ঘৃণা আর আক্রোশ ছাড়া সবিতা জীবনে কিছুই পায়নি। এখনও সে মানুষের কাছ থেকে তাই পায় এবং তাতেই স্বস্তি বোধ করে। মানুষ তাকে দয়া বা করুণা করলেই বরং সে ভয়ঙ্কর অস্বস্তি বা অপমান বোধ করে। ও তার অভ্যস্ত জিনিস।
তথাকথিত স্বামীর মৃত্যুর পর সবিতা তথাকথিত বিধবা হল। সধবা আর বিধবার তফাত সামান্যই। দুর্দশা বা দুর্গতি যেমন ছিল তেমনই রইল। দুটো সন্তান তার কোনও ভালোবাসার ফসল নয়। তবু সন্তান আঁকড়েই বেঁচে থাকার একটা চেষ্টা করতে হলো তাকে। লেখাপড়া জানা নেই, কোনও হাতের কাজটাজও শেখেনি, চাকরিটা হবে কীসে? সবিতা কারও কাছে হাত পাতল, অযাচিত সাহায্য ফিরিয়ে দিল এবং চাকরি খুঁজতে লাগল। মেয়েটা ছয় বছরের, ছেলেটার পাঁচ। ছয় বছরের মেয়ে প্রয়োজনের তাগিদে শিশু বয়সেই সাবালিকার মতো দায়িত্ব নিতে শিখে গেল। প্রয়োজনে মানুষ সব পারে। তার হেফাজতে ছেলেকে রেখে সবিতা বাইরে বেরুতে লাগল। কাজ জুটল আয়ার। এক হাসপাতালে।
আয়ার কাজে বাঁধা বাইনে নেই। কাজ পেলে বাঁধা রেটে টাকা। কখনও-সখনও বকশিস বা শাড়িটা জামাটা পাওয়া যায়। গ্রাসাচ্ছাদন চলে বটে তার। কিন্তু এত কষ্ট যে বলার নয়। সবিতাকে পাঁচ-দশ পয়সারও হিসেব করে চলতে হয়। অসুখ–বিসুখ হলে অগাধ জল।
তার তথাকথিত স্বামী বাড়িটাই যা রেখে গেছেন। ছোট এবং পুরোনো দু-ঘরের এই বাড়িটুকুই এই গোটা দুনিয়ায় তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তবে পাড়া–পড়শিরা অনেকেই তাকে ভয় দেখায়, আছ তো বাপু ভালোই, কিন্তু লাচ্চু যদি ফিরে আসে তা হলে এই বাড়িতে কি থাকতে পারবে? সে তোমাকে তাড়িয়ে ছাড়বে। ভীষণ বদমাশ ছেলে। লাচ্চুর কথা সে তার তথাকথিত স্বামীর কাছে শুনেছে। হ্যাঁ, লাচ্চু মস্ত দাবিদার। যদি ফিরে আসে এবং সবিতাকে তাড়ায় তাহলে সে কোথায় যাবে তা ভেবে পায় না। এই একটা ভয় তার আছে। লাচ্চু। কেউ কেউ বলে, সে সাধু হয়ে গেছে, কেউ বলে মরে গেছে, কেউ বলে সে জীবনে উন্নতি করে ফেলেছে। লাচ্ছ্বর আসল খবর কারও জানা নেই। এবং সেইটেই চিন্তা এবং ভয়ের বিষয়।
পাশের বাড়িটা পরেশ সাহার। পরেশবাবু ইদানীং হঠাৎ ব্যাবসা–বাণিজ্যে উন্নতি করেছে। ইদানীং তিনি মাঝে-মাঝে সবিতার কাছে বাড়িটা কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। দামটা খারাপ দেবেন না। কিন্তু সবিতা রাজি হয়নি। তার কারণ টাকা সে রাখতে পারবে না। মাঝখান থেকে পৃথিবীর শেষ আশ্রয়টুকু হাতছাড়া হবে। তার ওপর এ বাড়ি তো তার একার নয়। লাচ্ছ্বরও ভাগ আছে। পরেশবাবু অবশ্য বলেছেন, লাচ্চু বেঁচে নেই বউমা। যদি থাকে তা হলে তার দায় আমার। আমি ওর সঙ্গে বুঝে নেব।
