একশো আশি তলা উঁচু একটা হোটেলের একশো সত্তর তলার একটা ঘরে ঢুকে আমি দেখলাম, একটা লোক একটা হেলিকপটারে বসে বাইরে থেকে আমার ঘরের জানালার শার্শি ভাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে পরিষ্কার করছে! ঘরের মধ্যেও চমৎকার ব্যবস্থা। রঙিন টিভি, ফ্রিজ, রাজকীয় বিছানা ও সুন্দরী রমণী সবই প্রস্তুত! ব্যবহারের অপেক্ষা মাত্র।
টেলিফোন তুলে আমি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম।
একটু বাদেই টেলিফোনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের গমগমে এবং আহ্লাদিত গলা পাওয়া গেল, বলো বন্ধু, বলো!
আমি এক ভারতীয় পর্যটক, মাননীয় প্রেসিডেন্ট। ভারতীয়! ভারতীয়! প্রেসিডেন্ট একটু স্মরণ করতে সময় নিলেন। তারপর উচ্চকিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ওঃ! ভারত! হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি জানি। ভারত হল পৃথিবীর দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তম গণতন্ত্র। সেখানে তাজমহল আছে। তাই না?
আজ্ঞে হ্যাঁ, মাননীয় প্রেসিডেন্ট। স্বাগতম ভারতীয় পর্যটক। আমাদের দেশ সর্বদাই ভারতীয় পর্যটকদের শ্রদ্ধার চোখে দেখে। প্রকৃতপক্ষে আমরা সব দেশের লোককেই শ্রদ্ধার চোখে দেখে থাকি, যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত শ্রদ্ধার যোগ্য নয়।
আমেরিকা অতীব মহান দেশ মাননীয় প্রেসিডেন্ট।
ধন্যবাদ ভারতীয় পর্যটক, তোমার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?
মাননীয় প্রেসিডেন্ট। এই হোটেলের ঘরে রঙিন টিভি থেকে সুন্দরী রমণী সবই আছে।
চমৎকার। তুমি নিশ্চয়ই ওসব জিনিসের ব্যবহার জানো। আমি তো শুনেছি, ভারতে ট্রেন চলে এবং কোথাও-কোথাও এরোপ্লেনও নামাওঠা করে। দিল্লিতে টেলিফোনও আছে আমি জানি। ভারত যে গত কয়েক বছরে দুর্দান্ত অগ্রগতি করেছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
ধন্যবাদ মাননীয় প্রেসিডেন্ট। আমি শুনেছি গোটা আমেরিকাই কারপেটে মোড়া। মাননীয় প্রেসিডেন্ট, এরকম মহান কীর্তি আর কোনও দেশের নেই।
ধন্যবাদ, ভারতীয় পর্যটক। আমরা যথাসাধ্য দেশটাকে সুন্দর করার চেষ্টা করছি মাত্র। তোমার ভালো লাগলেই খুশি হব।
মাননীয় প্রেসিডেন্ট, আমি শুধু পর্যটন করতেই আসিনি। আমি দুজন মৃত আমেরিকান নাগরিক সম্পর্কে খোঁজ–খবরও করতে এসেছি। একজন সোনি লিস্টন, আর একজন উইলিয়াম হোলডেন।
তারা কারা?
দুজনেই বিশ্ববিখ্যাত লোক।
প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গেই বললেন, অধিকাংশ আমেরিকান নাগরিকই বিশ্ববিখ্যাত মানুষ। তাদের সকলকে মনে রাখা মুশকিল। তবে তুমি যে-কোনও জীবিত বা মৃত আমেরিকান সম্পর্কেই খোঁজ–খবর নিতে পার। কোনও বাধা নেই।
ধন্যবাদ মাননীয় প্রেসিডেন্ট।
তোমার সফর আনন্দময় হোক ভারতীয় পর্যটক।
টেলিফোন রেখে আমি জানালার কাছে যাই। হেলিকপ্টারে বসা লোকটা অখণ্ড মনোযোগে শার্সি পরিষ্কার করে যাচ্ছে। ঠোঁট থেকে ঝুলছে আধপোড়া সিগারেট।
আমি জানালার একটা শার্সি ফাঁক করে বললাম, শুভ সন্ধ্যা।
শুভ সন্ধ্যা।
আমি একজন ভারতীয় পর্যটক।
ইন্ডিয়ান? ইন্ডিয়ানদের তো আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি।
আমি রেড ইন্ডিয়ান নই।
খুব ভালো। রেড ইন্ডিয়ান হওয়াটা কাজের কথা নয়।
তোমার দেশ খুব ভালো লাগছে।
লাগারই কথা। আমিও শুনেছি আমেরিকা খুব ভালো দেশ।
এই দেশটার বৈশিষ্ট্য কী বলতে পারো?
