আর একজন প্রজা এসে পূর্ববৎ অভিবাদন করে আসন গ্রহণ করলেন এবং বললেন–মহারাজ, আপনার শাসনবিধির তুলনা নেই। খাদ্য, পানীয়, বসতগৃহ, চিকিৎসা, যানবাহন ইত্যাদির জন্য আমাদের কোনও ব্যয় নেই। এ রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত আমি যে কোনও যানে ভ্রমণ করতে পারি, যে কোনও চিকিৎসককে ডেকে চিকিৎসা করাতে পারি। তার জন্য আমাকে কিছুই ব্যয় করতে হবে না। মহারাজ, আমার পিতামহের দানশীলতার খ্যাতি ছিল কিন্তু তিনি যদি আপনার রাজ্যে বাস করার অভিজ্ঞতা লাভ করতেন তবে অবশ্যই খ্যাতিলাপের ভয়ে রাজ্য ছেড়ে পালাতেন। কারণ, তাঁর দান গ্রহণ করার মতো একজনও দুঃখী বা অভাবী লোক এখানে নেই। মহারাজ, আমরা এখন আর মানুষের দয়াধর্মকে মহৎ গুণ বলে অভিহিত করি না, কারণ দয়াগ্রহণ মনুষ্যত্বের অবমাননাস্বরূপ। মহারাজ, আমরা আমাদের যৌথ দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে সজাগ। কাজেই রাজকীয় শাসনও দয়াধর্মের মতোই অপ্রচলিত হয়ে গেছে।
পরবর্তী প্রজা এক মধ্যবয়স্ক চিত্রকর। তিনি বললেন–মহারাজ, আমার পিতা ছিলেন যোদ্ধা। তিনি এক সময়ে এ রাজ্যের হয়ে বিভিন্ন রাজ্যের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করেছেন। তিনি মহাবীর খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর গায়ে নানা অস্ত্রাঘাতের চিহ্ন ছিল। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ওই চিহ্নগুলিকে তিনি পদকের মতো ভালোবাসতেন। এই যুদ্ধপ্রিয় লোকটি নরহত্যার অপ্রয়োজনীয়তাকে কখনও বুঝতে চাইতেন না। যুদ্ধ না থাকলে মানুষ হীন ও নির্বীর্য হয়ে যাবে বলে তাঁর বিশ্বাস ছিল। ছেলেবেলায় তাই আমি যুদ্ধবাজ মনোভাবাপন্ন ছিলাম। আমি প্রথমে ফড়িং, পাখি, তারপর কুকুর, বেড়াল, বাঁদর এইসব হত্যা করতে শুরু করি। বাবার মতো হওয়ার জন্য শীঘ্রই আমি কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী বালককে দ্বন্দ্বযুদ্ধে হত্যা করব এরকম অভিলাষও আমার ছিল। ঠিক সেই সময়েই আমি আপনার বিপ্লবে অংশীদার হই যুদ্ধের আশায়। এবং কালক্রমে আপনার আদর্শকে বুঝতে পারি, এবং আমার হৃদয় শান্ত হয়, যুদ্ধস্পৃহা জ্বরের মতো সেরে যায়। নিরীহ পশুপাখি হত্যা করে যে পাপ আমি করেছিলাম এখন তার …গোলন করি এই হাতে তাদেরই ছবি এঁকে। মহারাজ, এ সমাজব্যবস্থায় হয়তো যুদ্ধের এবং বীরত্বের প্রয়োজন ছিল, এখন তা ফুরিয়েছে মহারাজ, হয়তো সেরকম রাষ্ট্রযন্ত্রেরও প্রয়োজন ফুরিয়েছে। আপনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমরা এতটাই আত্মবিশ্বাসী যে ঈশ্বরও আমাদের কাছে কিংবদন্তি মাত্র।
সংক্রান্তির দিন সকালে রাজা স্নান করলেন। পুরোহিতকে বললেন–কেউ যখন রাজা হয় তখন তার অভিষেকের ব্যবস্থা আছে, কিন্তু রাজা যদি যে কেউ একজন হতে চায় তখন কি তার কোনও অভিষেক আছে?