পরেশ সাহাকে ইদানীং একটু ভয় পাচ্ছে সবিতা। টাকার ক্ষমতা যে অনেক তা সে জানে। পারেশ সাহা ইচ্ছে করলে তাকে যে-কোনও উপায়ে উচ্ছেদ করে দিতে পারে।
কিন্তু সবিতা তো কখনও স্বস্তিতে থাকেনি। তার সারা জীবনটাই তো নানা বিরুদ্ধতার সঙ্গে বেঁচে থাকা মাত্র। ভয় সে পায় বটে, কিন্তু খুব একটা অসহায় বোধ করে না। বস্তি আছে, ফুটপাত আছে। বাচ্চা দুটোকে নিয়েই যা চিন্তা।
খুব সম্প্রতি মাত্র দুদিন আগে পরেশ সাহার লোক বাসু বলে একটা ছেলে এসেছিল। সে একটু চোখ রাঙিয়ে গেছে। সবিতা বুঝতে পারছে বাড়িটা হয়তো সে রাখতে পারবে না। আজ সে তাই বস্তিতে ঘর দেখতে গিয়েছিল।
সন্ধেবেলা ফিরে সে এখন জিরোচ্ছে একটু। মেয়েটা পড়তে বসেছে। ছেলেটা তার কাছ ঘেঁষে বসে আছে। তার ছেলে এবং মেয়ে দুজনেই শান্ত। ওইটুকু বাচ্চা, তবু তারা মায়ের শ্রান্তি ক্লান্তি হতাশা এবং মেজাজ টের পায়।
দরজায় কড়া নড়তেই মেয়েটা উঠে গিয়ে খিল খুলল।
দরজার বাইরে একজন ভালো পোশাক–পরা যুবক দাঁড়িয়ে। দাড়ি আছে, গোঁফ আছে, চোখে কালচে চশমা, হাতে একটা স্যুটকেস।
বলল , ভিতরে আসতে পারি?
সবিতার চোর ডাকাতের ভয় নেই। চোর এলে বরং সবিতার পক্ষে লজ্জারই ব্যাপার। তবে এরকম সম্রান্ত চেহারার যুবককে দেখে সন্ত্রস্ত হল। তাড়াতাড়ি উঠে বলল , আসুন।
ছেলেটা ঘুরে ঢুকে বলল , আমি কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে এসেছি। সবিতা বলল , তার মানে? ছোঁকরা স্যুটকেসটা নড়বড়ে টেবিলটার ওপর রেখে খুলে ফেলল। তারপর একগাদা জিনিস বের করে টেবিলে সাজিয়ে রাখতে লাগল। চকোলেট বার, সিরিয়াল, টিনের দুধ, খেলনা, সেন্ট, সাবান কত কী।
সবিতা সভয়ে বলল , এসব কী!
ছেলেটা হেসে বলল , আমি একটা বড় কোম্পানির সেলসম্যান। আমরা এসব জিনিস তৈরি করি। এগুলো ফ্রি স্যাম্পল। আপনাকে দাম দিতে হবে না। যদি ব্যবহার করে পছন্দ হয় তবেই কিনবেন।
সবিতা কাঁদো–কাঁদো হয়ে বলল , আমরা বড় গরিব। ওসব জিনিস কেনার সাধ্য আমাদের নেই। আপনি নিয়ে যান।
ছেলেটা হেসে বলল , তাতে কী? না কিনলে, না কিনবেন। কোম্পানি তো এগুলো ফ্রি–ই দিচ্ছে।
ছেলেটা চারদিকে একটু চেয়ে বলল , এটা কি আপনার বাড়ি?
হ্যাঁ, একরকম তাই। আমার স্বামীর বাড়ি। তবে কতদিন রাখতে পারব জানি না।
কেন বলুন তো?
আমরা গরিব তো, পয়সাওয়ালারা তুলে দিতে চাইছে। অনাথা বিধবা, কিছু তো করার নেই।
ও! আচ্ছা, আজ আসি।
ছেলেটা চলে যাওয়ার পর সবিতা টেবিলের কাছে এসে যা দেখল তাতে তার চোখ চড়কগাছ। মাখন, চিজ থেকে শুরু করে বিস্কুট, টিনের খাবার, এসব ছাড়াও একটা হাতঘড়ি অবধি দিয়ে গেছে। এরকম হয় নাকি? সে স্বপ্ন দেখছে না তো!
