নিশ্চয়ই।
তাহলে তোমাদের চাষবাস কোথায় হয়?
কেন কার্পেটটা তো ভীষণ উর্বর। খুব গভীরও। আমরা কার্পেটের ওপরেই চাষ করি।
বাঃ-বাঃ, আমেরিকা প্রযুক্তিবিদ্যায় তো বহুদূর এগিয়ে গেছে।
বহুদূর।
কার্পেটের তলায় কী আছে জানো?
না। আমরা জন্ম থেকেই কার্পেটটা দেখেছি। সম্ভবত কার্পেটটার তলায় আছে প্রিমিটিভ আমেরিকা। কিন্তু কথা অনেক হয়েছে। এবার এসো খানিকটা সেক্সের চর্চা করা যাক।
হবে-হবে। কিন্তু আমেরিকার বৈশিষ্ট্য কী তা বলতে পারো?
পারি। আমেরিকা মানেই হচ্ছে বিছানা। এত সুন্দর নকশাদার ও নরম বিছানা তুমি কোথাও পাবে না। সুখে বা দুঃখে তুমি কেবল বিছানায় ডুবে থাকতে পার। তুলল, ফোম, রবার এবং পালকের এমন বিচিত্র সমানুপাতিক সংমিশ্রণ আজও পৃথিবীর কোথাও কেউ ঘটাতে পারেনি। এসো, শুয়ে দ্যাখো।
আমি এক-পা পিছিয়ে গিয়ে বলি, হবে-হবে। আমার আরও কিছু জানার আছে।
মদির চোখে আমার দিকে চেয়ে মেয়েটি বলে, প্রাচ্যের ভীরু পুরুষ, কেন সংকোচ? কেন দ্বিধা? দেখ ওই যে উঁচু সটান সব স্কাইস্ক্র্যাপার এগুলো কীসের প্রতীক জানো?
না তো।
আমেরিকানরা সেক্সকে কত মর্যাদা দেয় তা বুঝতে পারবে যদি ভালো করে ওগুলো প্রত্যক্ষ করো। তোমাদের দেশের শিবলিঙ্গ যেমন সৃষ্টির প্রতীক, আমেরিকান স্কাইস্ক্র্যাপারও তেমনি এক প্রতীক। এদেশে লজ্জার স্থান নেই। এসো, এসো…
আমি আর্তনাদ করে বলি, দাঁড়াও। আমার কয়েকটা কথা জানবার আছে।
মেয়েটা হাই তুলে বলল , কিন্তু এখন আমার একটু গরম বিছানা দরকার। আমি বরং অন্য ঘরে যাই।
মেয়েটা চলে গেলে আমি লিফটে নীচে নেমে আসি। সামনেই একটা চমৎকার পার্ক। একটি নিরিবিলি বেঞ্চিতে ভবঘুরে চেহারার একজন লোক বসে ঢুলছে। টুপিটা চোখের ওপর নামানো।
আমি তার কানে-কানে বললাম, কার্পেটটা একটু তুলে দেখাতে পারো?
সে কিছুমাত্র নড়ল না। শুধু ডান হাতটা বাড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল , পাঁচ ডলার।
আমি পাঁচটা ডলার তার হাতে দিতেই বুড়ো লোকটা টুপি সরিয়ে আমার দিকে চাইল।
একটা শ্বাস ফেলে উঠতে-উঠতে বলল , এসো। পার্কের ওই কোণায় কার্পেটটা সবচেয়ে পাতলা।
খুব বেশি মেহনত করতে হল না। পার্কের নির্দিষ্ট কোণে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে লোকটা একটা পকেট–ছুরি বের করে কুচকুচ করে ঘাস–মাটির একটা অংশ কেটে চাড় দিয়ে কার্পেটটা তুলে ফেলল, বলল , যাও।
নীচে একটা গর্ভগৃহ। ভয়ের কিছু নেই। নামবার সিঁড়িও আছে। আমি নেমে গেলাম। এত বড় গর্ভগৃহ আমি জীবনে দেখিনি। এ-মুড়ো ও-মুড়ো দেখা যায় না। একটু ঝুঁঝকো অন্ধকার ভাব। টেবিল পাতা। এক-একটায় এক-একজন লোক বিমর্ষভাবে বসে আছে। শব্দহীন। শুধু একটা চাপা ‘হায় হায়’ ধ্বনি সেখানকার বদ্ধ বাতাসে ছড়িয়ে যাচ্ছিল। অনেকগুলো দীর্ঘশ্বাস যেন একযোগে বলছিল, একা, বড় একা।
খুব বেশি খুঁজতে হল না। একটা টেবিলে সোনি লিস্টন বসেছিল। মড়ার মতো ফ্যাকাশে মুখ। চোখের দৃষ্টি দীপ্তিহীন। সেই বিশাল শরীরটা কোনও ক্রমে টেবিলে ধরে নিজেকে সামলে রেখেছে।
মিস্টার লিস্টন, কিছু বলুন।
কী বলব? একা, বড় একা।
মৃত্যুর সময়টা আপনার কেমন লেগেছিল?
