সিস্টার, ডাক্তার কখন আসবেন?
সিস্টার ঘড়ি দেখে বললেন, ন’টা হয়ে যাবে।
আমি একটু হাঁটতে চাই।
সিস্টার মাথা নাড়লেন, ইমপসিবল। ইউ আর নট আউট অব ডেনজার।
শান্তশীল সেটা জানে। তাকে টানা সাতদিন ইনটেনসিভ কেয়ারে রাখা হয়েছিল। যমে মানুষে টানাটানি গেছে। মাত্র কয়েকদিন আগে তাকে আনা হয়েছে কেবিনে।
অবসন্ন শান্তশীল ক্লান্ত গলায় বলে, কতকাল খবরের কাগজ পড়ি না, টেলিফোন করি না, গাড়ি চালাই না।
সব হবে। হ্যাভ পেশেন্স। কথা বেশি না বলাই ভালো। টেক রেস্ট।
রেস্ট! বলে শান্তশীল হৃ কোঁচকাল। বিশ্রাম অনেক হয়েছে। তবু এত অবসাদ যে কেন!
ঘড়ি দেখে সিস্টার চলে গেলেন। ব্রেকফাস্টের সময় হল। বিস্বাদ, অদ্ভুত সব খাবার দেয় এরা। ক্যালোরিহীন, ফ্যাটহীন, চিনিহীন, লবণহীন।
শান্তশীলের শরীর সায় দিচ্ছে না, তবু ইচ্ছে করছে জানলার কাছে গিয়ে একটু বসতে। কী সুন্দর বাতাস বইছে। একটা পাখি এসে জানলার কানায় বসল। চড়াই। চুরুক করে ডেকে ফের উড়ে গেল। রাস্তায় গাড়ির শব্দ হচ্ছে, ঝাঁটার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কেবিন থেকে। জানলা দরজা বন্ধ থাকলে কোনও শব্দই পাওয়া যায় না।
দুটি চড়াই এসে ঘরে ঢুকল। চক্কর মারল কয়েকটা। তাদের দ্রুত সঞ্চালিত পাখার শব্দ একটা ভাইব্রেশনে ভরে দিল ঘরটা। শব্দটা কি মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে তার হৃৎপিণ্ডে? বুকের মধ্যে একটা ডুগডুগি বাজছে।
চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিতে লাগল সে। রক্তচাপ তার বড় বেশি ছিল। কান ঝাঁ ঝাঁ। করত, ঘাড়ে ব্যথা হত। এখনও যেন সেই অস্পষ্ট লক্ষণগুলি রয়ে গেছে।
আরোগ্য? না, সে এখনও বোধহয় আরোগ্যের চৌকাঠ ডিঙোয়নি।
ব্রেকফাস্ট এসে গেল। আবার ন্যাপকিনে বুক পেট ঢাকা পড়ল। তারপর শিশুর মতো হাঁ করে নার্সের হাত থেকে চামচে–চামচে বিস্বাদ খাবার খাওয়া। তারপর ওষুধ।
মুখ মুছিয়ে খাটটা নামিয়ে দিল নার্স।
কত ঘুম ঘুমোবে শান্তশীল? এত বকেয়া ঘুম জমে ছিল তার শরীরে? নাকি এরা বারবার ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখে? কে জানে কী, তবে শান্তশীল ঘুমোল।
যখন জাগল তখন ঘরের জানালা বন্ধ। এয়ারকন্ডিশনিং চালু হয়েছে। ঘর নিস্তব্ধ। উঁচ পড়লে শোনা যায়।
ডাক্তার এলেন। মুখে পেশাদার অভয় হাসি। দাড়ি নিখুঁত কামাননা। চোখে বুদ্ধির তীক্ষ্মতা। অমায়িকতায় মাখামাখি মুখশ্রী।
কেমন দেখছেন ডক্টর গুহ?
