কালীবাবু কথাটার যুক্তিযুক্ততা মেনেই বোধহয় আমতা-আমতা করে বললেন, মগনের উচিত চুরিটা আরও ভালো করে শেখা। নইলে প্রায়ই ব্যাটা ধরা পড়ে মাঝরাতে আরামের ঘুমটার দফা রফা হয়ে যায়। এ মোটেই ভালো কথা নয়।
গগনবাবু দুঃখ করে বললেন, কে শেখাবে বলুন? সেরকম গুরু কি আর আছে? আমরা ছেলেবেলায় দেখেছি করিম–চোর সামন্ত দারোগার কোমরের বেল্টখানা বাজি রেখে দিনে দুপুরে চুরি করল।
কালীবাবু গম্ভীর গলায় বললেন, দুপুরে দারোগারা খুব ঘুমোয় আর ঘুমোনোর সময় বেল্ট খুলে রাখে। এটা খুব খারাপ অভ্যাস।
গগনবাবু মাথা নেড়ে বললেন, মোটেই নয়। কোমরে পরা অবস্থায় খুলে নিয়ে করিম বাজিকে। বাজি জিতল তার ওপর সামন্ত দারোগা। পাঁচ টাকা দিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন, জীবনে এরকম চোর আর দেখিনি। তুই ডাকাত হ।
পরদিনই সকালবেলা মগন বাজারে গিয়ে গোপেশ জাদুকরকে ধরল। গোপেশদা, দু-চারটে হাতসা ফাঁই এবারে শিখিয়ে দিন। নইলে ইজ্জত থাকছে না।
গোপেশ যাদুকর লোকটা মজার মানুষ। সময়ে এবং সর্বত্রই সে হাতসা ফাঁই দেখায়। ম্যাজিক ছাড়া সে একদম থাকতে পারে না। বাজার করার সময়েও সে কত সময়ে মাছ, ফুলকপি, আলু বা দোকানে ঢুকে বিস্কুটের প্যাকেট, ক্রিমের শিশি সকলের চোখের সামনেই হাওয়া করে দেয়। তবে মগনের সঙ্গে তার তফাত হচ্ছে, সে আবার জিনিসগুলো ফিরিয়ে দেয়। সে তো চোর নয়।
রোজকার মতোই সে মগনকে বোঝাতে লাগল, চোর যদি জাদুকর হয় বা যাদুকর যদি হয় চোর তাহলে সমাজের ঘোর বিপদ। চুরি করা যদি ছেড়ে দিস তবে শেখাতে পারি।
মগন মাথা চুলকে বলে, আচ্ছা ভেবে দেখি।
আসলে মগনের বিপদ হয়েছে পায়রাকে নিয়ে। পায়রা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে তার খুব ভাব। কিন্তু পায়রার বাপ পাঁচশো টাকা পণ চেয়ে বসেছে। সেটা জোগাড় না হলে বিয়ে হওয়ার নয়। পায়রা রোজ খোঁটা দিচ্ছে, হিঃ খুব জানা আছে, কেমন মুরোদের চোর।
মগনকে বিদায় করে গোপেশ নানা মজার কাণ্ড করতে-করতে বাজার সারে। শৈবালবাবু অতি সতর্ক লোক। তার জামার ভিতরে গুপ্ত পকেট, তাতে টাকা রেখে সেফটিফিন দিয়ে আটকে তবে বাজারে আসেন এবং সারাক্ষণ পকেটে হাত চেপে থাকেন। সেই শৈবালবাবু আজ শীতের প্রথম ফুলকপি কিনে দাম দিতে গিয়ে থ’। পকেটে টাকা নেই।
গোপেশ পাশেই দাঁড়িয়ে পালং শাক কিনছিল। একটু হেসে বলল , আরে তাতে কী! আমি কিছু ধার দিচ্ছি কপিটা কিনেই বাড়ি যান।
শৈবালবাবু হেঁ-হেঁ করে কিছুক্ষণ জামার পকেটটা চুলকোলেন। তারপর গোপেশকে বললেন, ইয়ে বুঝলে কথাটা পাঁচ কান কোরো না। ষষ্ঠীপদর সঙ্গে একটা বাজি ধরেছিলুম, যদি কেউ আমার পকেট কখনও মারতে পারে তাহলে পাঁচশো টাকা হারব। যা টাকা গেছে যাক, বাজিটা না হারি।
