হ্যাঁ, মাননীয় প্রেসিডেন্ট। সংবাদপত্রে তার অকাট্য প্রমাণ আছে।
ভারতীয় পর্যটক, আমি এইমাত্র খবর পেলাম ভারত প্রযুক্তিবিদ্যায় আরও এগিয়ে গেছে।
সে মোটরগাড়ি এবং লরি তৈরি করতে পারে। তুমি এ কথাটা আমাকে জানাওনি।
কিন্তু মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আপনি কি দেখেছেন, অধিকাংশ আমেরিকানই বুড়ো বয়সে খুব একা হয়ে পড়ে। তাদের স্ত্রী কাছে থাকে না বা ছেড়ে চলে যায়। ছেলেমেয়েরা ভিন্ন হয়ে যায়। মৃত্যুর সময় হলে…
ভারতীয় পর্যটক, তুমি এখনও হিউস্টন দেখনি, এমপায়ার স্টেট বিল্ডিংসে ওঠোনি, লাস ভেগাসে জুয়ার আড্ডায় যাওনি, এমনকী এখনও একটিও মার্কিন মেয়েকে চুমু খাওনি! এটা কেমন কথা?
কিন্তু মাননীয় প্রেসিডেন্ট, একাকিত্বের কথাটা আমাকে শেষ করতে দিন। আমি আমেরিকার অভ্যন্তরে ঢুকে–
কার্পেটটা আবার আমরা নতুন করে পাতব ভারতীয় পর্যটক। এবার সেটা এত সুন্দর হবে যে তার তলায় কী আছে তা আর কারও দেখতে ইচ্ছেও করবে না!
আরোগ্য
আরোগ্য!
একেই কি আরোগ্য বলে? কে জানে! নার্সিংহোমের বিশাল জানালার পর্দাটা আজ সরানো। ভোরের আলোয় ভরে আছে ঘরখানা। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে একগোছা পাঁচমিশেলি ফুল। এ ঘরে কোনও গন্ধ নেই। কিংবা থাকলেও তা নাকে সয়ে গেছে বলে শান্তশীল সাধারণত কোনও গন্ধ পায় না। আজ এয়ারকন্ডিশনিং বন্ধ এবং জানলার কাঁচের শার্সি খোলা বলে সাত তলার এই ঘরে বঙ্গোপসাগর থেকে নোনা বাতাস এসে ঢুকে পড়েছে বুঝি!
শান্তশীল খুব গভীর শ্বাস নিল।
মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়েস তার। দুরন্ত স্বাস্থ্য ছিল এককালে। তবু যে কেন হৃদযন্ত্র এমন। গণ্ডগোল পাকিয়ে বসল কে জানে! মনে হচ্ছে, আজ তার আরোগ্যের দিন।
কয়েকবার শ্বাস নিল শান্তশীল। তার ওঠা বারণ, হাঁটা বারণ। ডাক্তার অনুমতি না দিলে উঠে বসা অবধি বারণ। নিষেধের বেড়াজাল তাকে ঘিরে ছিল কাল অবধি। আজ কি সে মুক্তি পাবে?
ধীরে, খুব ধীরে শান্তশীল পাশ ফিরল। জানালার দিকে। কলকাতার আকাশরেখা কী মনোরম! ভোরের আলোয় কী পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন দেখাচ্ছে সাততলা থেকে কলকাতা! এ পাড়াটায় কোথাও নোংরা নেই, ভাঙা বাড়ি নেই, কুশ্রীতা নেই।
শরৎকাল। শান্তশীলের বড় প্রিয় ঋতু। শরতে শিউলি আর কাশফুল ফোটে, শরতে ঘাসের ওপর ঝরে পড়ে শিশিরের মুক্তো, শরতে ঢাকের বাদ্যি আর আগমনী গান।
শান্তশীল কি উঠবে একটু? বসবে? দু-এক পা হাঁটবে? বড্ড ভয় করে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিল সে। ডাক্তার গুহ বলেছেন, যদি পৃথিবীতে আরও কিছুদিন বাঁচতে চান তাহলে ক’টা দিন নড়াচড়া অবধি বন্ধ রাখুন।
ডাক্তার গুহ রুগিদের একটু ভয় দেখাতে ভালোবাসেন। তাঁর অভিমত হল, হার্টের রুগিদের একটু ভয় খাওয়ানো ভালো, তাতে দুষ্টুমিটা কমবে।
শান্তশীলের বাঁ-দিকে পাশ ফিরে শোয়া অবধি বারণ। ভাগ্য ভালো জানালাটা তার ডান দিকে।
নিজের হৃদযন্ত্রকে ভারী ভয় পায় আজকাল শান্তশীল। নিজের শরীরকেই ভয় পায়। এই রহস্যময় দেহযন্ত্রকে সে এতকাল টেরই পেত না।
বিশাল এ-দেওয়াল ও-দেওয়াল জোড়া জানালা দিয়ে প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। আজ যেন বাইরেটা হুহু করে ঢুকে আসছে ঘরে। রোদ, বাতাস, দৃশ্য। কতকাল সে শুয়ে আছে বিছানায়! কতকাল বাইরে যায়নি। এমনকী কাল অবধি তার কেটেছে আধা ঘরের মধ্যে। যন্ত্রণায় ডুবে থেকে কতগুলো দিন বেঘোরে কেটে গেল!
