পথিক সবিস্ময়ে তাঁর মুখ নিরীক্ষণ করে সবিনয়ে বলল—ভদ্র, আপনার বোঝাটি আমার হাতে দিন। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।
সঙ্গে-সঙ্গে অপরাপর কয়েকজন পথিক সাগ্রহে এগিয়ে এসেছিল। সকলেই আগন্তুককে অযাচিত সাহায্য করতে উন্মুখ। তাঁদের পরোপকারস্পৃহা দেখে আগন্তুক বিস্মিত হলেন। গত রাত্রিতে তিনি সদ্য এ-নগরে পদার্পণ করেছেন। এখনও সম্যক পরিচয় পাননি। যেটুকু পেলেন। তাতে বিমুগ্ধ হলেন। অচেনা পথিক যদি আত্মীয়েরও অধিক যত্নে অন্যের ভার বহন করে, যদি পথ প্রদর্শন করে দেয় তবে এ-নগরী অবশ্যই স্বর্গতুল্য।
.
সুঠাম রাজপথগুলি সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত। কোথাও কোনও আবর্জনা চোখে পড়ে না। তৈলসিক্তবৎ রাজপথের পাশেই হরিৎ তৃণক্ষেত্র, ছায়াময় বনস্পতির সারিবদ্ধ সৌন্দর্য। সূর্যোদয়ের বহুপূর্বেই পথমার্জনাকারীরা তাদের কর্মে তৎপর হয়েছে। রাজপথে প্রথমে সম্মার্জনীতে ধূলিমুক্ত করে তৎপরে চন্দনচূর্ণমিশ্রিত জলে নিষিক্ত হচ্ছে। কর্মীরা গান গাইছেন। তাঁদের মন হর্ষোৎফুল্ল। হয়তো রাজা এই পথে, এই সময়ে যাবেন।
এক বাতুল ভাগ্যান্বেষী কর্মসন্ধানে এসে আশ্রয়লাভে নিশ্চেষ্ট হয়ে বৃক্ষতলে নিদ্রিত। অন্য সময় হলে তার ভাগ্যে সম্মার্জনীর আঘাত লাভ হতে পারত, কারণ এ-রাজ্যে পথবাস নিষিদ্ধ। কিন্তু আজ একজন পুরকর্মী তাকে দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে অবনত হয়ে বিনয়বচনে বললেন— মহাশয়, এ বৃক্ষচ্ছায়া আপনার নিরাপত্তার পক্ষে প্রশস্ত নয়। ভদ্র, এই দীনের কুটীরে চলুন। আমার স্ত্রী আপনাকে পাদ্যার্ঘ্য দিয়ে বরণ করবেন। আমরা অতিথি ও দেবতায় পার্থক্য করি না।
এই বলে পুরকর্মী পথিকের মুখশ্রীর দিকে অপলক চেয়ে রইলেন। তাঁর হৃদয়ে অমরাবতীর ঘণ্টা বাজতে লাগল। রাজা! এই কী রাজা!
পথিক এই আতিথেয়তায় মূক হয়ে আবেগে অশ্রু বিসর্জন করে বললেন—এই ভাগ্যহীনের জীবনে এমন সমাদর আর ঘটেনি। আপনার মঙ্গল হোক।
সেদিন ভাগ্যান্বেষীর ভাগ্যে পূর্ণ আহার জুটল। তিনি বিশ্রামের জন্য শয্যা পেলেন। সে রাত্রে তাঁর দেহে পক্ষীকুলের পুরীষ বর্ষিত হল না। শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে নগরের দক্ষিণভাগে এক গৃহস্থের ঘরে এক শিক্ষানবিশ চোর সিঁধ কাটছিল। অন্য সময় হলে সে অবশ্যই কৃতার্থ হত। কিন্তু এই শুক্লপক্ষে গৃহস্থরা রাজার অপেক্ষায় উত্তর্ণ থাকে। তাদের নিদ্রা অত্যন্ত ভঙ্গুর, মায়ামৃগের মতো তা ক্ষণে-ক্ষণে পালায়।
গৃহস্থ উঠলেন। চোরটি তখন সদ্য গৃহে প্রবেশ করেছে। গৃহস্থের একেবারে সম্মুখে পড়ে। গেল। ভয়ে সে তটস্থ। গৃহস্থেরও সেই অবস্থা। করজোড়ে বললেন—আপনার যাঞ্চা কী?
