টিকটিক শব্দটা অবশ্য লামডিঙে নতুন কিছু নয়। বরং এ শব্দ লামডিঙের একটি অতি পরিচিত শব্দই বলা যায়। ছোট্ট একধরনের টিনের খেলনা আছে যা হাতের তলায় লুকিয়ে নিয়ে চলা যায়, টিনের একটু পাত আছে সেটাতে আঙুলের চাপে টিকটিক করে শব্দ করে।
ফুলু নামে একটা মেয়ে রোজ তার বাড়ির জানালা দিয়ে নন্টু নামে একটা ছেলেকে দেখতে পেত। নন্টু বেশ ভালো ছেলে, কোনওদিকে তাকায় না, ক্লাসে ফার্স্ট হয়, প্রাইজ পায়। দেখতেও সুন্দর। কিন্তু ফুলুর খুব ইচ্ছে নন্টু একটু তার দিকে তাকাক। ফুলুও দেখতে খুব সুন্দর, কিন্তু পোলিও রোগে তার দুটো পা এমনভাবে কুঁকড়ে গিয়েছিল যে, দোতলা থেকে সে নামতেই পারত না। ফুলুই একদিন ফেরিওয়ালার হাতে ওই খেলনার শব্দ শুনে একটা কিনে নেয়। নন্টু যেই যেত অমনি বাজাত। নন্টুও দোতলার দিকে তাকাত। চোখাচোখি হত দুজনে। ফুলুও হাসত, নন্টুও হাসত। ফুলু হাসত আনন্দে উত্তেজনায়, নন্টু হাসত করুণায়।
কিছুদিন পরেই নন্টু পাশ করে বড় শহরে পড়তে চলে গেল এবং ফুলু খেলনাটা অবহেলায় ফেলে রাখল বিছানার পাশে টেবিলে। সেখান থেকে সেটা একদিন নিয়ে নিল তার ছোট ভাই টুলু।
টুলু খেলনাটা বাজিয়ে তার ঘুমন্ত মাকে চমকে দিত। কুকুর বেড়ালকে ভয় দেখাত। তারপর সে একদিন সেটার প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে ফেলল। টুলু ও ফুলুর বাবা ও মার মধ্যে একদিন বেশ ঝগড়া হল। কথা বন্ধ হয়ে গেল কিন্তু টুলুর বাবার চা চাই, জল চাই, সময় মতো ভাত চাই। অথচ কথা বন্ধ। ওদিকে টুলুর মার হয়তো দোকান থেকে কিছু আনাতে হবে বা অসময়ে টাকার দরকার পড়েছে। টুলুর বাবা হঠাৎ হাতের কাছে টিকটিক খেলনাটা পেয়ে সেটা বাজালেন এবং তাঁর বউও সংকেত বুঝে চা বা জল দিয়ে গেলেন। খেলনাওলা আবার আসায় টুলুর মাও ওরকম একটা খেলনা কিনে কাছে রাখলেন। দুজনের মধ্যে প্রায়ই ভাব ঝগড়া এবং আবার ভাব হয়। কিন্তু ঝগড়া হলেই দুজনে ওই যন্ত্রের সাহায্যে পরস্পরকে সংকেতবাক্য পাঠাতে থাকেন।
দেখাদেখি আরও স্বামী স্ত্রীরাও অনুরূপ খেলনা কিনে ফেললেন। খেলনাটার নাম দেওয়া হলো কটকটি।
তারপর থেকে লামডিঙে টিকটিক শব্দের আর কোনও অভাব রইল না। সর্বত্র এবং প্রায় সর্বদাই টিকটিক শোনা যেতে লাগল।
এই শব্দই একদিন ব্রজেশ্বরকে তাঁর ঘরের বাইরে টেনে আনল।
ব্রজেশ্বর বসু যে লামডিঙে থাকেন এটা অনেকের জানা ছিল বটে, কিন্তু মানুষটা গত বিশ বছর তাঁর ঘর থেকে বেরোননি। বাজার–হাট দোকানপাট কোথাও তাঁকে কখনও দেখা যায় না। তাঁর বাজার হাট করেন প্রৌঢ়া স্ত্রী। ব্রজেশ্বর তাঁর ঘরে বসে গত বিশ বছর যাবৎ একটানা সৃষ্টিতত্ব বিষয়ে একটা গুরুতর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে কেউ কেউ শুনেছে। তবে মানুষটাকে কেউ চোখে না দেখতে পাওয়ায় মোটামুটি তাঁর কথা সবাই ভুলে গিয়েছিল।
