–বাবা, কাল একজন স্পেশিয়ালিস্টের কাছে যাব।
–কেন?
–ডক্টর মিত্রের খুব নাম। দেখি কী হয়।
–প্রাইমারি স্টেজ যখন, অত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে?
–দেখানো ভালো।
–অসুখটা ওরা কী বলছে? নালি ঘা তো?
–তাই।
–ঘাবড়াচ্ছিস কেন?
বাবা তার গলা ভাত আর ঝোল দিয়ে চটকানো কাথের বাটিতে চুমুক দিয়ে বলে–কী খারাপ রান্না এদের। কিচ্ছু গেলা যায় না। তোর মা যে সেদ্ধ ঝোল রাঁধে তারও কেমন ভালো স্বাদ।
বাবা শমীকের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর আস্তে-আস্তে করে বলে–কাল তোকে রামদুলাল স্ট্রিটের সেই দোকানটায় নিয়ে যাব। কখনও তো খাসনি, দেখিস কেমন ভালো সন্দেশ করে ওরা! আমরা ছাত্রজীবনে দল বেঁধে গিয়ে খেয়ে আসতাম।
গতকাল নার্সটা চেঁচিয়ে বলেছিল ‘ক্যানসার’। বাবা কি সেটা শুনতে পায়নি? বায়োপসি কেন করানো হল, তাও কি বাবা জানে না? না কি সব জেনে বুঝে বাবাও অভিনয় করে যাচ্ছে।
পরদিন সন্ধেবেলা ডক্টর মিত্রর বিশাল বাইরের ঘরে বাপ-ব্যাটায় বসে আছে। ডাক্তার টেনিস খেলতে গেছেন। আসবেন। স্লিপে নাম লিখে বেয়ারার কাছে দিয়ে বসে অপেক্ষা করছে আরও দশ বারোজন লোক। বত্রিশ টাকা ফি দিতে পারে এমন কয়েকজন। শমীক বাইরে একবার সিগারেট খেতে বেরিয়েছিল। কী সুন্দর বাড়ি। সিনেমায় এ রকম দেখা যায়। সামনে লন, গাড়িবারান্দা, লবি। পেতলের ভাসে সব অদ্ভুত গাছ। লনের ঘাস এদেশের ঘাসই নয়। সিগারেট ধরিয়ে চারদিকটা দেখছিল। সফলতা একেই বলে। কত লোক কত বেশি সুখে আছে।
গায়ের ঘাম তখনও মরেনি, অল্পবয়সি সুন্দর চেহারার এবং হাস্যমুখ ডাক্তারটি চটপট পায়ে রুগির ঘরে ঢুকে ভিতর দিকে চেম্বারে চলে যেতে-যেতে একবার রুগিদের দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হেসে গেলেন। হাসিতে বরাভয় এবং আত্মবিশ্বাস। শমীকের বুকটা ভরে ওঠে। বাবাকে সে ঠিক জায়গাটিতে নিয়ে এসেছে। এ তো আর হাসপাতালের বাজারি ব্যাপার নয়। এখানে ঠিকমতো পরীক্ষা হবে, বিচক্ষণ ডাক্তার ঘা পরীক্ষা করেই হেসে উঠে বলবেন–আরে দূর! এ তো সেপটিক কেস।
ব্যাপারটা ঠিক সেরকম হল না! ডাক্তারের চিঠিটা পড়ে ডাক্তার মিত্র বাবাকে পরীক্ষা করলেন। বায়োপসির রিপোর্টটাও দেখলেন। মুখে হাসিটা ছিলই, আত্মবিশ্বাসও ছিল। বাবাকে বললেন–বয়স কত?
–পঞ্চান্ন।
–ছেলেমেয়ে?
–তিন ছেলে, তিন মেয়ে। মেয়েটি বড়।
ডাক্তার শমীকের দিকে তাকিয়ে হাসলেন কী করেন?
