বিধুকে দেখেই অহীনবাবু হাঁক দেন, বলি ও বিধু, বাজারে আবার দেখছি যে! কিছু ফেলে গেছ নাকি? আচ্ছা তুমি সবসময়ে এত কী ভাব বলো তো!
বিধু মাথা চুলকে বলেন, ভাবছি দুনিয়াটার হচ্ছেটা কী।
কেন দুনিয়াটার কী এমন হচ্ছে। এই তো আজও পূর্বদিকে সূর্য উঠেছে। মাছের দাম বেড়েছে। শীতকালে শীত বেড়েছে।
বিধুবাবু তবু মুখটা গোমড়া করে বলেন, তবু দুনিয়াটার একটা কিছু হচ্ছে।
অহীনবাবুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তা হবে।
গল্পগুজব করতে-করতে অহীনবাবু আর বিধুবাবু যখন ফেরেন তখন প্রায়ই রসো পাগলা। এসে অহীনবাবুর পথ আটকায়, এই যে বাবু, কিছু ভিক্ষে দিবেন?
রসো পাগলাকে দেখলে অহীনবাবু ভারী বিব্রত বোধ করতে থাকেন। বলেন, আঃ, যাও যাও, অন্যদিকে দ্যাখো।
রসো ছাড়ে না। পিছু–পিছু আসতে থাকে আর খিকখিক করে হাসে আর বলে, জীবনে একটা দিন দিয়ে দেখুন, মনটা কেমন ফুরফুরে লাগবে, গান গাইতে ইচ্ছে করবে, গিন্নিমা মুখ করবেন না।
আঃ যাও না হে, বলছি তো নেই।
রসো বিড় বিড় করতে থাকে, না দিলে আজ আপনার ডাল সেদ্ধ হবে না, মাছে নুন বেশি পড়ে যাবে, গলায় কাঁটা ফুটবে…
গোটা লামডিঙে রসো পাগলাই একমাত্র লোক যে চাঁদ দেখলেও খুশি হয়, অমাবস্যাঁতেও আনন্দে গান গেয়ে ঘুরে বেড়ায়। সে রোদেও খুশি বৃষ্টিতেও তার আহ্লাদ। শীত, গ্রীষ্ম সব। ঋতুতেই তার মন নাচে। সর্বদাই রসো খুশি বটে, কিন্তু খিদে পেলে ভারী রেগে যায়।
রসোর খিদে পায় সকালেই। ঘুম থেকে উঠেই সে যে-কোনও বাড়ির সামনের রাস্তায় পায়খানা করে সেই বাড়ির উদ্দেশ্যে তর্জন গর্জন করতে থাকে, সব তো বেরিয়ে গেল, এখন ভিতরটা ফাঁকা হয়ে গেছে না? নিজেরা তো দিব্যি সাঁটছ, রসোর কথা একটু ভাবতে হবে না?
লোকে রসোর নোংরামি দেখে চটে যায় বটে, কিন্তু তাদের অভ্যাসও হয়ে গেছে। খেতে দিলে অবশ্য রসো নিজেই নোংরাটা সাফ করে দেয়।
দুপুরে রসো খায় জৈনদের লঙ্গরখানায়। রাতে এঁটো–কাঁটা জুটে যায়। খাওয়ার সময়টুকু বাদ দিলে রসো ভারী আনন্দে আছে। রাত্রিবেলা সে গিয়ে নয়নসাধুর আখড়ায় পড়ে থাকে। আর ভূতেরা নাকি তার গা–হাত-পা টিপে দেয়।
বলাই বাহুল্য লামডিঙের মতো জায়গায় ভূত না থাকলে যেন মানায় না। বাস্তবিক লামডিঙে ভূতের এতই বাড়বাড়ন্ত এবং খ্যাতি ছিল যে, নানা জায়গা থেকে অনেক সাধু তান্ত্রিক আর ফকির ভূত ধরতে লামডিঙে চলে আসত। বিশেষ করে শীতে আর বর্ষায় নাকি ভুতেরা চারদিক গিজগিজ করে। করবেই। কারণ, বর্ষায় আর শীতেই বুড়ো আর থুথুড়েরা খুব মরে। তাই তো ভূত হয়ে চারদিকে ঘোরে।
