ছেলেমেয়েরা জীবনে এত সুখাদ্য খায়নি। সবিতার রাতে ভালো করে ঘুম হল না। বারবার ছেলেটার দাড়িওলা মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে।
দুদিন বাদে পরেশ সাহা এক সকালে এসে হাজির। মুখে বিরক্তি। বউমা, এসব কী? বাড়ি বিক্রি করবে না তা সাফ জানিয়ে দিলেই হত। পুলিশে খবর দিতে গেলে কেন?
সবিতা অবাক হয়ে বলল , খবর দিইনি তো!
না দিলে তারা এসে আমাকে এমনি শাসিয়ে যায়?
আরও দিনসাতেক পরে ছেলেটা এক সন্ধেবেলা এসে হাজির। আজও হাতে স্যুটকেস।
সবিতা তাড়াতাড়ি ছেলেটাকে একটা চেয়ার পেতে বসতে দিয়ে বলল , সেদিন আপনি ভুল করে একটা ঘড়ি রেখে গেছেন।
না, ভুল করে নয়।
ভুল করে নয়?
না, ভুল করে রাখব কেন?
আপনার কোম্পানি কি ঘড়িও তৈরি করে?
ছেলেটা হেসে বলল , না। তবে সেলস প্রমোশনের জন্য কাস্টমারকে ছোটখাটো উপহার দেওয়া হয়।
কিন্তু আমি তো কাস্টমার নই!
আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে কাজ করি। আপনার নাম আমাদের কম্পিউটারই সাজেস্ট করেছে।
এসব কথার অর্থ জানে না সবিতা। তবে সে আজ এই সুঠাম যুবকটিকে ভালো করে দেখল। স্বাস্থ্যবান, ছমছমে চেহারা, সবিতার মতোই বয়স হবে। হ্যাঁ, এরকম একটি যুবকের সঙ্গেই তো বিয়ে হতে পারত তার। এক অক্ষম, গরিব, বৃদ্ধ দোজবরের সঙ্গে নামমাত্র বিয়ে কেন হল তার? সবিতার ব্যর্থ যৌবন কোনও পুরুষকেই আকাঙ্ক্ষা করতে পারেনি ভয়ে। আজ অযাচিত সাহায্যকারী এই যুবকের দিকে মুগ্ধ চোখে একটু চেয়ে রইল সে। লাচ্ছ্বও চেয়ে ছিল। মহিলার বয়স ত্রিশ-একত্রিশ হতে পারে। দারিদ্র্যের অবশ্যম্ভাবী রসকষহীনতাকে বাদ দিলে মহিলা সুশ্রীই। স্বাস্থ্য ফিরলে এঁর রূপ উপেক্ষা করার মতো হবে না।
লাচ্চু স্যুটকেস খুলে বলল , আজ কিন্তু পোশাক–আশাক আছে। রেখে যাচ্ছি।
যেসব জিনিস স্যুটকেস থেকে বেরোল তা দেখে আতঙ্কিত সবিতা বলল , এসব কী করছেন? আমাকে বিক্রি করলেও যে দাম উঠবে না।
কয়েকটা শাড়ি, ফ্রক, জামা-প্যান্ট নামাল লাচ্চু। তারপর সবিতার দিকে ফিরে বলল , আপনার বাড়িটার সংস্কার দরকার।
হ্যাঁ। কিন্তু আমার সাধ্য তো নেই।
শুনুন। আমাদের ফার্মটা হচ্ছে ফ্রেন্ড অফ দি আনলাকিজ। অর্থাৎ যাদের ভাগ্য খারাপ আমাদের ফার্ম তাদের সাহায্য করে। কিন্তু সেটা দয়া বা করুণা নয়। আপনাকে কোম্পানির তরফ থেকে কুড়ি হাজার টাকার একটা লোন দিয়ে যাচ্ছি। এখন নয়, দশ বছর পর থেকে আপনি লোনটা ধীরে-ধীরে শোধ করবেন।
সবিতার কেমন যেন ধন্ধ লাগছিল। সে হঠাৎ বলল , আমার এসব কথা কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে। না। এরকম হয় না।
হয়। হবে না কেন?
