–হ্যাঁ।
–তবে যে বলছিলি, ওরা ভুলভাল বলছিল।
শমীক অত বুদ্ধি রাখে না। তা ছাড়া, তার নিজেরও বুকের ভিতরে একটা কী যেন উথলে পড়ছে। তিনটে বোন বিয়ের বাকি। দুই ভাই ইস্কুলে পড়ে। তার নিজের বি . এ . পাশ করতে এখনও এক বছর। যদি আদৌ পাশ করে। এবং এই অবস্থায় বাবাজি বোধহয় চললেন।
দুই গাল রবারের মতো টেনে হাসল শমীক। বলল –না না। থার্ড স্টেজই বলেছে। তার মানে—
বাবা বিশ্বাস করেছে। কোঁচকানো কপাল হঠাৎ পরিষ্কার হয়ে গেল। বিছানায় পা তুলে। আসনপিঁড়ি হয়ে বসে বলল –যদি প্রাইমারি স্টেজই হয় তবে হোটেলের টাকা গুনে এখানে থাকি কেন? আমাদের চা বাগানে ফিরে যাই চল। দরকার মতো জলপাইগুলি কি কুচবিহারে গিয়ে চিকিৎসা করালেই হবে।
–ডাক্তারকে বলে নিই।
–কালই বলো। আমি বরং শিয়ালদায় আজই খোঁজ নিই যদি পরশুর রিজার্ভেশন পাওয়া যায়।
–তাড়াহুড়োর কী আছে! এসেছি যখন ট্রিটমেন্টটা করিয়েই যাব। কলকাতার মতো ব্যবস্থা কি মফসসলে হবে?
বাবা ডান গালের তুলোটা একটু চেপে ধরল। শমীক জানে, তুলোয় ঢাকা আছে একটি ঘা। ঘায়ের ভিতর দিয়ে পচন। ক্রমশ গালের মাংস খসে খসে পড়বে। প্রথম ব্যাপারটা সন্দেহ। করেছিল একজন ডেন্টিস্ট। বাবার কষের অকেজো দাঁতটা উপড়ে ফেলে শমীককে আড়ালে ডেকে বলল –দাঁতটা তুলে বোধহয় ভালো করলাম না। দেয়ার ইজ সাম পিকিউলিয়ার সোর। একবার কলকাতায় নিয়ে গিয়ে বড় ডাক্তার দেখাবেন।
শমীক জিগ্যেস করল–কেন?
সন্দেহ হচ্ছে ক্যানসার।
–জলপাইগুড়ির বড় ডাক্তারও সেই একই কথা বলে–কলকাতায় নিয়ে যান। না হলে সিওর হওয়া যাবে না।
গাঙ্গুটিয়া চা–বাগান থেকে শমীক তার বাবাকে নিয়ে কলকাতায় এসেছে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
আজ নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। থার্ড স্টেজ মানে প্রাইমারি স্টেজ নয়। শমীক জানে। বাবা জানে না।
পরদিন বাবাকে হোটেলে রেখে একা হাসপাতালে গেল শমীক। বহু কষ্টে দেখা করল ডাক্তারের সঙ্গে। ডাক্তার সব শুনে হাসলেন।
–হাসপাতালে রেখে লাভ কী? সারাবার হলে নিশ্চয়ই রাখবার চেষ্টা করতাম। যে কয়দিন বাঁচেন আপনার বাবাকে আপনাদের কাছেই রাখুন। যা খেতে চান দিন, যা যা করতে চান সব করতে বলুন। মেক হিম হ্যাপি। হাসপাতালের লোনলিনেস আর ড্রাজারিতে শেষ কটা দিন কেন কষ্টের মধ্যে ফেলে রাখবেন? আমাদের কিছু করার নেই।
–আপনি সিওর যে এটা ক্যানসার?
ডাক্তার হাসলেন–ইচ্ছে করলে আপনি আর কাউকে কনসাল্ট করতে পারেন। ডক্টর মিত্রকে দেখান, আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। অবশ্য দেখানোটা সান্ত্বনামাত্র।
রাতে খাওয়ার সময় বাবা অনুযোগ করতে থাকে–এরা একেই বিচ্ছিরি খাবার দিচ্ছে, তাও তুই মাছটা ফেলে রাখছিস। ভাত তো কিছুই খেলি না। এখানে এসে সাতদিনে কত রোগা হয়ে গেছিস। ভালো করে খা।