–পড়ি। বি . এ.।
–আর্টস! আমারও খুব ঝোঁক ছিল আর্টস পড়ার। আমার বাবা প্রায় জোর করে ডাক্তারি পড়িয়েছিলেন।
এই সব কথা বললেন ডাক্তার। একটা ছোট্ট চিঠি লিখে দিলেন হাসপাতালের ডাক্তারকে! বললেন–এটা ডক্টর সেনকে দেবেন। প্রেসক্রিপশন যা আছে তাই চলবে।
–কিছু করার নেই? খুব আস্তে, প্রায় ডাক্তারের কানে-কানে বলে শমীক।
ডাক্তার হাসলেন।
রাস্তায় একটা ল্যাম্পপোস্টের তলায় চিঠিটা খুলে দেখল শমীক। লেখা–ডিয়ার ডাঃ সেন, দি কেস ইজ হোপলেস। প্লিজ হেলপ দিস ম্যান। মিত্র।
বাবা শমীকের কাঁধের ওপর দিয়ে চিঠিটা দেখছিল কী লিখে দিল রে? হোপলেস! হোপলেস ব্যাপারটা কী?
চিঠিটা ভাঁজ করে রেখে শমীক বলে–হোপলেস নয়। লিখেছে হেলপলেস। কলকাতায় আমরা তো কিছু জানি না, তাই লিখেছে। অসহায়।
–ও। বাবা একটু গম্ভীর হয়ে বলে–বত্রিশ টাকা নিল, কোনও প্রেসক্রিপশন দিল না?
–ওই ওষুধই চলবে।
–আর বেশি ছোটাছুটি করিস না। হাসপাতাল, ডাক্তার, এত কিছু করছিস কেন?
–অসুখ–বিসুখে এ সব একটু করতেই হয়।
–আমার আর ভালো লাগছে না। যা হওয়ার হবে, চল বাগানে ফিরে যাই।
শমীক মাথা নেড়ে বলে–তাই হবে।
বাবা উজ্জ্বল মুখে বলে–ঠিক তো?
–কাল রিজার্ভেশনের চেষ্টা করব।
বাসরাস্তায় এসে বাবা বলে–এখন কোথায় যাবি?
–কোথায় আর যাব! হোটেলেই ফিরে যাই চল।
বাবা একটু হাসে। বলে–কাছেই গড়িয়াহাটা। চল একটু দোকানপসার ঘুরে যাই। সস্তায় গণ্ডায় যদি পাই তো সকলের জন্য একটু জামাকাপড় নিয়ে যাব। পুজোর তো দেরি নেই। কলকাতায় একটু সস্তা হয়।
–এখন থাক বাবা। অনেক টাকা খরচ হয়ে গেল!
–তোর জন্যই তো। খামোকা আজ বত্রিশটি টাকা দিলি।
–ভালো ডাক্তারকে দেখালে নিশ্চিন্ত হওয়া যায়।
–চল, দোকানটোকান একটু দেখে যাই। গড়িয়াহাটের কাপড়ের দোকানের খুব নাম শুনি।
শমীক অগত্যা রাজি হয়। বাপ-ব্যাটায় হাঁটে গড়িয়াহাটার দিকে। বাবা গালের তুলোটা হাতের তেলোয় একটু চেপে ধরে রেখে বলে কলকাতায় এসে তো কেবল আমাকে নিয়েই হুড়যুদ্ধ করছিস। কাল বেরিয়ে একটু একা-একা ঘুরবি, সিনেমা থিয়েটার দেখবি। তোদের বয়সে কি কেবল রোগের চিন্তা ভালো লাগে! কাল বেরোস।
শমীক উত্তর দিল না।
পরদিন সকালে উঠে বাবা বলল –কলকাতায় যা শব্দ! রাতে ভালো ঘুম হয় না! বাগানে থাকতে থাকতে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে নিশুতি নিঝুম না হলে চলে না। তার ওপর আবার ছারপোকা।
শমীক জামাকাপড় পরছিল। একবার রেলের বুকিং অফিসে যাবে।
বাবা শ্বাস ফেলে বলল –ঘায়ের ব্যথাটাও হচ্ছিল।
–বিশ্রাম নাও।
–একা ঘরে কি ভালো লাগবে?
–তবে কী করবে?
–একটু বেরোব ভাবছি। কলকাতা তো আর আমার অচেনা জায়গা নয়।
–শরীর খারাপ, একা বেরোনো কি ঠিক হবে? বাবা মাথা নেড়ে খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে–শরীর কিছু খারাপ নয়। বেশ তো আছি। কাছেই যাব, সীতারাম ঘোষ স্ট্রিটে। খগেন ওখানে থাকত।
