ঘেউও আগের মতো নেই। তার একটা ঠ্যাং সবসময় উঁচু হয়ে থাকে। তিন ঠ্যাঙে সে নেংচে নেংচে ঘোরে দাদুর সঙ্গে।
দাদু নির্বিকার। সেই হেঁটো ধুতি, খালি গা আর হাতে সবসময়ে গৃহকর্মের নানা সরঞ্জাম। মেজকাকিমা তখন ঘোমটা টেনে খুব লজ্জা-বউয়ের মতো নানা কাজকর্ম করে বেড়ায়। জেঠিমা, মা, কাকিমাদের সঙ্গে একসঙ্গেই খায়, গল্প করে, হাসেও।
এখন অধরার বড় কাজ বেড়েছে। সামনে অগ্রহায়ণে পালানের সঙ্গে তার বিয়ে, পালানকে সেই জন্য দাদু একটু জমি দিয়েছেন ঘর বাঁধতে, তাতে অবসর সময়ে ঝুড়ি দিয়ে মাটি ফেলতে হয় অধরাকে। ভিত করে তারপর বাঁশবাঁখারি টিন দিয়ে ঘর উঠবে। বড় খাটুনি। মেজকাকিমা তাকে যখন-তখন ডাকলে সে একটু বিরক্ত হয়ে বলে, বাবা-রে-বাবা, সবসময়ে তোমাদের কাজে মাথা দিলেই চলবে! আমার নিজের বুঝি কাজ নেই?
শুক্লপক্ষ
রাজা চলেছেন ভিখারির ছদ্মবেশে। ভিখারির চীরবাস পরনে, গায়ে মাখা ভুসোকালি, সর্বাঙ্গে ক্ষতচিহ্ন, একটি চোখ কানা, একটি পা খোঁড়া। তাঁর ছদ্মবেশে কোনও ত্রুটি নেই। হাতে ভিক্ষাপাত্র, শুধু তাঁর চীরবাসের অন্তরালে একটি গোপন কোমরবন্ধে লুক্কায়িত রয়েছে একটি চর্মপেটিকা। তাতে মহামূল্যবান মণিমাণিক্য, স্বর্ণখচিত রাজকীয় পাঞ্জা, এ সম্পদ যে লাভ করবে সে একদিনেই রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ধনীদের অন্যতম হয়ে যাবে।
প্রতি মাসের শুক্লপক্ষে রাজা ছদ্মবেশে বহির্গত হন। প্রতি শুক্লপক্ষে রাজ্যের একজন ভাগ্যবান রাজানুগ্রহে ধনিত্ব লাভ করে আর লাভ করে রাজার অজেয় শক্তিধর পাঞ্জা, যার প্রভাবে সে রাজ্যের সর্বত্র মাননীয়, গণনীয় হয়ে ওঠে। তার কর্মের কোনও দোষ ধরা হয় না। তার ক্ষমতা রাজার তুল্যই হয়ে ওঠে প্রায়। সামান্য পার্থক্য মাত্র। সবাই জানে, অপেক্ষা করে, কিন্তু সেই ভাগ্যবানদের পরিচয় কেউ পায় না।
.
