তার নিজের বিষণ্ণতা ছিল অমোঘ। একদিন এই বজ্রপাতের শব্দ শুনিয়ে গেল।
শংকরের জন্য ভাবতে বসে কখন নিজের কথা ভাবতে থাকি। আমারও একদিন দেখা দেবে হৃদরোগ? কিংবা কোনও রক্তক্ষরণ? নিদেন দুর্ঘটনা?
হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরলে তাকে দেখতে যাই।
–কেমন আছেন শংকর?
–আরে, আসুন, আসুন। মা দেখে যাও, কে এসেছে!
মাসিমা তার মায়ের হাসিটি মুখে করে আসেন–দ্যাখো তো, শংকর কী কাণ্ডটা বাধাল!
শংকর অনেক কিছু বুঝত, জানত। অনেক বিষয়ই ছিল তার প্রিয়। তবু সবচেয়ে প্রিয় ছিল লেখার কথা।
বললাম–ভালো কবিতা লিখছেন এখন।
–ছেড়ে দিন ওসব কথা। অন্য সবার খবর কী?
অনর্গল তার কাছে নানা কথা বলা যেত। তার বিশ্বস্ততা ছিল খাঁটি সোনার মতো।
উনিশশো একষট্টি সালে আমরা দল বেঁধে জামসেদপুর যাই। শংকর যায়নি। কলকাতার বাইরে সে কদাচিৎ গেছে। নৈহাটি যেতে হলেও সে নার্ভাস হয়ে পড়ত। কিন্তু কলকাতা ছিল তার অনায়াস বিচরণের ক্ষেত্র।
বললাম–আর ড্রিংক করবেন না।
–ছেড়ে দিন।
–বিয়ে করছেন কবে?
–ছেড়ে দিন।
–আবার সুতৃপ্তির আড্ডায় আসুন। আপনি নাহলে জমে না।
–ছেড়ে দিন।
ছাড়তে-ছাড়তে অবশিষ্ট তার কী ছিল কে জানে! ক্রমে সে মায়ের আঁচলধরা হয়ে যাচ্ছিল ছেলেবেলার মতো। এমনভাবে ‘মা’ ডাকত যেন এক অবোধ শিশু পৃথিবীতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। ‘খুকু’ বলে যখন বোনকে ডাকত মনে হত তার বোনটি বুঝি কোলের খুকি, কোথাও পড়ে টড়ে যাবে, কাঁদবে।
একদিন আচমকা শুনি দ্বিতীয় বর্জ্যের শব্দ–শংকর আবার হাসপাতালে।
অপেক্ষা করি আরোগ্য সংবাদের জন্য।
সংবাদ অবশেষে আসে। শংকর বাড়ি ফিরেছে। যাই।
–শংকর।
–আরে, আসুন, আসুন।
–এসব কী হচ্ছে?
–ছেড়ে দিন।
একবারও কখনও সে তার রোগযন্ত্রণার কথা বলেনি। এসব বলতে সে ভালোবাসত না। কতগুলো ব্যাপারে তার বিরাগ ছিল তীব্র। কমদামি সিগারেট, রুমাল, বাইরে যাওয়া। তেমনি নিজের ব্যাধির কথাও।
একদিন এল ছোট ভাইয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে। সঙ্গে খুকু।
বললাম–ছোট ভাইয়ের বিয়ে! বড় ভাই বাকি রইল কেন?
–আহা, ছেড়ে দিন না ওসব কথা।
–আমার বউ বলল –না ছাড়াছাড়ির কথা নয়। এবার মত করে ফেলুন।
লাজুক মুখে বলল –সময় পার হয়ে গেছে।
সেই বিয়েতে বড় ধুম হয়েছিল। যেন এক সাহিত্যবাসর। শ’খানেক কবি–সহিত্যিকের হল্লা। শংকর বরকর্তার সাজে সেজে বেড়াচ্ছে। হাত ধরে, কাঁধ ধরে, আন্তরিক হর্ষধ্বনিতে অভ্যাগতদের ধরে আনছে দরজার মুখ থেকে। চেঁচাচ্ছে–দ্যাখো, দ্যাখো, কে এসেছে।
তারপর আর একদিনও তার নিরালা দোতলার ঘরে বসে অনেকক্ষণ কত কথা বলেছি।
সে আমাকে আশ্বাস দিয়েছিল–হবে।
এক সন্ধেবেলা মেয়েকে নিয়ে রাসবিহারী অ্যাভনিউয়ের এক ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। ভাবলাম, যাই শংকরকে দেখে আসি।
মাসিমা খুব খুশি হয়ে বলেন–এসো, এসো। শংকর তো অফিসের কাজে গৌহাটি গেছে।
–গৌহাটি! অবাক হই। শংকর কোথাও যেতে ভালোবাসত না যে। মাসিমা বলেন–যেতে দিতেই হল বাবা। চাকরি। শংকরও খুব যেতে চেয়েছিল।
–কীসে গেল?
