রাজা একা। রাজা নীরব।
সভাগৃহের অলিন্দের স্তম্ভগুলির পরিসর দিয়ে জ্যোৎস্নার দুগ্ধধারা ভেসে আসছে। আজ শুক্লপক্ষের শেষ।
রাজা বসে রইলেন। চিন্তান্বিত। ব্যথিত। উদ্বিগ্ন। নগরীর কোলাহল তাঁর কানে আসছে। কাল থেকে তিনি নগর বা জনপদ পরিভ্রমণ করবেন না। কাল থেকে পক্ষকাল কৃষ্ণপক্ষ।
গভীর একটি শ্বাসমোচন করলেন তিনি।
সভাকক্ষে সারি-সারি শূন্য আসনগুলির মধ্যে হঠাৎ একটি বিশীর্ণ ছায়া নড়ে উঠল। চন্দ্রালোকের আভায় দেখা গেল একটি মানুষ যেন এইমাত্র প্রেতলোক থেকে শরীর-গ্রহণ করল। দীর্ঘ পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে লাগল রাজার দিকে।
রাজা বিস্মিত বা চমকিত হলেন না। তাঁর কপিশ চোখ কেবল স্থির চোখে ছিল। ওষ্ঠে একটু দয়ালু হাস্য।
রাজা নিজের অঙ্গুরীয় নিরীক্ষণ করতে-করতে বললেন—তুমি কে?
লোকটি অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল—মহারাজ, আমিই সেই ভাগ্যবান যার ভাগ্য এই শুক্লপক্ষে আবর্তিত হয়েছে।
রাজা গম্ভীরকণ্ঠে বললেন—দ্বারে দৌবারিক, প্রাসাদ সুরক্ষিত, এখানে প্রবেশ করলে কী উপায়ে?
অমার্জনা করে লোকটি হাসল। বলল—সর্বজ্ঞানই আপনার অধীন। আপনি সবই জানেন। হে দয়াল রাজা, আমি একদা নরহত্যা, নারীধর্ষণ, পরস্বাপহরণ সবই করেছি। নগরীর যে-কোনও সুরক্ষিত গৃহে গোপনে প্রবেশ করা আমার কাছে অতি সহজ।
রাজার মুকুটের সেই মাণিক্যের দ্যুতি লোকটির চোখে এসে পড়ল। রাজা বললেন— তারপর?
—রাজাদেশে আমার দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড হয়।
—তুমি কি অনুতপ্ত? তোমার প্রায়শ্চিত্ত কি সম্পূর্ণ?
লোকটি তার বিশীর্ণ মুখ তুলে বলল—রাজা আমি তার কি জানি। যখন বিচারের জন্য আপনার সম্মুখে আনীত হয়েছিলাম তখনই আপনাকে প্রথম দেখি। ওইরূপ সুঠাম সুন্দর তনু, ওই রাজকীয় গাম্ভীর্য ও করুণাঘন মুখশ্রী, কপিশ চোখের স্নেহ ও তীব্রতা আমাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। সেই বিহুলতা এমনই ছিল যে আমার দণ্ড কতখানি কঠোর তা পর্যন্ত আমি অনুভব করতে পারিনি। তারপর দীর্ঘ কারাবাস। কারাগারে আমাকে কঠোর অনুশাসনে চলতে হত, ছিল অসম্ভব কায়িক শ্রম, নিদ্রা বা আহার যথেষ্ট ছিল না। শুনেছি, প্রতি শুক্লপক্ষে রাজা বহির্গত হন, অনুসন্ধান করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে তাঁর উপঢৌকন দিয়ে যান। সেই উপঢৌকনের সঙ্গে থাকে রাজকীয় পাঞ্জা, যার প্রভাবে যে-কেউ রাজার প্রায় সমকক্ষ হয়ে ওঠে। প্রতি শুক্লপক্ষে লক্ষ-লক্ষ প্রজার মতো আমিও প্রতীক্ষা করতাম রাজকীয় পদধ্বনির। যদি রাজা আসেন, যদি তাঁর দয়া হয় তবে আমি মুক্তিলাভ করব, ঐশ্বর্যশালী হব। প্রতীক্ষায় এবং বিরহে দিন কাটে। শ্রম বড় কষ্টকর হয়ে ওঠে, কারাবাস অনন্ত বলে মনে হয়। স্ত্রী-পুত্রদের ভবিষ্যৎ জানি