সেদিন রাতে চোর মগন এসে পায়রার জানলার কাছে দাঁড়িয়ে কটকটি বাজিয়ে তাকে সংকেতে ডাকছিল। চুরি করতে বেরোনোর আগে পায়রার সঙ্গে রোজই সে দেখা করে যায়। গগনবাবুর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর ঝগড়া চলছে কিছুদিন। গগনবাবু কটকটি বাজিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে ভাত চাইছিলেন। কালীবাবুর বাড়িতে বেড়ালে দুধে মুখ দিয়েছে বলে তাঁর ছেলে বাবু আনন্দে কটকটি বাজাচ্ছিল। আজ রাতে তাকে আর দুধ খেতে হবে না।
কাছাকাছি এতগুলো কটকটি একসঙ্গে বেজে ওঠায় ব্রজেশ্বর দীর্ঘ বিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম সচকিত হলেন। তাঁর মনে হল, একটা কোনও বিপর্যয় আসন্ন। তিনি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এলেন। বেরিয়ে এসে তিনি দেখলেন, পৃথিবীটা বিশ বছরে অনেক পালটে গেছে। যেখানে গাছ। ছিল সেখানে বাড়ি উঠেছে, যেখানে মাঠ ছিল সেখানে রাস্তা হয়েছে। সেদিন খুব ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল। ব্রজেশ্বর মুগ্ধ হয়ে চারিদিকটার দৃশ্য দেখতে লাগলেন এবং ঘুরে বেড়াতে লাগলেন।
তাঁদে দেখে পায়রা ‘ভূত-ভূত’ বলে চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল এবং মগন ‘রাম-রাম’ বলতে বলতে প্রাণভয়ে ছুটে পালাল। মগনের কটকটি যন্ত্রটা পড়ে গিয়েছিল, ব্রজেশ্বর সেটা কুড়িয়ে পেলেন এবং বাজিয়ে দেখলেন। গত বিশ বছর তিনি ঘরের বাইরে আসেননি। তাই তিনি জানেন না, মানুষ এই ক’বছরে কী কী আবিষ্কার করেছে। তিনি দেখে খুবই বিরক্ত হলেন যে, মানুষ এই বিশ্রী যন্ত্রটা আবিষ্কার করেছে। কটকটিটা হাতে নিয়ে তিনি আনমনে হাঁটতে লাগলেন।
সামনেই একটা ভাঙা বাড়ি এবং পরিত্যক্ত বাগান। বাগানের ধারে তিনি এক যুবক এবং একটি যুব তাঁকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলেন। যুবক এবং যুবতীরা জ্যোৎস্না রাতের নির্জনতায় দাঁড়িয়ে কী করতে পারে তা ব্রজেশ্বর চিন্তা করলেন না। তিনি সোজা গিয়ে তাদের সামনে হাজির হয়ে কটকটিটা বাজিয়ে ক্রুদ্ধস্বরে বলতে লাগলেন, মানুষ গত বিশ বছরে এইসব আবিষ্কার করে দুনিয়াটাকে উচ্ছন্নে দিচ্ছে আর তোমরা এখানে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে ফিসফাস করছ?
যুবতীটি জলভরা চোখে যখন ব্রজেশ্বরের দিকে ফিরে চাইল তখন ব্রজেশ্বর অবাক হয়ে দেখলেন মেয়েটি মেমসাহেব। মেয়েটি কুঁপিয়ে–ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ছেলেটা ব্রজেশ্বরের দিকে কটমট করে চেয়ে বলল , আমরা দুঃখের কথা বলছিলাম আর আপনি এসে সব ভণ্ডুল করে দিলেন। মানুষ কী করেছে তা আমরা জানি না। জানতে হলে মানুষদের কাছে যান। আমরা মানুষ নই।