ওঃ বোলো না। বাড়িতে কেউ ছিল না। একা। বড় একা।
একা?
একদম একা।
কেন?
তা তো জানি না। স্ত্রী বাইরে কোথায় যেন গিয়েছিল কয়েকদিনের জন্য। ছেলেপুলেরা কাছে থাকত না। আমি ছিলাম। আর বাড়িটা আমাকে গ্রাস করতে আসছিল। বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। কত ডেকেছি, চেঁচিয়েছি। কেউ শুনতে পায়নি।
তারপর?
আমি ঢলে পড়ে গেলাম। মেঝেয়। দমের জন্য আঁকুপাঁকু করছিলাম আর মানুষের মুখ দেখতে চাইছিলাম।
আপনি খুব ভালো মুষ্ঠিযোদ্ধা ছিলেন। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। কত টাকা ছিল আপনার। কত গুণমুগ্ধ। তবু একা?
তবু একা, ওঃ বোলোনা।
তারপর কী হল?
একটা প্রেত হঠাৎ আমেরিকার বিখ্যাত কার্পেটটা তুলে আমাকে বলল , ঢুকে পড়ো, ঢুকে পড়ো। আমি ঢুকে পড়লাম। এইখানে।
আমি উঠে ধীরে-ধীরে খুঁজে-খুঁজে উইলিয়াম হোলডেনকেও পেয়ে যাই। এই সেই চিত্তচাঞ্চল্যকর চলচ্চিত্রাভিনেতা। বিশ্বাস হয় না।
হাড়গোড় বেরিয়ে পড়েছে। মুখের হনু দুটো উঁচু হয়ে আছে।
মিস্টার হোলডেন?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আমি শুধু জানতে চাই, মৃত্যুর সময় আপনি কেন একা ছিলেন?
আমিও পালটা প্রশ্ন করতে চাই, মৃত্যুর সময় অধিকাংশ আমেরিকানই কেন একা থাকে?
আমি বোকার মতো তাঁর দিকে চেয়ে আছি দেখে তিনি মৃদু একটু হেসে বললেন, প্রতিটি আমেরিকানই একা। সঙ্গী বা আত্মীয়হীন। আমেরিকানদের কেউ থাকে না কেন বলো তো?
আপনার কেউ ছিল না? অত টাকা! অত খ্যাতি! অত মেয়েছেলে!
হোলডেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন, তবু কেন উইলিয়াম হোলডেন একা মরে?
কেন তার মৃত্যুর পাঁচ দিন পর তার লাশ বাড়ি থেকে বের করে পুলিশ?
সেটাই আমার প্রশ্ন।
আমারও প্রশ্ন। এখন যাও, বিরক্ত কোরো না।
আমি আবার ওপরে ফিরে আসি।
আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে আবার ফোনে পেয়ে যাই আমি।
মাননীয় প্রেসিডেন্ট।
বলো ভারতীয় পর্যটক।
আমি এক জায়গায় কারপেটটা তুলে আমেরিকার ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলাম।
অভিনন্দন ভারতীয় পর্যটক। কী দেখলে?
অনেক কিছু। আমি জানতে চাই মাননীয় প্রেসিডেন্ট, কেন সোনি লিস্টন এবং উইলিয়াম হোলডেন ফাঁকা ঘরে মারা গিয়েছিল?
গিয়েছিল নাকি?
