লাচ্চুর সংসার নেই, মদ খায় না, ফুর্তি করে না, বেড়াতে ভালোবাসে না। সুতরাং তার ডলার। শুধু ব্যাঙ্কে জমা হয়। কিছু খাটে শেয়ার বাজারে। এই অর্থাগমটা তার ক’দিন হল অর্থহীন লাগছে।
মাসখানেক বাদে সে শমিতকে ফোন করল। এ-কথা সে-কথার পর হঠাৎ জিগ্যেস করল, আচ্ছা সেই ভদ্রমহিলার নাম কী বল তো!
কোন ভদ্রমহিলা?
আমার বাবার দ্বিতীয় পক্ষের কথা বলছি।
কেন বল তো?
ভাবছি, ভদ্রমহিলা কষ্টে আছেন, কিছু টাকা পাঠিয়ে দেব।
শমিত উৎসাহের গলায় বলল , ভালোই হবে রে, এটা বেশ ভালো একটা ডিসিশন নিয়েছিস। তবে একটা কথা বলে রাখি তোকে, উনি কিন্তু খুব পারসোনালিটিওলা মহিলা। সহজে কারও কাছে হাত পাতেন না। তোর বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই ওকে পরামর্শ দিয়েছিল কোনও এমএলএ-র কাছে যেতে। উনি যাননি। একটা পুজো কমিটি থেকে কিছু সাহায্য দেওয়া হয়েছিল, তাও নেননি। আত্মসম্মানবোধ খুব বেশি। যদি টাকা পয়সা পাঠাস তাহলে একটা নরম করে চিঠি দিস।
যদি রিফিউস করে তাহলে?
সম্ভাবনা আছে।
তা হলে থাক বাবা, পাঠানোর দরকার নেই।
তবু নামটা জেনে রাখ। ওঁর নাম সবিতা রায়।
লাচ্চু প্যাডে নামটা নোট করে নিল বটে, কিন্তু সেটা যে কোনও কাজে লাগবে না তাও মনে হল তার।
লাচ্চুর হাড়ভাঙা পরিশ্রম এবং ছোটাছুটির মধ্যে আবার হারিয়ে গেল সবিতা রায় এবং তার দুই বাচ্চার কথা। মনে রাখার কথাও নয় লাচ্চুর। নিউইয়র্কের বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে লাচ্ছ্বর মাখামাখি না থাকলেও সম্পর্ক আছে। বাঙালিদের অনুষ্ঠানে চাঁদা দেয়, বাংলা নাটক দেখতে যায়, বাঙালি গায়ক–গায়িকা এলে টিকিট কেটে গান শুনে আসে, দুর্গাপুজো বা বঙ্গ সম্মেলনেও যায় ফি বছরই। তবে এসব বাঙালিয়ানার ব্যারাম তার কাছে গভীর কিছু নয়। কুইনসে উইক এন্ডের এক দুর্গাপুজোয় হাজির ছিল লাচ্চু। বাঙালিদের বেশ সুন্দর একটা জমায়েত। খিচুড়ি রান্না হচ্ছে, চমৎকার নিরামিষ তরকারির গন্ধ ছড়াচ্ছে বাতাসে। পেপার মাসের তৈরি দুর্গামূর্তির সামনে রেকাবিতে ডলার প্রণামী জমা হচ্ছে। মন্ত্রপাঠ, অঞ্জলি, কোনওটাই বাদ নেই। সেই জমায়েতে এক বৃদ্ধ এসে তাকে ধরলেন, তুমি লাচ্চু না?
লাচ্চু চিনল। তাদের পাড়ার মোহিতবাবু। ছেলে আমেরিকায় এসেছে বছরদুয়েক। সেই সুবাদেই এসেছেন। এ-কথা সে-কথার পর বললেন, তুমি যে বেঁচে আছ এটাই তো জানা ছিল না আমাদের। তোমার পুরো ফ্যামিলিটাই তো শেষ। তবে সবিতা আছে, সে বড় ভালো মেয়ে।
লাচ্চু বলল , আমি তো ওঁকে চিনি না।
না চেনারই কথা।
ওঁরা খুব কষ্টে আছেন?