সবিতার আত্মসম্মানবোধ প্রবল। কিন্তু এই সুঠাম যুবকটির দিকে চেয়ে আজ তার বুকে একটা অদ্ভুত দোলা আর আবেগ কাজ করছে। সে একে প্রত্যাখ্যান করতে পারছে না। সবিতার চোখে জল এল। সে লিত কণ্ঠে বলল , আপনি আমাকে দয়া করছেন।
একদম নয়। আমার সঙ্গে লোনের কাগজপত্র আছে। আপনি পড়ে সই করে দিন।
একটুও বিশ্বাস করল না সে ছেলেটাকে। কিন্তু এক চোরা আনন্দে বুক ভেসে যাচ্ছিল তার। এমনকী হতে পারে যে, এই যুবক তার প্রেমে পড়েছে? সবিতা সই করল এবং করকরে কুড়ি হাজার টাকা নিল।
দুদিন বাদে ছেলেটা একটা ঝকঝকে গাড়ি নিয়ে এল সকালবেলায়।
চলুন, আপনাদের একটু আউটিং–এ নিয়ে যাই।
সবিতা মুচকি হেসে বলল , এটাও কি সেলস প্রমোশন?
হ্যাঁ, এ সবই সেলস প্রমোশন।
ছেলেটার দেওয়া নতুন শাড়ি পরল সবিতা, বাচ্চাদেরও সাজিয়ে নিল। এবং জন্মে যা কখনও করেনি আজ তাও করল সে, একটু সাজল। চোখে কাজল, কপালে টিপ।
ছেলেটা নিজেই গাড়ি চালিয়ে নিয়ে গেল কলকাতার বিভিন্ন জায়গায়। রেস্টুরেন্টে দারুণ খাওয়াল এবং কিনে দিল আরও নানা দামি উপহার। সেই উপহারের মধ্যে সবিতার জন্য চার ভরি সোনার একটা হার, চার গাছা সলিড সোনার চুড়ি এবং বাচ্চাদের জন্য হার আর আংটি।
সবিতা বারণ করার অনেক চেষ্টা করেও পারল না। ঠিক কথা আজ সবিতা অনেকটা বিবশ, রসস্থ। সে তেমন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করতেও পারল না। তার মনে হচ্ছে, তার জীবনে এই প্রথম একজন সত্যিকারের পুরুষের সবল প্রবেশ ঘটছে। সে ঠেকাবে কেন সেই অনুপ্রবেশ? জীবনে সে তো কিছুই পায়নি।
বিকেলে তারা একটা থিয়েটার দেখল। বাচ্চাদের একপাশে রেখে সবিতা ইচ্ছে করেই ছেলেটার পাশে বসল। অন্ধকারে সে ইচ্ছে করেই হাত ধরল ছেলেটার। ধরে রইল।
ছেলেটা আসতে লাগল ঘন ঘন। সবিতার এখন পুষ্টিকর খাবারের অভাব হচ্ছে না। বাড়িটার শ্রী ফিরেছে। বেশ ভালো সময় যাচ্ছে তার। তবে ছেলেটা কখনও প্রেমের কথা বলে না। তাকায় আর হাসে। সবিতার কাছে তাই যথেষ্ট।
সবিতা এক সন্ধেবেলা একটু ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে বলল , তুমি কি আমার কাছে কিছু চাও? চাইলে মুখ ফুটে বলো না কেন?
৩.
লাচ্চু একেবারে একটা খাদের কিনারায় এসে ঠেকেছে। লাফ দেবে? সম্পর্কটা সংস্কার ছাড়া আর কী? এই ভদ্রমহিলাকে তার বৃদ্ধ বাবা অন্যায়ভাবে বিয়ে করেছিল। সেই অন্যায়কে স্বীকৃতি না। দিলে ক্ষতি কী? দুনিয়া তো চলেছে সংস্কার ভাঙার দিকেই। সবিতাকে কয়েকদিন দেখে তার
মেয়েদের সম্পর্কে অনেক বদ্ধমূল ধারণা ভেঙে গেছে। দারিদ্র্য, অপমান, অবিচার সয়ে বড় হওয়া এই মহিলা যেমন সাহসী–তেমন সহনশীলা। লাচ্চু কি চোখ বুজে লাফটা দেবে? আমেরিকার মুক্ত সমাজে সব চলে। অতীত লুপ্ত হয়ে যাবে। দেবে লাফ?