পারি। এখানে মেলা কাঁচের শার্সি। এত শার্সি তুমি অন্য কোনও দেশে পাবে না। আমি দিনে প্রায় দু-তিন হাজার শার্সি পরিষ্কার করি।
তাহলে তোমার রোজগার ভালোই?
কী যে বলো। এদেশে এখন মিলিওনেয়ারদেরই গরিব বলে ধরা হয়। এই জানালা থেকে তুমি যদি নীচের রাস্তায় এলোপাতাড়ি গুলি চালাও, তাহলে যে ক’টা লোক মারা পড়বে তাদের অধিকাংশই মিলিওনেয়ার, বিলিওয়েনার বা ট্রিলিওনেয়ার। আমার আয় তো দিনে মোটে দু-তিন শো ডলার। তাও সকাল থেকে সন্ধে অবধি খাটতে হয়। পুরোনো হেলিকপটারটা বেচে নতুন একটা মডেল কেনার ইচ্ছে বহু দিনের, পেরে উঠছি না। তবে সুখের কথা এখানে শার্সি বাড়ছে। আরও বাড়বে।
আমেরিকায় কাঁচের শার্সি ছাড়া আর কী আছে?
অনেক কিছুই আছে। নায়েগ্রা প্রপাত, ডিজনিল্যান্ড, স্ট্যাচু অব লিবার্টি।
দেখেছ?
দেখেছি। তবে ওসব হলো ট্যুরিস্টদের জন্য। আসল আমেরিকাকে আবিষ্কার করতে চাও তো আমার মতো হেলিকপ্টার কিনে তাতে উঠে পড়ো। কাঁচের শার্সি পরিষ্কার করার কাজ নাও। তখন দেখবে তোমার সামনে আসল আমেরিকার বুক ও নিতম্ব অনাবৃত হয়ে পড়ছে।
সেটা কী করে সম্ভব?
কাঁচ স্বচ্ছ জিনিস এবং সব ঘরেই তো পরদা টানা থাকে না। শার্সিতে চোখ রাখলে ঘরে-ঘরে আমেরিকার বিচিত্র রূপ দেখতে পাবে।
ধন্যবাদ। বলে আমি জানালা বন্ধ করে দিই।
ঘরের মেয়েটি আপনমনে আয়নার সামনে বসে সাজছিল। খুবই সুন্দরী সে। লম্বা, স্বাস্থ্যবতী। ফরসা রঙের কথা আর কী বলব!
আমি জানলা বন্ধ করার পর সে আমার দিকে চেয়ে বলল , ভারতীয় পর্যটক, মহিলাদের সম্বন্ধে তোমার পূর্ব ধারণা কীরকম?
খুব পরিষ্কার নয়। আচ্ছা, তোমাদের দেশের নিগ্রোদের সম্পর্কে তোমার ধারণা কীরকম?
খুব পরিষ্কার নয়। তবে শুনেছি ওরা ভীষণ দুষ্টু। মারপিট করে, রেপ করে।
করে? আমি চোখ কপালে তুলি।
হ্যাঁ, আমি রেপ জিনিসটা একদম পছন্দ করি না। সেক্স খুব ভালো। কিন্তু রেপ ভীষণ খারাপ।
আমি মাথা নেড়ে বলি, আমারও সেই মত। আমি শুনেছি গোটা আমেরিকাই একটা চমৎকার কার্পেটে ঢাকা। কথাটা কি সত্যি?