বেশি নয়, নয়নসাধু মোট পাঁচটা ভূত ধরেছিল। তার মধ্যে একটা হল খাঁটি মেম সাহেব। নয়নসাধু কথাটা খুব বড়াই করে বলেও বেড়ায়, আমার পাঁচজনের মধ্যে একটা মেম বুঝলি? মাটির তলা থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসে আর একটা কবরের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে কাকে যেন খুব আদর করছিল। আমি গিয়ে খপ করে চুলের কুঁটি চেপে ধরে বললাম, কী রে মেম, এখানে কী হচ্ছে? অমনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে বলল , সাধুবাবা, আমি আমার ছেলেকে আদর করছি। মাত্র তিন বছর বয়সে মরে গিয়েছিল কলেরায়–তা মেমটার জন্য দুঃখ হল। ছেলের আত্মা তো স্বর্গে চলে গেছে। নিষ্পাপ শিশু, তার আত্মা তো আর পাপের দুনিয়ায় পড়ে থাকবে না। সেই থেকে মেমটাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে রেখেছি পুষে।
মেমভূতটাকে নয়নসাধু ধরলেও মল্লিকবাবুদের বাড়ির ঘড়িরামকে সে ধরতে পারেনি। ঘড়িরামকে ধরা অত সহজও ছিল না। ঘড়িরাম যখন জীবিত ছিল তখন একটাই নেশা ছিল তার। ঘড়ির নেশা। খুবই গরিব ছিল বলে ঘড়িরামের পক্ষে ঘড়ি কেনা ছিল দুঃসাধ্য। সে কুলির কাজ করত রেল স্টেশনে। কী করে এবং কেনই বা যে তার ঘড়ির শখ হল বলা মুশকিল তবে ছোট্ট একটা কাঁচে ঢাকা বাক্সর মধ্যে তিনটে কাঁটা ঘুরছে এ দৃশ্য দেখলে সে মুগ্ধ হয়ে যেত। শোনা যায়, ঘড়িরাম বিস্তর মেহনত করে না খেয়ে পয়সা জমিয়ে বহুদিনের চেষ্টায় সস্তায় একটা ঘড়ি। কিনেছিল এক জুয়াড়ির কাছ থেকে। কিন্তু যেদিন ঘড়িটা সে কেনে তার পরদিনই পুলিশ এসে তাকে চুরির দায়ে ধরে নিয়ে যায়। ঘড়িরামকে জেল খাটতে হয়েছিল ক’মাস। জেল থেকে বেরিয়ে এসেই ঘড়িরাম অন্য মূর্তি ধরল। বিনা দোষে জেল খাটার শোধ তুলতে সে এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল যে, লামডিংকে প্রায় ঘড়িশূন্য করে দিয়েছিল সে। ছোরা নিয়ে সন্ধের পর সে বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করত এবং যে যেত তারই হাতের ঘড়ি কেড়ে নিত। মোট তিন হাজার সাতশো সাতষট্টিটা ঘড়ি সে সংগ্রহ করে মল্লিকবাবুদের পরিত্যক্ত বাড়ির মাটির নিচে জমিয়ে রেখেছিল। অবশেষে পুলিশ তার সন্ধান পেল এবং বাড়ি ঘিরে ফেলল। ঘড়িরাম পালানোর চেষ্টা করল না, আত্মসমর্পণও করেনি। সে ছোরা হাতে পুলিশকে তেড়ে এল মারতে। ফলে পুলিশের গুলিতে সে মরে গেল। কিন্তু আশ্চর্য এই যে মরে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই ঘড়িরামের শরীর থেকে একটা বায়ুভূত ঘড়িরাম বেরিয়ে এসে পুলিশকে তাড়া করল। দ্বিতীয় ঘড়িরামের তাড়া খেয়ে পুলিশ পালাতে পথ পেল না। সেই থেকে মল্লিকবাবুদের বাড়ির ধারেকাছে কেউ ঘেঁষে না। কিন্তু আশপাশ দিয়ে দিনের বেলা যারা যায় তারা তিন হাজার সাতশো সাতষট্টিটা ঘড়ির সমবেত টিকটিক আওয়াজ শুনতে পায়।