গোপেশ গম্ভীর হয়ে বলল , তাই বা কেন, টাকাটা তো মনে হয় বেশি দূর যায়ওনি। ওই তো ব্রিজলাল বেগুনওলার কাঁধের গামছাটায় কী যেন একটা বাঁধা আছে, দেখুন তো।
বলাই বাহুল্য ব্রিজলালের গামছায় বাঁধা অবস্থায় শৈবালবাবুর টাকা পাওয়া গেল এবং ব্রিজলাল খুবই অপ্রতিভ হাসি হেসে বলল , গোপেশবাবু, আপনি তো আমাকে জেল খাঁটিয়ে মারবেন।
বাজার টাজার সেরে গোপেশ যখন ফেরে তখন মোড়ের মাথায় গোলবাড়ির বারান্দায় বসে থাকা অহীনবাবু তাঁকে ধরবেনই, ও গোপেশ, আরে এসো–এসো এদিকে একটু, মাছটা কী কিনলে একটু দেখিয়ে যাও।
বুড়ো মানুষ বলে গোপেশ বা আর কেউই তাঁকে এড়াতে পারে না। অহীনবাবু বেশ ভোরে উঠে একটু মর্নিংওয়াক সেরে এসেই বারান্দায় দক্ষিণ কোণটায় মোড়া পেতে বসে থাকেন। অহীনবাবুর এই কোণটায় বসবার একটা কারণ হল, ওদিকটায় বড়লোক আশুতোষ ঘোষের বাড়ির রান্নাঘর। সকাল থেকেই রান্নাঘরের নানারকম ভালো ভালো গন্ধ আসতে শুরু করে। রুটি সেঁকার গন্ধ, ডিম ভাজার গন্ধ, মাংসের গন্ধ, মাছের কালিয়া বা পোলাওয়ের গন্ধ। অহীনবাবু নিজের পয়সায় ভালো জিনিস কখনওই খান না। কিন্তু গন্ধের নেশায় তাঁর অর্ধেক খাওয়া হয়ে যায়। তাঁর আর এক নেশা হল, কে কী কিনে আনছে বাজার থেকে তা দেখা।
বসে বসেই হাঁক মারেন, ওহে ও শিকদার, বলি সব ভালো তো? তা মাছটা মনে হয় আজ জব্বর কিনেছ! মুখখানা তোমার বেশ হাসিহাসি দেখছি যেন। দেখি–দেখি, আমরাও একটু হাসি।…বাঃ বাঃ এ যে সরল পুঁটি গো, ভারী তেলালো মাছ, একটু সর্ষেবাটা আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে রাঁধতে বোলো বউমাকে। এক্কেবারে চাকুম চাকুম লেগে যাবে’খন।…আরে মুখুজ্জেমশাই নাকি? প্রাতঃপেন্নাম। আজও কি কাটাপোনা নাকি? থলেটা একটু ফাঁক করুন দাদা, আপনার কাটাপোনাকে একটা গুডমর্নিং জানিয়ে দিই। ব্রাহ্মণের ভোগে লাগবে, ব্যাটার কপালটা ভালোই।…আরে আরে কে ও? কালী না? বলি পালাচ্ছ কোথায়, তোমার মাছ না দেখে কি ছাড়ব? …ও বা–বা এ যে দেখছি ফুলকপি আর কই মাছ। আজ তো একেবারে খুনখারাপি করে ফেলেছ হে…সবাই চলেটলে গেলে অহীন ধীরে সুস্থে বাজারে বেরোন। বেশি বেলায় বাজারে তেমন কিছু থাকে না। ঝড়তি পড়তি যা পান সস্তায় কেনেন। কপি পাতাটাতা অনেক সময় দোকানিরা ফেলে দেয়। অহীনবাবু সকলের অলক্ষ্যে তাও কয়েকটি কুড়িয়ে নেন।
এই সময়ে বাজারে অহীনবাবুর সঙ্গে প্রায় দিনই বিধুবাবুর দেখা হয়ে যায়। বিধুবাবু লোকটার ভারী ভুলো মন। সকালবেলায় বাজারে তিনি প্রায়দিনই কিছু না কিছু হারিয়ে যান। হয় পয়সা, না হয় চশমা, কিংবা ঘড়ি, অথবা পকেটের পেন, কখনও পায়ের এক পাটি চটি, কোনওদিন রুমাল, কিংবা মাছের থলে। সেটা আবার খুঁজে দেখতে তাকে বাজারে ফিরতে হয়।