কষ্ট বলে কষ্ট? তোমার বাবা তো কিছু রেখে যাননি। সবিতারও বাপের বাড়ি বলতে কিছু নেই, এক মামার কাছে মানুষ। খুবই কষ্ট ওদের। বাড়িটা আছে বলে রক্ষে। নইলে ভেসে যেত।
লাচ্চু আবার ভাবনায় পড়ল। তার অনেক টাকা। যদি বিয়ে না করে বা পুষ্যি না নেয়, তা হলে তার মৃত্যুর পর টাকাপয়সার গতি কী হবে কে জানে! না, সবিতা রায় বা তার ছেলেমেয়ে তার আপনজন নয়, তবু ক্ষীণ একটা সম্পর্ক আছে বোধ হয়।
অনেক ভাবল সে। তারপর তার পার্টনারকে ব্যাবসা চালানোর ভার দিয়ে সে কয়েক দিনের ছুটি নিয়ে ভারতমুখী প্লেনের টিকিট কেটে উড়ে গেল।
২.
সবিতার রোগভোগা শরীরের মধ্যে প্রকট মাত্র দুটি চোখ। লোকে বলে সবিতার চোখ নাকি জ্বলে। সবিতা অবশ্য সে-খবর রাখে না। তার জীবনটা কেটেছে আদ্যন্ত ঘৃণা ও আক্রোশের এক বলয়ের মধ্যে। শিশুকালে পিতৃ–মাতৃহীন সবিতা ছিল মামার গলগ্রহ। আক্ষরিক অর্থেই তাকে লাথি–ঝাঁটা খেয়ে বড় হতে হয়েছে। সে ছিল কার্যত মামার বাড়ির বিনা পয়সার ঝি। খাণ্ডার মামি দুনিয়ার যত ঝাল ঝাড়ত তারই ওপর। মামাও যে ভালো কিছু ছিল তা নয়। সবিতাকে ক্লাস ফোর অবধি পড়িয়েছিল মামা। তার পর স্কুল থেকে ছাড়িয়ে পুরোপুরি গৃহকর্মে লাগিয়ে দেয়। সবিতার প্রাণের জোর ছিল বটে। নইলে একবার কলেরা, একবার টাইফয়েড এবং সবশেষে প্লুরিসি হয়েও সে বেঁচে যায়। প্রতিবারই তাকে পাঠানো হয়েছিল অস্বাস্থ্যকর হাসপাতালের জেনারেল বেড–এ। টি বি হয়েছিল আঠার বছর বয়সে। মামা বা মামি কেউই তাকে ঘরে ঠাঁই দিতে রাজি ছিলেন না আর। সবিতা কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছিল। শেষে যাদবপুরের টি বি হাসপাতালে ঠাঁই হয়। এবং আশ্চর্যের বিষয়, নিছক প্রাণশক্তির জোরেই সে আরোগ্য লাভ করে। মামা–মামি সন্দিহান থেকেও তাকে ফের ঘরে ঠাঁই দেন বটে, কিন্তু খুশি হয়ে নয়। মাত্র তেইশ বছর বয়সে তার বিয়ের জোগাড় হল। পাত্রর বয়স ছাপ্পান্ন, বিপত্নীক।
বিয়ের আনন্দ কিছু ছিল না, শুধু স্থান বদলের স্বস্তিটা আশা করেছিল সবিতা। এই বয়স্ক পুরুষের কাছ থেকে প্রত্যাশাই বা কী ছিল তার? লোকটাকে ভালোবাসার কোনও চেষ্টা সে করেনি, সম্ভবও ছিল না। তবে লোকটা দুঃখী মানুষ। ছেলে নিরুদ্দেশ, বউ মারা গেছে, ঘরে
বয়সের মেয়ে। এই মেয়ে সাবিত্রীর বিয়ে দিতে হবে বলেই লোকটা সবিতাকে বিয়ে করেছিল পাঁচ হাজার টাকা নগদ নিয়ে। সেই পাঁচ হাজার আর সবিতার দেড় ভরি গয়না নিয়ে আর কিছু ধারকর্জ করে সাবিত্রীকে পার করল। তারপর বছর না ঘুরতেই সাবিত্রী গেল, তারপর লোকটাও গেল। রেখে গেল দুটো সন্তান।