চোর সভয়ে বলিল—আমি পরস্বাপহারক। আমাকে দয়া করে লঘু শাস্তির বিধান করুন। আমি অপরাধ স্বীকার করছি এবং আত্মসমর্পণ করছি।
গৃহস্থ মৃদু হাসলেন। রাজা কোন বেশে আসবেন তা তো কেউ জানে না। চতুর রাজা কত পরীক্ষা করেন মানুষকে, কতভাবে কাছে আসেন। তিনি স্নিগ্ধ বচনে বললেন—ঈশ্বরের করুণায় আমার তৈজসপত্র ও সম্পদ আপনার তুলনায় বেশি। আপনার সঙ্গে ঐশ্বর্য ভাগ করে নিয়ে সমবন্টন ও সমভোগের আনন্দ লাভ করতে দিন। কোনও মানুষই তার বৃত্তির জন্য পতিত হয় না, যদি সে অভাবগ্রস্ত ও নিরুপায় হয়। আপনি আশ্বস্ত হোন, আমি চৌরোদ্ধরণিক ও শান্তিরক্ষীর হাতে আপনাকে সমর্পণ করব না। বরং এতকাল যে আমি আমার পরিবেশ সম্পর্কে উদাসীনতাবশত আমার সম্পদ একা ভোগ করেছি সেজন্য আমি লজ্জিত। আপনার অবস্থার জন্য আমিই দায়ী।
এই বলে গৃহস্থ চোরকে আলিঙ্গন করলেন। সদ্য নিদ্রোথিত তাঁর স্ত্রী-পুত্র কন্যারা এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে স্ত্রীলোকেরা উলুধ্বনি ও পুরুষরা করতালি দিল।
স্ত্রৈণ ও কাপুরুষ ব্যক্তিকে রাজা পছন্দ করেন না। তা বলে রাজ্যে স্ত্রৈণ ও কাপুরুষ ব্যক্তির অভাব নেই। প্রায় সকলেই তাই।
রাজার রাজস্ব বিভাগের কর্মী এক দুর্বলচিত্ত লোকের মুখরা স্ত্রী ছিল। শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকেই স্ত্রীর কণ্ঠস্বর নিম্নমুখী হয়েছে। গৃহে শান্তি বিরাজমান। হতক্লান্ত লোকটি দিনশেষে, কর্মাবসানে গৃহে প্রত্যাবর্তনের চিন্তায় বিভীষিকা দেখত।
এখন সে অনায়াসে, অকুতোভয় গৃহে প্রত্যাগমন করে। রাজা মুখরা স্ত্রীলোক পছন্দ করেন না। রাজা পছন্দ করেন পতিভক্তিপরায়ণা, গৃহস্থলক্ষ্মী।
লোকটি গৃহে প্রত্যাগমন করলে অপরাপর দিনের মতো দজ্জাল স্ত্রী অভাব অভিযোগের কথা তোলে না। বরং গৃহ-মার্জনা করে, সাংসারিক কর্তব্যগুলি সমাধান করে, সূর্যাস্তকালে স্নানান্তে। দক্ষিণের দ্বারদেশে বসে সযত্নে দেহের পরিচর্যা করে, যাতে স্বামী দেখে খুশি হন। গুণ্ঠনে। লজ্জাবতী হয়ে কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকেন উৎসুক নেত্রে। বধূটি জানে, এখন শুক্লপক্ষ। রাজার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র।
লোকটিও জানে। অপরাপর দিন গুহে প্রত্যাগমনের পরই লোকটি কূপ থেকে জল উত্তোলন করে, শিশুকে কোলে করে থামায়, স্ত্রীর অপারগতাহেতু পড়ে থাকা গৃহকর্ম করে দেয়, এমনকী স্ত্রীর ললাট-বেদনার উপশম কল্পে সেবা করে।
লোকটি চতুর্থী তিথিতে ঘরে ফিরে এল। স্ত্রী জল উত্তোলন করে রেখেছেন, সে হস্তাপদ প্রক্ষালন করল। তার চলায় ফেরায় পুরুষোচিত্ত গাম্ভীর্য ও উপেক্ষা। গৃহকর্মের কিছু শিথিলতা প্রত্যক্ষ করে স্ত্রীকে সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিল। স্ত্রী স্বামীর সম্মুখে আসন পরিগ্রহ করলেন না। দণ্ডায়মান থেকে সমস্ত বিনীত বদনে শুনলেন, এবং অপরাধ স্বীকার করলেন।
