আমার মনে হয় আত্মজীবনী বলতে যা বোঝায় মৃণালকান্তি ঠিক তা লেখেনি। এইরকম জনশ্রুতি আছে যে, মৃণালকান্তি প্রায়ই স্মৃতি ও স্বপ্নের দ্বারা আক্রান্ত হত। এই সম্বন্ধে সে নিজে লিখে গেছে, ‘আমার মনে হয় স্মৃতি এবং স্বপ্ন–এই দুইটি শব্দ আমাদের সচেতন করিবার পক্ষে যথেষ্ট নয়। পাপ–পুণ্যময় এ জগতে স্মৃতি এবং স্বপ্ন সকলেরই স্বাভাবিক অবলম্বন। বাস্তবিক ঠিকমতো অনুসন্ধান করিলে জানা যাইবে, যে, আমাদের অধিকাংশ প্রেমের কবিতা, দার্শনিক
প্রবন্ধ, ইস্পাতের কারখানা এবং দূরবীক্ষণ যন্ত্র স্মৃতি ও স্বপ্নের দ্বারা রচিত।’ মনে হয় এইখানে মৃণালকান্তি স্মৃতি অর্থে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান এবং স্বপ্ন অর্থে কল্পনা বোঝাতে চেয়েছে। কিন্তু আমার অনুমান এইমাত্র যে, মৃণালকান্তির স্মৃতি ও স্বপ্ন খুব স্বাভাবিক স্তরে ছিল না, কেন না সে নিজেই অন্যত্র লিখেছেঃ ‘…কিন্তু আমার আত্মজীবনী বাস্তবিক ইস্পাতের কারখানা, প্রেমের কবিতা কিংবা দার্শনিক প্রবন্ধ নয়। ইহার ভিতরে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দু-একটা লক্ষণ বর্তমান থাকিলেও বাস্তবিক ইহাকে ষোলো আনা দূরবীক্ষণ যন্ত্রও বলিতে পারা যায় না। যাহাদের স্মৃতি এবং স্বপ্ন স্বাভাবিক স্তরে আছে তাহারা প্রেমের কবিতা এবং দূরবীক্ষণ যন্ত্র আবিস্কারের চেষ্টা করে বটে, কিন্তু আত্মজীবনী রচনার চেষ্টা কদাচ করে না। আমার মতো মানুষের আত্মজীবনীর মূল্য কি তা যাহাদের স্মৃতি এবং স্বপ্ন স্বাভাবিক স্তরে আছে–তাহাদের কাছে বোধগম্য নয়। কেন না যে স্মৃতি এবং স্বপ্ন অতীতে একদা আমাদের ইস্পাতের কারখানা ও দার্শনিক প্রবন্ধ রচনা করিতে সাহায্য করিয়াছে তাহা আমার ভিতরে উপস্থিত থাকিলে আমার যাবতীয় পণ্ডশ্রম একটি মাত্র আত্মজীবনী রচনাতেই কেন্দ্রীভূত হইল কেন! তাও স্থির প্রত্যয়জাত অঙ্কের মতো নির্ভুল কোনওকিছু এই রচনাতে নাই–বরং এর সর্বত্র রচয়িতার তীব্র সন্দেহ মাত্র উপস্থিত আছে। কোনও ঘটনায় মাথার ভিতরে চকিতে বিস্ফোরণ ঘটিলে তাহার আলোতে যতদূর দেখা যায় ততদূর হইতে আমার স্মৃতি ও স্বপ্নগুলি আহরণ করিতেছি। মাঝে-মাঝে ভ্রম হয় আমি কতদূর অর্থহীন তাহা জানিবার আগ্রহেই আমি এই আত্মজীবনী রচনা করিতেছি।’
আখ্যান
ছায়া ছিল খুব হিসেবি মেয়ে। যাদবপুরের কোনও রিফিউজি কলোনি থেকে ছায়া কলকাতায় মাস্টারি করতে আসত। মৃণালকান্তি পরিচয় করিয়ে দিলে আমি ছায়াকে প্রথম দেখে বড় হতাশ হই। টলটলে চোখ ছিল না ছায়ার–শীতকালে শুকনো ঠোঁটের ওপর মামড়ি দেখা যেত। শরীরে মেয়েদের যে সব আকর্ষণ থাকে তার কোনওটাই ছিল না। খুব ঘন ঘন সিনেমা দেখত ছায়া–সব বাঙলা ছবিই তার মোটামুটি ভালো লাগত। কখনও কোনও কবিতার লাইন ছায়া বলেছিল কি! আমার মনে পড়ে না। প্রথমবার পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় মৃণালকান্তি ‘এই ছায়া। আমার–’বলে কথা শেষ করবার আগেই মনে পড়ে ছায়া বলল , ‘থাক আর বলতে হবে না, উনি বুঝতে পারছেন।’ মৃণালকান্তির সামনে প্রথমদিনই ছায়া আমার ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করেছিল। বলেছিল, ‘আমি খুব বেশি খাই না’, বলেছিল, ‘আমার ছোট বোন গান জানে, আপনার সঙ্গে বেশ মানায়। প্রতি বৃহস্পতিবার আর শনিবার সন্ধে পাঁচটা থেকে সাড়ে সাতটা পর্যন্ত সে মৃণালকান্তির সঙ্গে থাকত। ওই দুদিন তার টিউশনি ছিল না। সাতটা পঁয়তাল্লিশের ট্রেন ধরে ছায়া বাড়ি ফিরত–যদিও ছায়ার হাতে কখনও ঘড়ি দেখিনি। যেমন টনটনে ছিল তার সময়জ্ঞান তেমনি বুদ্ধিসুদ্ধি ছিল ছায়ার। মৃণালকান্তি ডায়েরি লিখছে জেনে সে মধ্যে–মধ্যে তার ডায়েরি পড়তে চাইত। মৃণালকান্তির আত্মজীবনীর সবটুকু আমি পড়িনি। ছায়াকে কোথা থেকে কেন জোগাড় করেছিল–সে আমি জানি না। মনে পড়ে তার আত্মজীবনীর কোথাও ছায়ার সঙ্গে তার পরিচয় হওয়ার আগে সে লিখেছিল, ‘..কোনওদিন কোনও যুবতী মহিলার সঙ্গে রাস্তায় হাঁটিয়া যাই নাই–যাহাতে মনে হয় চতুস্পার্শ্বস্থ সবকিছু আমাদের কেন্দ্র করিয়াই আবর্তিত হইতেছে। আমি কখনও মায়ের সঙ্গে, আত্মীয় মহিলার সঙ্গে রাস্তায় হাঁটিয়াছিলাম। সমান বুদ্ধিমতী সমান বয়স্কা কোনও মহিলার সঙ্গে হাঁটিয়া গেলে এমন মনে হইবে কি যে, এই মুহূর্তগুলি আমার সব চেয়ে প্রিয়; যেন আমরা সব কিছুর কেন্দ্রস্থলে আছি! মনে হইবে কি যে আমি কখনও মৃত্যুশোক অনুভব করি নাই! নিজেকে ক্ষুদ্রজীবী শিশুর মতো মনে হইবে কি যে, তাহার প্রিয়জনের দেহে ক্ষুদ্র হস্ত পদের দ্বারা প্রবল আঘাত করিয়া জানাইতে চাহে–আমি আছি!..’
মনে হয় ছায়া ক্রমশ মৃণালকান্তি সম্পর্কে হতাশ হচ্ছিল। মৃণালকান্তি ছিল প্রায় বেকার। কোনও এক ছোট্ট প্রকাশকের দোকানে সে কিছুদিন কাজ করেছিল। মাঝে-মাঝে বইয়ের প্যাকেট বয়ে নিয়ে তাকে এখানে ওখানে পৌঁছে দিতে হত। কিন্তু খুব গরিব সে ছিল না। তার বাবার জমানো কিছু টাকা সে পেয়েছিল, ভাই-বোন না থাকাতে পাকিস্তানের জমিজমা বিক্রি করে কিছু টাকার নিরঙ্কুশ মালিকানা সে পেয়েছিল। এইসব বন্দোবস্ত তার মা মৃত্যুর আগেই তার জন্য করে যান। নইলে ষাট টাকা মাইনে পেয়ে বেনেটোলা লেন-এর যে ঘরটা ভাড়া করে সে থাকত তার ত্রিশ টাকা ভাড়া দিয়ে দিলে পাইস হোটেল, সিগারেট এবং প্রতিদিনের পয়সা তার থাকত না। মৃণালকান্তি বেহিসেবি ছিল না, কিন্তু সম্ভবত ছায়া চাইত বিয়ের পর মৃণালকান্তি তাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলুক, এবং দোকানের শো-কেসে সাজানো কিছু কিছু জিনিসপত্র মৃণালকান্তির ঘরে থাক। বিয়ে করার কথা ছায়া এত বেশি ভেবেছিল যে, একদিন শ্রদ্ধানন্দ পার্কে অন্ধকারে মুখ রেখে বলে, ‘আমি চাই তুমি এমন কোনও কাজ করো যাতে আমাকে ছেড়ে তোমাকে অনেকদিনের জন্যে দূরে চলে যেতে হয়। আমি বেশ তোমার অপেক্ষায় থাকব।’ অন্যদিন শিয়ালদায় ট্রেন লেট আছে জেনে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে পাশাপাশি বসে বলেছিল, ‘অফিস থেকে ফিরে এলে পিছুপিছু অফিসের পিওন ফাইল নিয়ে আসে-দেখতে আমার বেশ লাগে।’
