অনেক লড়াই করতে হয়েছে, ধৈর্য ধরতে হয়েছে।
শমিত একটু হতাশার গলায় বলল , আমি তো অনেক লেখাপড়া শিখে এসেছি, এখানেও পি এইচ ডি করলাম, কিন্তু আমার যা সাকসেস বা টাকা হয়েছে বা হবে তুই তার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে আছিস।
কুইনসে একটা বাড়ি কিনেছে লাচ্চু। বেশ বড় বাড়ি। দু-খানা দামি গাড়ি আছে তার। শমিতকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে একদিন আটকে রাখল সে।
শমিত বলল , এত বড় বাড়িতে একা থাকিস, বিয়ে করিসনি কেন?
করেছি। তিনবার। তারপর নাক–কান মলেছি, আর বিয়ে নয়।
কেন রে? বিয়ে কি টিকল না?
প্রথম দুটো বউ ছিল আমেরিকান। প্রথমটা তো একেবারে দুশ্চরিত্র। দ্বিতীয়টার ছিল টাকার খাঁই। বছরখানেকের মধ্যেই টাকাপয়সা একেবারে দুয়ে নিয়েছে। তিন নম্বরটা পাগল।
বলিস কী! তোর কথা শুনে তো বিয়ের কথা ভাবতেই ভয় করছে।
এ দেশেবিয়ে করিস না। দেশে গিয়ে করিস।
আজকাল বাঙালিরাও কি আর ভালো আছে?
তা হয়তো নেই, কিন্তু তারতম্য হয়তো আছে। তবে আমার মনে হয়, বিয়ে জিনিসটাই বাজে।
তুই তা হলে সিঙ্গল থাকবি?
অবশ্যই।
তোর গার্ল ফ্রেন্ড আছে?
না, তাও নেই। আমার মাথায় কাজের চিন্তা এত প্রবল যে সেক্স নিয়ে ভাবিই না।
তা হলে তোর রাত কাটে কী করে?
লাচ্চু হাসল, মোষের মতো ঘুমোই। শোন, আমার একটা বউয়ের দরকার ছিল বটে, কিন্তু বেড পার্টনার হিসেবে নয়। বউ হতে পারত আমার ব্যাবসার মস্ত সহায়। আমার বিশ্বাসযোগ্য একজন বন্ধু। নইলে একটা মেয়েমানুষকে তার শরীরের জন্য পুষব এই আইডিয়াটাই আমার ভালো লাগে না।
যাই হোক, তোর একজন পার্টনার কিন্তু দরকার।
সে পরে ভাবা যাবে। আমার কাছে দু-দিন থাক তা হলেই বুঝবি আমার দিন কেমন উড়ে যায়। রোমান্সের ছিটেফোঁটাও নেই। তবে টাকা আছে।
তুই কি অনেক টাকা করেছিস?
এখানে অনেক মানেও তো যথেষ্ট নয়। নিউইয়র্কে চারদিকে চেয়ে টাকার কী খেলাটাই না দেখতে পাই। না রে, আমেরিকার তুলনায় আমার কিছুই সম্বল নয়। তবে চলে যায়।
লাচ্চু নিজে কথা বলতে-বলতে বারবার মা-বাবার কথা ভাবছিল।
শমিত বলল , তুই আজ খুব আনমনা।
লাচ্চু মাথা নেড়ে বলল , হ্যাঁ। অনেকদিন ডলার ছাড়া আর কিছুই চিন্তাই করিনি। এখানে এসে কষ্ট আর লড়াই কম করতে হয়নি। মা-বাবা বা বোনটার কথা মাঝে-মাঝে মনে পড়ত বটে কিন্তু টাকা ছিল না। আজ হঠাৎ তোর মুখে মা আর বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনে হঠাৎ কেমন রুটলেস লাগছে। বাংলায় বোধহয় ছিন্নমূল বলে।
শমিত তিন নম্বর দুঃসংবাদটা দিল বিদায় নেওয়ার আগে। লাচ্চু তাকে বলেছিল, দেখ, দুনিয়ায় তো আমার আপনজন বলতে এখন শুধু বোনটা। তার ঠিকানা জানিস?
