দেশটা কঠিন। চট করে যে এখানে কিছু করে বা হয়ে ওঠা যাবে না এটা সে জানত। আর জানত কোনও গির্জাটির্জা বা মিশনারির আশ্রয় নিলে বেঁচে যাবে। প্রথম দিনদুয়েক মাইনের টাকা ভেঙে খেল আর বড়-বড় ফ্লাই ওভারের নীচে শুয়ে রাত কাটাল। ভাগ্য ভালো যে তখন শীতকাল ছিল না।
নিউইয়র্ক শহরে পায়ে হেঁটে ঘুরতে–ঘুরতে সে একদিন বাস্তবিক ভাগ্যক্রমে একটা হোম ফর দি ডেস্টিটিউটস পেয়ে যায়। তারা যে তাকে দু-হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিল তা নয়, তবে সে কাজকর্ম করে দেবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় ঠাঁই হয়ে গেল।
কাজকর্ম মেলাই ছিল। লাচ্চু খাটত খুব। মাসখানেক পরে ইতালিয়ান একটা দোকানে চাকরি হল তার। থাকত নিউইয়র্কের কুখ্যাত বস্তিতে, যেখানে হেন পাপ নেই যা হয় না। এখানেই সে শেখে, মার্কিনিরা যেসব জিনিস ফেলে দেয় সেগুলো কুড়িয়ে এনে কিছু লোকের জীবিকা নির্বাহ হয়।
লাছুর মাথা পরিষ্কার। লেখাপড়ায় মাথাটা না খুললেও তার প্রিয় হল যন্ত্রপাতি, কলকবজা ইত্যাদি। মাঝে-মাঝে সে জাঙ্ক থেকে টিভি বা টু–ইন–ওয়ান কুড়িয়ে এনে খুলে ফেলে ভিতরকার মেকানিজম বুঝবার চেষ্টা করত। দিনকতক চেষ্টার পর সে একটা টিভি সেট সারিয়ে ফেলল। মেরামত করল একটা সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর এবং একটা বাতিল ক্যামেরা। আত্মবিশ্বাস বাড়ছিল তার।
আমেরিকানরা বেশির ভাগ জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনে। এই যে গারবেজ করার প্রবণতা এর কারণ অনুধাবন করে লাচ্চু বুঝল, জিনিস খারাপ হলে তা সারাতে যে মজুরি লাগে তা ভয়াবহ। তার চেয়ে নতুন কেনাই লাভজনক।
লাচ্চু একটা হোম সার্ভিস খোলার চেষ্টা করতে লাগল। টিভি বা ছোটখাটো ইলেকট্রনিক জিনিস খারাপ হলেই ফেলে না দিয়ে অল্প পয়সায় সারিয়ে নিতে আমেরিকানদের কেমন লাগবে? সব আমেরিকানই তো আর বড়লোক নয়!
কষ্টে কিছু টাকা জমিয়ে এবং ফাঁকে-ফাঁকে সারাইয়ের কাজ লিখে লাচ্চু তৈরি হতে লাগল। সে আলাপি এবং মিশুকে ছেলে। টকাটক বেশ কিছু জানপয়ান হয়ে গেল তার। যন্ত্র সারানোনার ডাকও আসতে লাগল ঘনঘন। সেইসঙ্গে ডলার।
দু-বছর বাদে জেনারেল অ্যামনেস্টি ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে আমেরিকান নাগরিক হয়ে গেল। বাঁচোয়া। ব্রংকস বরোতে একটা ঘিঞ্জি পাড়ায় শেয়ারে একটা দোকানঘর করল সে। সেখানে পুরোনো যত ফেলে দেওয়া জিনিস থেকে পার্টর্স খুলে নিয়ে গুছিয়ে রাখত সে। পরে অন্য সব মেশিনে সেগুলো লাগাত।
মজা হল আমেরিকানরা সব জিনিসই খারাপ হলে ফেলে দিতে চায় না। কোনও জিনিসের সঙ্গে হয়তো স্মৃতি জড়িয়ে আছে। কাজেই লাচ্চু যখন স্থানীয় একটা দৈনিক পত্রে বিজ্ঞাপন দিল তখন তার দোকানে বেশ খদ্দের আসতে লাগল, এবং ডলারও।