বুকে একটু ভার এখনও বোধ করে শান্তশীল। দিনে কত যে ট্যাবলেট খেতে হয় তার কোনও হিসেব নেই। জিব বড় বিস্বাদ। সারাক্ষণ এক ক্লান্তিকর পুকুরে ডুবে থাকা।
কফির গন্ধে মুখখানা আস্তে ফেরাল শান্তশীল।
গুড মর্নিং, স্যার।
শান্তশীল তার নার্সের দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। মধ্যবয়স্কা, কালো, দেখতে সুন্দর নয়। তবু এই সকালের আলোয় মহিলার চেহারায় বেশ নতুন মাত্রা যোগ হল আজ।
হাসিমুখে সে বলল , ফাইন মর্নিং। আমি কি আজ কফি খাব?
মেয়েটি ভাঙা বাংলায় বলল , আজ কয়েকটা সিপ ড্রিংক করবেন। ব্ল্যাক কিন্তু। নো সুগার।
অনেকদিন বাদে আজ কফি খাবে বলে শান্তশীল উঠতে যাচ্ছিল।
মেয়েটি বলে উঠল, উঁহু ডোন্ট একজার্ট। আমি বসিয়ে দিচ্ছি।
হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে খাটের আধখানা ধীরে-ধীরে ওপরে তুলে দিল মেয়েটি।
অবসাদ। বড় অবসাদ। শান্তশীল কফির জন্য হাতখানা পর্যন্ত নাড়াল না কিছুক্ষণ।
মহিলাটি তার বুক থেকে পেট অবধি ন্যাপকিনে ঢেকে দিলেন যত্ন করে। তারপর ফিডার কাপটি হাতে নিয়ে বললেন, জাস্ট এ ফিউ সিপস।
শান্তশীল পাতলা হালকা কফির লিকারে প্রথম চুমুক দিয়েই টের পেল, যতটা ভালো লাগবে বলে ভেবেছিল ততটা লাগছে না। তবু খেলো।
মুখটা সযত্নে মুছিয়ে দিলেন মহিলা। খাটটা নামাতে যাচ্ছিলেন, শান্তশীল হাত তুলে বলল , থাক, একটু বসে থাকি।
বেশিক্ষণ নয় কিন্তু। ডাক্তার অ্যাডভাইস করেছেন, শুয়ে থাকতে হবে।
শান্তশীল কলকাতা শহরের বিশাল পটভূমির ওপর ভোরের আলোর নরম আভা দেখতে লাগল। সে যেন বড় ভাগ্যবান। সাততলা থেকে কলকাতার এই শোভা যে সে আজ দেখতে পাচ্ছে তা তার নিজের কৃতিত্ব নয়। সে দরিদ্র ঘরের মেধাবী ছেলে। একটা সময়ে জীবনে সে বেশ কষ্ট পেয়েছে অভাবে। মেধাবী বলেই চটপট পাশটাশ করে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে ভালো চাকরি পেয়েছে। তার কোম্পানি তাকে ফ্ল্যাট দিয়েছে, গাড়ি দিয়েছে। এই চিকিৎসার বিপুল খরচও বহন। করবে কোম্পানি। তার কোনও মাথাব্যথা নেই। গরিবের ছেলে হয়ে যেদিন সে টাকার মুখ দেখতে লাগল, যেদিন থেকে স্ট্যাটাস এবং এটিকেট নিয়ে মাথা ঘামাতে শুরু করল, সেদিন। থেকেই কিন্তু বদ অভ্যাসও ধরে ফেলল তাকে। সাধারণত সুরা–মদির ঘুম তার এত ভোরে ভাঙে না, যদি বা ভাঙে শরীরে থাকে রাজ্যের জড়তা, হ্যাং ওভার। আজ সেসব নেই। আজ ভারী ভালো লাগছে তার।