–প্লেনে।
মনটা দোল খায়। হার্টের রুগি।
মাসিমা মুখ দেখে বুঝে বললেন–শুনল না। কী করব বল!
–এবার ওর বিয়ে দিন মাসিমা। বয়স হল।
–তোমরা ওকে রাজি করাতে পারলে না তো! যা হোক বাবা, এবার এক পাত্রী ঠিক করেছি। মেয়েটির পোলিও হয়েছিল, পা একটু খোঁড়া, কিন্তু বড় ভালো মেয়ে তোমরা প্রার্থনা করো, যেন বিয়েটা দিতে পারি।
খুব খুশি হয়ে এলাম সেদিন।
বারবার একটা উড়োজাহাজের কথা মনে পড়ছিল। বারবার।
উড়োজাহাজ কি ভালো হার্টের রুগির পক্ষে? ভালো?
শংকর এখন গৌহাটির অফিসেই বুঝি স্থায়ীভাবে কাজ করছে। চিঠি দেয় না। সে আমাদের সংসর্গ ত্যাগ করেছে। আসে না। সে আমাদের মুখ দেখতে চায় না।
ভয় হয়, যদি আবার আমার জীবনে কখনও মৃত, নিষ্ফলা সময় আসে তখন কে এসে তার বিশাল কাঁধ দিয়ে ভার নেবে আমার। গম্ভীর কামানের গলায় বলবে–ঘাবড়াবেন না। হবে।
সম্পর্ক
লাচ্চু আমেরিকায় গিয়েছিল জাহাজে। তখন তার কুড়ি বছর বয়স। ডাকাবুকো, উচ্ছৃঙ্খল এবং বন্ধনহীন। বাপের সঙ্গে বনিবনা ছিল না, কারণ তার বাবা ননীগোপাল রাগি মানুষ। ছেলেকে শাসন করাকে অত্যধিক গুরুত্ব দিতেন। লাচ্চুকে মাঝে-মাঝে বদমায়েশির জন্য এমন মার দিতেন যে পরে ডাক্তার ডাকতে হত। কতবার যে বাবার মার খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে লাচ্চু তার হিসেব নেই।
বিশ বছর পেরোয়নি তখনও, লাচ্চু তার এক বন্ধুর দাদাকে ধরে মালের জাহাজে খালাসির চাকরি পেল। মতলব ছিল জাহাজ আমেরিকায় যদি কখনও যায় তখন লাচ্চু পালাবে।
সুযোগ এল প্রায় সাত মাস বাদে। সাত মাসে জাহাজে সি সিকনেস, আমাশা এবং দুজন সমকামী খালাসির অত্যাচার তাকে সইতে হয়েছিল। তবে তার বাড়ির জন্য মন কেমন করত না। বরং একটা জ্বালা ছিল, একটা প্রতিহিংসাপরায়ণতাও।
জাহাজটা ছিল স্প্যানিশ। হামবুর্গ থেকে মাল নিয়ে সাত মাসের মাথায় নিউইয়র্কে পৌঁছোল। পৌঁছনোর কথা ছিল না। আটলান্টিকে প্রবল ঝড়ে জাহাজ যায়-যায় হয়েছিল। তিন দিন টানা ঝড়। লাচ্চু বাঁচার আশাই করেনি। যখন নিউইয়র্কে পৌঁছল তখন মনে হল, বেঁচে যখন আছি তখন একটা কিছু করতেই হবে।
ভয়ডর জাহাজেই কেটে গিয়েছিল লাচ্ছ্বর। অচেনা, অজানা জায়গা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, বিপদের আশঙ্কা, ধরা পড়ার সম্ভাবনা এসব নিয়ে সে বিশেষ মাথা ঘামাল না। তবে হট করে না পালিয়ে সে দিনতিনেক অপেক্ষা করল। তারপর একদিন ডকে নেমে সুযোগ বুঝে ভিড়ে মিশে গেল।