শমিত একটু দ্বিধায় পড়ল। তারপর বলল , দেখ, তোকে পরপর খারাপ খবর দিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। তবু দিচ্ছি। তার কারণ, লক্ষ করলাম তুই বেশ শক্ত মানুষ। শাক–সংবাদগুলো তোকে কাহিল করেনি তেমন।
লাচ্চু উদ্বেগের সঙ্গে বলে, তার মানে কী? সাবিত্রী কি বেঁচে নেই?
না। বিয়ের এক বছর বাদে বাচ্চা হতে গিয়ে ইনফেকশানে মারা যায়।
লাচ্চু মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বলল , মা-বাবার তবু বয়স হয়েছিল, কিন্তু সাবুটার তো অল্প বয়স। হ্যাঁ রে, তিন–তিনজন মরে গেল? এরকমও হয় নাকি?
ব্যাড লাক রে ভাই, কী করবি?
তা হলে কি আমার আর কেউ নেই?
ভারচুয়ালি না। তবে যদি সত্মাকে ধরিস তা হলে বলতে হবে, আছে।
দুর! সৎ মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক কীসের?
শমিত কথাটা স্বীকার করল। বলল , হ্যাঁ, সত্মায়েদের সম্পর্কে আমরা ভালো কথা কখনও শুনিনি বিশেষ। তবে এই ভদ্রমহিলাকে আমি দেখেছি। খুবই রোগভোগা মানুষ। দুটো বাচ্চা, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। তোর বাবা তো তোর বোনের বিয়ে দিতে গিয়েই ফতুর হয়ে যান, ফলে এদের জন্য বিশেষ কিছু রেখে যাননি। ভদ্রমহিলা খুব সামান্য একটা আয়া বা ওই ধরনের কাজ করেন। খুব কষ্ট।
লাচ্চুর ভিতরে কথাগুলো ঢুকলই না। তার চোখে আজ বারবার জল আসছিল। অতীতটা একেবারেই মুছে গেল। শিকড়ের আর কোনও বন্ধন নেই। তিনটে মুখ বারবার ঘুরেফিরে স্মৃতিতে ভেসে উঠছিল। মা, বাবা, সাবি।
এক উইক এন্ডের শেষ রবিবার বিকেলে শমিত চলে যাওয়ার পর একা হল লাচ্চু। একা হয়েই বুঝতে পারল, কতখানি একা সে। চারদিকটা যেন খাঁখাঁ করছে। ধূধূ করছে। কুড়ি বছর বয়সে যখন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল তখন লাচ্চুর পিছুটান ছিল না। সামনে ছিল শুধু অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ, বুকে ছিল বেপরোয়া সাহস এবং আত্মনির্ভরতা। উনত্রিশ বছর বয়সে এখন লাঞ্জু আর তা নেই। আমেরিকার কাজ পাগল সমাজে এমনিতেই মানুষ একটু একা। তার ওপর এখানে পারিবারিক বন্ধন জিনিসটা তেমন দৃঢ় নয়, তাই মানুষ আরও একা। কাজ নিয়ে থাকে, তাই ওসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। লাচ্চু আমেরিকান নাগরিক বটে, কিন্তু চরিত্রে তা নয়। ফলে তার মধ্যে একটা হঠাৎ অসহায় একাকিত্ব আজ বারবার গুমরে উঠছে। কুইনসের এই মাঝারি বাড়িটা যেন বড্ড ছমছম করছে। লাচ্চু রাতে খেল না। অনেক রাত অবধি কাঁদল। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে।
শেষ রাতে একটু ঘুমোল। সকালে উঠে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিত্যদিনের কাজে। কাজ, কাজ ছাড়া এই একাকিত্বকে ভুলে থাকবার কিছু নেই। সে মেরামতির কারবার একজন গুজরাটিকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সে কম্পিউটারের ব্যাবসা করে। বেশিরভাগই কন্ট্রাক্ট মেইনটেনেন্স। তাতে তার প্রচুর ডলার আয় হয়।