নাগরিক এবং প্রজাকুলে নানা শ্রেণির ব্যক্তি রয়েছেন। পূজনীয় ব্রাহ্মণেরা, শ্রদ্ধেয় ক্ষত্রিয়, মহাভাগ বৈশ্যকুল, নমস্য শূদ্রেরা। রয়েছেন কৃষিজীবী, বণিক, করণিক, শিক্ষাদাতাগণ, সৈনিক, শান্তিরক্ষী, শ্রমজীবী, প্রণম্যা বারবনিতারাও। এঁরা যে-কেউ রাজানুগ্রহ লাভের অধিকারী, যেমন কোনও ভিখারি কাঙাল, তেমনি আবার হয়তো ধনীদেরই কেউ।
শুক্লপক্ষে প্রতি রাত্রে প্রতিটি গৃহের সম্মুখে একটি করে দীপ জ্বলে। মানুষেরা নিত্যকর্ম বা গৃহকর্মের মধ্যেও অন্যমনস্ক থাকে। রাজকীয় পদধ্বনির জন্য সজাগ থাকে তাদের শ্রবণ, প্রাতঃকালে সকলেই দুয়ার উন্মোচন করে সাগ্রহে দেখে, তাদের অলিন্দে সিঁড়িতে বা অন্য কোথাও রাজা তাঁর চর্মপেটিকা উপঢৌকন রেখে গেছেন কি না। শুক্লপক্ষে প্রত্যেকেই রাজার চিন্তা করে। রাজার জন্য অপেক্ষা করে।
*
শুক্লপক্ষ শুরু হয়েছে।
নগরের একপ্রান্তে একটি ক্ষুদ্র বিপণি, নানা জাতীয় খাদ্যশস্য, মশলা বিক্রি করে বিক্রেতা। লোকটি অসাধু, ওজন চুরি করে, মূল্য বেশি নেয়, কটু কণ্ঠে দরাদরি করে।
কিন্তু শুক্লপক্ষে তার অন্য চেহারা। সে জানে, রাজা হয়তো এই পথ দিয়ে যাবেন। তিনি বিনীত, ভদ্র, সাধু ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকেই পছন্দ করেন। রাজা পছন্দ করেন শুভ্র পরিধেয়, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশ, সংযত আচরণ। পছন্দ করেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, বংশগৌরবে গরীয়ান, বর্ণভিত্তিক বৃত্তি-আশ্রয়ী প্রজাকে। লোকটি তাই শুক্লপক্ষে ভিন্ন মানুষ হয়ে যায়।
প্রতিপদের সন্ধ্যায় এক আগন্তুক বিপণিতে প্রবেশ করল। লোকটি সসম্ভমে উঠে দাঁড়ায়। বহুবছর ধরে সে রাজার অপেক্ষা করছে। এই কি রাজা? রাজাকে সে দেখেনি। রাজা কোন বেশে আসবে তাও সে জানে না। তাই উগ্র সম্ভ্রমের সঙ্গে সে বলল,—আদেশ করুন ভদ্র, আপনার সন্তোষ ছাড়া আমার উদ্বৃত্ত কিছুই থাকবে না।
আগন্তুকের চেহারাটি রাজকীয় বটে। শালপ্রাংশু মহাভুজ, বৃষস্কন্ধ, তীক্ষ্ণ নাসা এবং তীব্র চোখ। ঈগল পক্ষীর একটা আভাস তার সর্বাঙ্গে। পরিধানে সূক্ষ্ম পশমি বস্ত্র, হাতে বলয় ও মূল্যবান অঙ্গুরীয়।
আগন্তুক ব্যবসায়ীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন—আমার কিছু শুষ্ক দ্রাক্ষা ও যবচূর্ণ প্রয়োজন।
বিক্রেতাটি দ্রব্য ওজন করে বিনীতভাবে পেটিকায় পূর্ণ করে দিল।
আগন্তুক দ্রব্যের পরিমাণ দেখে সবিস্ময়ে বললেন—কী আশ্চর্য! গতকাল আমার ভৃত্য এই বিপণি থেকে সমমূল্যের একই দ্রব্য নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা পরিমাণে এর দুই-তৃতীয়াংশ হবে।
আমি বিদেশি পর্যটক, এ-দেশের মূল্যমান জানি না।
বিক্রেতাটি নানাবিধ বিনয়ের শব্দ করে বলল—ভৃত্যরা সবসময়ে বিশ্বাসভাজন হয় না।
আগন্তুক চিন্তান্বিত মুখে বললেন—আমার ভৃত্যৃটি পুরাতন, এবং এতকাল বিশ্বাসভাজনই ছিল। এখন তার মতিভ্রম হয়ে থাকতে পারে।
এই বলে তিনি ব্যবসায়ীকে সাধুবাদ দিয়ে প্রস্থান করলেন। দ্রব্যপূর্ণ পেটিকাটি বহন করতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। ভৃত্যটি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, সুতরাং তাঁকে নিজে আসতে হয়েছে। বহনকার্যে তাঁর পটুত্ব কম।
রাস্তায় পদাপর্ণ করেই তাঁর কিছু স্মৃতিভ্রম হয়ে থাকবে। সম্মুখে অনেকগুলি পথ পরস্পরকে ভেদ করে গেছে। তিনি দিক নির্ণয় করতে পারছিলেন না। জনৈক পথিককে সবিনয়ে প্রশ্ন করলেন—আমি নগরের উত্তর ভাগে যাব, আমাকে সহজ পথটি দেখিয়ে দিন।