পুরোহিত মাথা নাড়লেন–না, মহারাজ।
প্রাকারের পাশে সুসজ্জিত বেদিতে সাজানো সিংহাসন। রাজা সেখানে এসে বসলেন। হাতে তুলে নিলেন রাজদণ্ড, মাথায় পরলেন মুকুট। শেষবারের মতো। সামনের আম্রকাননে হাজার হাজার কৌতূহলী প্রজা সমবেত। এক পাশে শূন্য একটু জমিতে চাষার পোশাক এবং বলদযুক্ত একখানা হাল রয়েছে। রাজা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসন, মুকুট ও দণ্ড ত্যাগ করে হলকর্ষণ করবেন। রাজাকে আজ বেশ আনন্দিত ও তৃপ্ত দেখাচ্ছিল।
রাজা আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়ালেন। চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি গম্ভীর গলায় গতকাল রাত্রে যাদের সঙ্গে কথা হয়েছিল তাদের সাক্ষ্যপ্রমাণ উল্লেখ করে বললেন যে, তাঁর শাসনের প্রয়োজন সত্যিই ফুরিয়েছে। এবার সমাজ হবে রাষ্ট্রহীন। মনুষ্যত্বই হবে প্রকৃত শাসক।
রাজা মুকুট খুললেন, রাজপোশাক উন্মোচন করলেন, সিংহাসন ত্যাগ করে সিঁড়ি দিয়ে ধীর পদক্ষেপে নামতে লাগলেন।
নিস্তব্ধতার মধ্যে হঠাৎ কে যেন চেঁচিয়ে বলে উঠল–মহারাজ, কাল রাত্রিতে আমার ঘরে চোর ঢুকেছিল…
সবাই চকিত হয়ে চারপাশে তাকাতে লাগল। সেনাপতি কোমরবন্ধ তলোয়ারসুষ্ঠু খুলে রাখতে যাচ্ছিলেন। এই কথা শুনে কোমরবন্ধ আবার আঁটলেন। কারাধ্যক্ষ চকিত হয়ে হাতে ধরা ইস্তফাপত্রটি লুকিয়ে ফেললেন।
আর একটি কণ্ঠ চেঁচিয়ে বলল –মহারাজ, আজকের অনুষ্ঠানে সমুখবর্তী এই আসনটি পাওয়ার জন্য আমাকে বিশ মুদ্রা উৎকোচ দিতে হয়েছে…
আর একটি কণ্ঠও আর্তনাদ করল–মহারাজ, কিন্তু তার অভিযোগ গোলমালে, পালটা চিৎকারে শোনা গেল না। বহু কণ্ঠের আর্তনাদ উঠতে লাগল মহারাজ, মহারাজ, মহারাজ…
মাঝর্সিড়িতে থেমে দাঁড়ালেন রাজা। বিস্মিত, ব্যথিত। কুটি করলেন। তারপর হতাশ ক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন সামনের উদ্বেলিত জনসাধারণের দিকে।
তারপর ধীর ক্লান্ত পায়ে আবার সিঁড়ি বেয়ে উঠে যেতে লাগলেন পরিত্যক্ত সিংহাসনের দিকে।
লামডিঙের আশ্চর্য লোকেরা
লামডিঙে খুবই অদ্ভুত–অদ্ভুত ধরনের ঘটনা ঘটত। এই ছোট্ট শহরে কৃপণ, লোভী, রাগি, চোর, সাধু, ম্যাজিসিয়ান, ডাকাত, সাহসী, ভীতু নানারকমেরই লোক ছিল। সকলেই সকলকে চিনত।
মগন ছিল চোর এবং খুব একটা উঁচু দরের চোরও নয়। প্রায়ই চুরি করতে কারও বাড়ি ঢুকে ধরা পড়ে যেত। সত্যসিন্ধুবাবুর বউ একদিন তাকে রান্নাঘরে ধরে ফেললেন। চুরি করার আগে মগন জালের মিটসেফ থেকে মাছের ঝোল আর ভাত বের করে খাচ্ছিল আপন মনে। খেয়েদেয়ে বাসনপত্র নিয়ে সটকাবার মতলব। ধরা পড়ে যাওয়ায় খুব বিগলিত মুখে বলল , চারটি খাচ্ছি মাসিমা। গরিবের তো এই একটাই দোষ, বড্ড খিদে পায়। সত্যসিন্ধুবাবুর বউ তাতে গললেন না, চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করলেন। লোক জড়ো হয়ে মগনকে নাকে খৎ দেওয়ালো। এতে প্রতিবেশী গগনবাবু একটু অসন্তুষ্ট হয়ে রীতিমতো উঁচু গলায় কালীবাবুকে বললেন মশায় মগনটা একেবারে কাঁচা চোর বটে, কিন্তু চোর তো? এ তল্লাটে ওই মোটে একটাই চোর, তা ও যদি চুরি ছেড়েই দেয় তবে গেরস্তকে সজাগ রাখার আর তো উপায়ই রইল না। চোর ছ্যাঁচড় থাকলে মানুষ সাবধান হতে শেখে, নষ্টচন্দ্রার দিন যে চুরির প্রথা আছে তাও হল ওই জিনিসই। আমি বলি কি, মগন যদি চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েই তবে আমাদের উচিত তাকে হাসিমুখে ক্ষমা করা। মগন। আমাদের একটা মৌলিক শিক্ষা তো দেয়। সতর্কতার শিক্ষা।