নৰ্মা নামে একটি মার্কিন মেয়েকে সে বিয়ে করে তেইশ বছর বয়সে। কিন্তু মেয়েটা বড্ড উড়নচণ্ডী। বিয়েটা আপসে ভেঙে গেল এক বছর বাদে। দ্বিতীয় বিয়েটা সে করল পঁচিশ বছর বয়সে। ছাব্বিশে সেটাও ভাঙল। পরের বিয়েটা সে করল একটা বাঙালি মেয়েকে। দেখা গেল, মেয়েটা পাগল। বাপ-মা পাগলামির কথা চেপে রেখে বিয়ে দিয়েছিল যখন মেয়েটার কিছুদিনের জন্য স্বাভাবিকত্ব ফিরে এসেছিল। সাতাশ বছর বয়সের মধ্যেই তিন–তিনটে বিয়ে ও বিচ্ছেদ থেকে লাচ্ছ্বর ধারণা হল, বিয়ে তার কপালে নেই, ও তার সইবে না। সে টাকা রোজগারে মন দিল।
ঊনত্রিশ বছর বয়সে লাচ্চু এখন মাঝারি ধনী। তার তিনটে দোকান বেশ রমরম করে চলে।
লাছুর সঙ্গে একদিন দেখা হল পুরোনো এক বন্ধুর। সে আমেরিকায় পড়তে এসেছিল। লাছুর সঙ্গে বাড়ির কোনও যোগাযোগই ছিল না। শমিতের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ম্যানহাটনের রাস্তায়। অনেক কথার পর অবশেষে বন্ধু শমিত বলল , বাড়ির কোনও খবর রাখিস না?
না। কেন বল তো!
তোর বাবা চার বছর আগে মারা গেছেন।
সে কী!
তুই পালিয়ে যাওয়ায় শক পেয়েছিলেন তো। তাই—
লাচ্চুর মনটা তার অত্যাচারী বাবার শোকে বেশ কাতর হয়ে পড়ল। চোখে জল এল। ঠিক কথা যে, ছেলেবেলা থেকে বাবার আদর বা প্রশয় সে পায়নি। রাগি বাবা কারণে–অকারণে বেধড়ক মারত। এও সত্যি বাবার হাত থেকে বাঁচবার জন্যই সে বাড়ি থেকে পালায়। বাড়ির সঙ্গে তার সম্পর্কের পূর্ণচ্ছেদও সেইখানেই ঘটে যায়। তবু আজ হঠাৎ মৃত্যুসংবাদটা পেয়ে মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল তারও।
সে বলল , মা কি বেঁচে আছে?
শমিত একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বলল , আছে।
কিন্তু শমিতের মুখের ভাব অন্য কথা বলছে। লাচ্চু বলল , তুই একটা কিছু চাপছিস। খুলে বল।
তুই পালিয়ে আসার পর তোর মা পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি–বাড়ি ঘুরে তোকে খুঁজত। সারা রাত সদর দরজা খুলে বসে থাকত। তারপর একদিন পিছনের পুকুরে ভোরবেলা তার লাশ পাওয়া যায়।
লাচ্চু অস্থির হল না। কিন্তু কাঁদল। বাবার মৃত্যু নয়, মায়ের মৃত্যুর জন্য সে সরাসরি দায়ী। বলল , বাবা কি আবার বিয়ে করেছিল?
হ্যাঁ। তো সেই মা বেঁচে আছে।
আমার ছোট বোনটা! তার খবর কী?
বিয়ে হয়ে গেছে।
তারা কি জানে যে, আমি এখানে আছি?
শমিত মাথা নাড়ল, না। তোর খবর কেউই তো জানে না। সবাই ধরেই নিয়েছে, হয় তুই বেঁচে নেই, না হলে সাধু হয়ে গেছিস। কিন্তু তুই তো দেখছি আমেরিকায় বেশ জাঁকিয়ে বসেছিস।