চমৎকার। গুড প্রোগ্রেস।
আমার একটু হাঁটতে ইচ্ছে করছে।
হাঁটবেন। তবে আজ নয়। উইকনেস এখনও আছে। হাঁটতে গেলে মাথা রিল করতে পারে।
পোর্টেবল যন্ত্রে ডাক্তার ইসিজি রিডিং নিলেন। শান্তশীল চোখ বুজে রইল। তার শৈশবে অসুখ হলে একজন সস্তার এলএমএফ ডাক্তার ছিল বাঁধা। ছিল মার্কামারা ওষুধ। মার্কামারা পথ্য। মিকশ্চার, বড়ি, বার্লি, দুধ সাগু, শান্তশীলের সতেরো বছর বয়সে তার স্কুল শিক্ষক বাবা মারা গেলেন। সাত ভাইবোন আর মা নিয়ে বিরাট সংসার। তখন অসুখ হলে ডাক্তারও আসত না। শান্তশীলের এক দাদা ছিল জড়বুদ্ধি। সে মারা যায় মেনিনজাইটিসে, চিকিৎসাই হল না। শুধু ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে ডাক্তার এসেছিলেন। চার টাকা ভিজিটও নিয়েছিলেন।
সেই চারটে টাকার কথা আজ খুব মনে পড়ল। চারটে টাকার জন্য তখন হাহাকার ছিল।
বাঃ, অলমোস্ট নরমাল। আর কয়েকটা দিন রেস্ট নিন। সব ঠিক হয়ে যাবে।
শান্তশীলের চোখের কোণে কি একটু জল? অবসন্ন হাত তুলে সে চোখ মুছে নিল।
নার্সের সঙ্গে চাপা গলায় কথা বললেন, ডাক্তার। তারপর চলে গেলেন।
আজ সে একশো-দেড়শো টাকা পেগের মদ খায়, মহার্ঘ হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসে ডিনার।
অথচ, শৈশবে, বেড়ে ওঠার সময়ে এক কাপ দুধও কখনও জোটেনি। সাত ভাইবোনের সেই ছিল সবচেয়ে মেধাবী। তাই তার ওপরে ছিল সকলের আশা আর নজর। একটা পরিবারের সে-ই হয়ে উঠেছিল নিউক্লিয়াস।
কী করেছে শান্তশীল তার পরিবারের প্রতি?
হিসেব করে দেখলে সে তার এক ভাইয়ের চাকরি করে দিতে পেরেছে। দুই বোনের বিয়েতে মোটামুটি সাহায্য করেছে। চাকরি জীবনের প্রথমে সে মাইনে বেশি পেত না।
ধার-কর্জ করতে হয়েছিল। ধীরে-ধীরে সেই ঋণ শোধ হয়েছে।
শান্তশীলের বুকটা ভার লাগছে। ব্যথা নেই, কিন্তু ভার। আর ক্লান্তি।
আমি কি বই পড়তে পারি সিস্টার?
বই! নার্স একটা যেন চিন্তা করে মাথা নেড়ে বলে, না।
অন্তত নিউজ পেপার?
ওঃ, ইউ আর ন্যাগিং। আচ্ছা দেখছি দাঁড়ান।
নার্স চলে গেল। একটু বাদে একটা ইংরেজি খবরের কাগজ এনে দিয়ে বলল , ফর টেন মিনিটস। নো মোর। পড়লে কিন্তু স্ট্রেন হয়।
শান্তশীল কাগজটায় চোখ বোলাল। পৃথিবীর খবর সম্পর্কে তার খিদে ছিল। এখন খিদেটা কেন যেন নেই। কাগজটা বালিশের পাশে ভাঁজ করে রেখে দিল সে। পরে পড়বে। দরজায় টোকা। পড়ল।
শান্তশীল কোনও কৌতূহল বোধ করল না। জানলা দিয়ে বাইরে রোদ আর হাওয়ার খেলা দেখতে লাগল।
একটা ছায়া পড়ল চোখে।
শান্তশীল তার অনাগ্রাহী চোখ তুলে যুবতীটিকে দেখল। যেন অচেনা বা আধোচেনা কেউ। বিয়ের বারো-তেরো বছর পরও শান্তশীল স্থির সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি যে, সে তার স্ত্রী মধুশ্রীকে প্রকৃতই ভালোবাসে কি না। আর এখন অসুখের পর, পৃথিবীর সঙ্গে তার এত ব্যবধান রচিত হয়েছে যে, এই মহিলাকে কাছের লোক বলেও মনে হচ্ছে না।
মধুশ্রীর শরীর থেকে ইন্টিমেট পারফিউমের তীব্র গন্ধ আসছে। গন্ধটা ভালো লাগছে না শান্তশীলের। গন্ধটা তার বুকে ধাক্কা দিচ্ছে, শ্বাসবায়ুকে মন্থন করে গাঢ় করে তুলছে। একটু নীচু হয়ে তার কপালে আলতো হাত রাখে মধুশ্রী।
