স্বামীর লঘু আহার্যের ব্যবস্থা করে স্ত্রী তাঁর বিশ্রামের ব্যাঘাত যাতে না হয় সেইজন্য পুত্রকন্যাদের গৃহান্তরে নিয়ে গেলেন। অপরাপর দিন তিনি যেমন পুত্র-কন্যাদের কাছে তাদের পিতার চরিত্রের নানাবিধ দুর্বলতার কথা বলেন, আজ তা মোটেই করলেন না। বরং বলতে লাগলেন—তোমাদের পিতা এক মহৎ পুরুষ। তাঁর চরিত্রের দীনভাব, অক্ৰোধী স্বভাব, সেবাপরায়ণতা ও ত্যাগ দৃষ্টান্তস্বরূপ। তিনি সহনশীলতায় পর্বততুল্য। তোমরা তোমাদের জীবনে তাঁর অনুসরণ করো। তিনি আমার দেবতা, তোমাদেরও তিনি ধ্যেয় হোন।
এইসব কথা তিনি আবেগের সঙ্গে বললেন। বলতে-বলতে চোখে জল এসে গেল। রাজার সহস্র শ্রবণ উৎকর্ণ রয়েছে চারদিকে! তিনি কি শুনছেন?
.
কর গ্রহণের জন্য নাগরিক ও জানপদবর্গের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে করবিভাগের রাজকর্মচারীরা। তারা সকলের কাছে গিয়ে বলছে কর মানে হাত। করগ্রহণ মানে হাতে হাত মিলানো। আপনারা উন্মুক্ত হৃদয়ে সহযোগিতার হাতখানি প্রসারিত করুন। প্রদান ও গ্রহণে আমাদের হৃদয়ের বিনিময় হোক। বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব উজ্জ্বল হোক।
চাষি, নাগরিক ও ব্যবসায়ী সবাই করপ্রদানে উন্মুখ। রাজকর্মচারীরা গলদঘর্ম হচ্ছেন, তবু হাসিমুখে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। বিতর্ক নেই, কটুভাষণ নেই, হিসাবের গোলমাল নেই, করপ্রদানকারীরা উচ্চৈস্বরে বলছেন—রাজাকে যা দেওয়া যায় তার দশগুণ ফিরে আসে। আমার যে বাহু কর দেয় সস্র বাহু এসে সেই বাহুর শক্তি বৃদ্ধি করে।
সবাই জানে, রাজা দেখছেন, রাজা শুনছেন।
শান্তিরক্ষীরা ঘুরছেন সর্বত্র। তাঁদের চোখে ঠমক, বা মুখে কটুকাটব্য নেই, তাঁরা অপরাধীকে অন্বেষণ করার চেয়ে অপরাধের অন্বেষণেই বেশি তৎপর। অপরাধ সংঘটনের আগেই তা নিবারণ করছেন। উদ্যোগী হত্যাকারীর হাত হত্যার আগেই তাঁদের হস্তে ধরা পড়ছে। লুণ্ঠনকারীরা লুণ্ঠনের সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতি অর্ধপ্রহরে শান্তিরক্ষীর শকট সর্বত্র পরিভ্রমণ করছে। নিরলস সজাগ সতর্ক।
বহিরাগত বণিকেরা রাজকর্মচারীদের করণে উপস্থিত হচ্ছেন কর্মময় দিবাভাগে। একজন বললেন—আমার এ-রাজ্যে ব্যাবসায়ের আজ্ঞাপত্রটি এখনও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। সময় মূল্যবান। এই বলে উনি কোষ থেকে মুদ্রার পেটিকা বের করেন উৎকোচ প্রদানের জন্য।
সংশ্লিষ্ট রাজকর্মচারী সভয়ে চেয়ে থাকেন। রাজা নয় তো!