। কারাবাসে কোনও প্রমাদ নেই, স্নেহ নেই, আত্মমর্যাদা নেই। কিন্তু আমার একটি চিন্তা সর্বদা ছিল। রাজার চিন্তা, রাজকর্মে, নিদ্রায়, জাগরণে, সর্বদাই মন বলত, রাজা আসবেন। রাজা উপহার দেবেন, মুক্তি দেবেন। ক্রমে এই চিন্তায় আমি এক অসহনীয় সুখ লাভ করতে থাকি। মাঝে-মাঝে অভিমান হত, রাজা আসে না কেন? এই অভিমান থেকে একদা আমার প্রলোভন বিদায় নিল। আমি প্রতিদিন শয়নকালে ও শয্যাত্যাগের সময়ে প্রার্থনা করতাম রাজা, আমি উপঢৌকন চাই না, মুক্তিও নয়। মহারাজ, মানুষ এ-রাজ্যে শুক্লপক্ষে সদাচার করে, কৃষ্ণপক্ষে যথেচ্ছাচার। কারণ কৃষ্ণপক্ষে আপনি রাজাবরোধে থাকেন, বহির্গত হন না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিপরীত হয়। আপনার প্রতি আমার পিপাসা এত বেড়ে ওঠে যে শুক্লপক্ষের প্রতীক্ষা শেষ হলে কৃষ্ণপক্ষব্যাপী আমি আরও ব্যাকুল হয়ে আপনার অনুধাবন করতাম। আপনার প্রদত্ত ঐশ্বর্য নয়, আপনাকেই আমার প্রয়োজন। আর কিছু চাই না। আমার কারাবাস আরও দীর্ঘতর হোক বা। আমাকে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক, আমি কেবল আপনার মুখশ্রী তার বিনিময়ে একবার মাত্র প্রত্যক্ষ করতে চাইতাম! এইভাবে আমার কারাবাসের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। চতুদর্শী তিথিতে, শুক্লপক্ষে, গতকাল আমি মুক্তিলাভ করি। ইতিমধ্যে আমার স্ত্রী গতপ্রাণা হয়েছেন, পুত্রকন্যারা ইতোভ্রষ্টস্ততঃনষ্ট হয়েছে, কারও উদ্দেশ জানি না। একাকী রাজপথে চলেছি, মন কেবল বলছে —রাজা! রাজা! শুক্লপক্ষের চতুর্দশী, রাজা ছদ্মবেশে পথে বিচরণ করছেন। তাই আমি পথচারীদের দিকে তাকাই, পরিচর্যা করি। সকলের মুখেই আমার রাজার আদল দেখতে পাই। তবু বুকভরা হাহাকার—রাজা! দেখা দাও। রাত্রিবাসের স্থান ছিল না। এক বৃক্ষতলে শয়ান ছিলাম। আজ ব্রাহ্ম-সময়ে ঘুম ভেঙে দেখি আমার বুকের ওপর আপনার সেই পেটিকা। তাতে রাজার ঐশ্বর্য, রাজকীয় পাঞ্জা।
এই বলে লোকটি তার কোমর থেকে লুক্কায়িত পেটিকাটি বের করে কৃতাঞ্জলিপুটে রাজার সামনে ধরে রইল। বলল—আপনার পেটিকা। গ্রহণ করুন মহারাজ।
রাজা মৃদুহাস্যে বললেন—তুমি গ্রহণ করবে না?
লোকটির মুখ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছিল। বলল—আপনার পবিত্র পাঞ্জা আমি বক্ষদেশে সংলগ্ন রেখেছি, কারণ তাতে আপনার হাতের ছাপ আছে। আর, আপনার যা কিছু ঐশ্বর্য আছে তা সবই আমি পেয়েছি। রাজদর্শনের বিধি অনুসারে এটুকু আমার রাজদর্শনের প্রণামীস্বরূপ আপনি গ্রহণ করুন।
রাজা উচ্চহাস্য করলেন। দৌবারিকরা ছুটে এল। রাজা হস্তোত্তোলন করে তাদের নিবারণ। করলেন। তারপর সিংহাসন থেকে দু-হাত প্রসারিত করলেন রাজা। বললেন-বৎস দাও। কিন্তু আমাকে স্পর্শ করো না। তোমার প্রেম এতই তীব্র যে আমাকে স্পর্শ করলেই তুমি লয় পাবে।