এই হয়তো রাজা! তিনি হাত বাড়িয়ে উৎকোচ প্রদানরত হাতখানি চেপে ধরে বলেন—শ্রদ্ধাভাজন, আপনার সেবার জন্যই আমি বেতনাদি লাভ করি। তাতেই আমার চলে যায়। অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়। আপনার আজ্ঞাপত্রটি অবিলম্বে স্বাক্ষর করে দেওয়া হচ্ছে।
অকুতোভয়ে সালঙ্কারা যুবতীরা, কামিনীকুল চলেছে রাজপথে। পুরুষেরা তাঁদের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করছে না, কেবলমাত্র পদপ্রান্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের শ্রদ্ধাসিক্ত দৃষ্টি। তাঁদের আভরণ বা। দেহসৌন্দর্যকে অনুসরণ করছে না কোনও লোভী বা কামুকের দৃষ্টি। যুবকেরা সসম্মানে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। শুক্লপক্ষে কোনও যুবকই কোনও যুবতীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় না। রাজা বলেন, পুরুষদের বিবাহ-প্রস্তাব পৌরুষের পক্ষে হানিকর। পুরুষদের থাকবে কর্মতৎপরতা, মঙ্গলমুখী সুরত। সে কেন নারীচিন্তা করবে?
এমনকী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দেহমিলনও শুক্লপক্ষে নিয়ন্ত্রিত হয়। স্ত্রীর আগ্রহ ও প্রস্তাব ব্যতিরেকে কোনও পুরুষই স্ত্রীর সঙ্গে উপগমন করেন না। স্ত্রীর সম্মতি ব্যতিরেকে দেহমিলন বলাৎকারের তুল্য অপরাধ।
বারবনিতাদের পল্লিতে স্নিগ্ধ দীপ জ্বলছে। দরজার পাশে মঙ্গলঘট। পত্রে পুষ্পে শোভিত দ্বারদেশ।
আমোদপ্রিয় নাগরিক এসে উপস্থিত হলেন একটি গৃহে।
সুসজ্জিত পতিতাটি ভূমিতে লুটিয়ে প্রণাম করলেন। করজোড়ে বললেন—প্রভু, আমি প্রকৃত নারী নই, নারীত্বের ছায়ামাত্র। হৃদয় ও প্রেম ছাড়া নারীর আর কোনও সম্পদ নেই। গৃহ ও সংসার ছাড়া তার কোনও আশ্রয়ও থাকে না। আমি ব্যতিক্রমদুষ্টা, শাশ্বত নারীত্বের আমি কেউ নই। আমি শরীরী মাত্র, রোগ সংক্রমণের ভয়দুষ্টা। আমি কেবল সাময়িক কামহরণ করতে পারি, কিন্তু পুরুষকে তৃপ্ত করতে পারি না। আতিথ্য গ্রহণের আগে আমাকে আশীর্বাদ করুন যেন আমি এই পঙ্কিলতা থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা হই।
নাগরিক বিস্মিত হন, বলেন—ভদ্রে, ভূমিকার কী প্রয়োজন? আমরা কেউ কারও কাছে বদ্ধ নই। আমি নিজেও প্রবৃত্তি-আক্রান্ত, ক্লান্ত ও পিপাসু। আমাকে আশ্রয় দাও। তুমিও প্রার্থনা করো, যেন আমি প্রকৃতিজাত দুষ্ট আচরণ থেকে মুক্ত হই। পুরুষের প্রধান পৌরুষ সংযমে ও আত্মশাসনে। আমিও ব্যতিক্রমদুষ্ট, অসহায়। তোমার গৃহের ধূলার স্পর্শ আমার ললাটে মঙ্গলচিহ্নস্বরূপ লেপন করো।
রাজা শুনছেন। রাজা দেখছেন।
আজ পূর্ণিমা।
শূন্য সভাকক্ষে দীপ নির্বাপিত। চারজন প্রস্তরীভূত নীরব দৌবারিক চারটি দ্বার প্রহরা দিচ্ছে। নিস্তব্ধতা।
রাজা সিংহাসনে বসে আছেন। সামনে প্রসারিত তাঁর ক্লান্ত পা, দুটি হাত দুদিক থেকে উঠে এসে গম্বুজের মতো ভার রক্ষা করছে তাঁর চিবুকের। অন্ধকারে তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেবল ঈগলচঞ্চর মতো তাঁর দীর্ঘ নাসার সামান্য আভাস পাওয়া যায়। কপিশ চোখ দুখানিতে জ্যোৎস্নার প্রতিবিম্ব। আর তাঁর মুকুট থেকে একটি মাণিক্যের দ্যুতি মাঝে-মাঝে প্রতিভাত হচ্ছে।
