২
মাঘের শেষে এক মাঝরাতে পরাগের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে দেখতে পায় বুকের ওপরে আকাশ। গভীর সমুদ্রের মতো অথৈ। নক্ষত্রের আলো কাঁপছে।
ত্রিপলের একটা কোণ উত্তরের বাতাসে উড়ে গেছে। শীত করছে খুব। কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে উঠে বসে পরাগ। এক প্যাকেট সিগারেট চুরি করে রেখেছিল। বালিশের পাশ থেকে সেই প্যাকেট তুলে অনভ্যাসের একটা সিগারেট ধরায় সে। তারপর মৃদু শব্দে একটু কাশে।
সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সানাই বেজেছে, বেজেছে উলুধ্বনি, হাসি, নানা শব্দ। সন্দ্যারাতে ছোড়দির বিয়ে হয়ে গেল। এখন রাত গভীর। ছাদের ওপর ঘুম ভেঙে বসে আছে পরাগ। মাথার ওপর ছাদের ত্রিপলের একটা কোণ উড়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। নিচে এঁটো পাতা নিয়ে ঘেয়ো কুকুরদের গম্ভীর ঝগড়ার আওয়াজ।
পরাগ অপলক চোখে অথৈ আকাশটুকু দেখে। এ রকম মধ্যরাত্রির আকাশ এমন বিরলে সে আর কখনো দেখেনি। আজকাল আর হইচই ভালো লাগে না তার, তাই শোওয়ার সময়ে সে একটা চেয়ারের গদি আর কম্বল টেনে নিয়ে এসে ছাদে শুয়েছিল। এখন বুঝতে পারে, এই ভয়ংকর শীতে আর ঘুম আসবে না। সে বসে থেকে সিগারেট খায়, আর অপলক শূন্য চোখে আকাশ দেখতে থাকে।
কোথায় যেন একটা কাশির আওয়াজ হয়, নাল-পরানো জুতোর আওয়াজ, মাটিতে লাঠি ঠুকবার শব্দ। পরাগ উঠে ছাদের আলসের ধারে আসে। অন্ধকারে ঝুঁকে দেখে, মুনিয়াদের বাইরের বারান্দার অন্ধকারে কে যেন বসে আছে। একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলে ওঠে। লোকটা সিগারেট ধরায়।
পরাগ ডাকে—কাকাবাবু।
—উঁ। সুবিনয় উত্তর দেয়।
—এখনো শোননি। রাত দুটো বেজে গেছে।
সুবিনয় গলার মাফলারটা ভালো করে জড়ায়, পায়ের মোজাটা একটু টেনে তোলে। তারপর বলে ঘুম আসে না।
হাতের টর্চটা জ্বেলে চারদিক একবার দেখে নেয় সুবিনয়, তারপর বলে—তুমি ঘুমোওনি?
—আমি ছাদে শুয়েছিলাম, কিন্তু এখানে বড় শীত। ঘুম আসছে না।
—হুঁ। এবারে শীতটা খুব পড়ল।
বাতাসে ত্রিপলের কোণটা উড়ে ফটাস ফটাস শব্দ করে। তারা কেউ চমকায় না।
পরাগ চাপা গলায় বলে, এই অন্ধকারে কি আর খুঁজে পাবেন? এবার গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
—যাই। উত্তর দেয় সুবিনয়, কিন্তু ওঠে না। বসে থাকে।
মুনিয়া মারা গেছে এক মাস। প্রায় এক মাস ধরে সারা দিন সুবিনয় শাবল আর লাঠি হাতে বাগানে ঘুরছে। খুঁড়েছে গাছের তলা, মাটির ঢিপি, ইঁদুর আর ছুঁচোর গর্ত। প্রথম প্রথম সঙ্গে পরাগ থাকত, থাকত পাড়ার উৎসাহী ছেলেমেয়েরা, যারা ভালোবাসতো মুনিয়াকে। ক্রমে ক্রমে সবাই যে যার কাজে ফিরে গেছে। এখন একা সুবিনয় সারা দিন সাপটাকে খোঁজে। গভীর রাত পর্যন্ত। আজকাল বড় একটা ঘুম আসে না।
পরাগ তার কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে নেমে আসে। বারান্দা থেকে পাখিটা তীব্রস্বরে ডাকে-’পরাগ’। পরাগ নেমে আসে, সদর খুলে বেরোয়।
—কাকাবাবু এই নিন এক প্যাকেট সিগারেট। আপনার জন্য রেখেছিলাম!
খুশি হয় সুবিনয়। হাত বাড়িয়ে নেয়। তারপর হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বলে—মুনিয়া বেঁচে থাকলে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতাম, বুঝলে পরাগ! মনে মনে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম।
শীত বাতাস বয়ে যায়।
—এবার গিয়ে শুয়ে পড়ুন কাকাবাবু। শীতকাল—এখন সাপেরা বড় একটা বেরোয় না।
—তাই হবে। সুবিনয় বলে বসে থাকে। তারপর বলে, তুমি যাও। আমি আর একটু দেখে গিয়ে শুয়ে পড়ব। যতক্ষণ এটা আছে ততক্ষণ কিছুতেই শান্তি পাই না।
পরাগ ওঠে। খুব শীত বলেই কি-না কে জানে তার চোখে জল আসতে থাকে।
একা আরো কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকে সুবিনয়। তারপর টর্চবাতিটা জ্বালে। ব্যাটারির জোর কমে গেছে, আলোটা লালচে। টর্চটা ঘুরিয়ে সামনের মাঠটা একটু দেখে, বাগানের বেড়ার ধারে যায়। লেবুগাছ আর ডালিমগাছের গোড়া থেকে আলো সরিয়ে নেয়। দত্তদের বাড়ি উঠছে, তাদের ইটের পাঁজাটা দেখে সুবিনয় পথে নামে। পরাগদের বাড়ির সামনে ঘেয়ো কুকুরদের ভিড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। বন্ধ ডাক্তারখানার চাতালে একজন মাতাল বসে আছে। সুবিনয় এগোয়। পুলিশ-ব্যারাকের পেছনের দেয়ালের সামনে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে মোমবাতি, আলকাতরার টিন, তুলি। কী লিখছে!
টর্চের আলো ফেলে সুবিনয় দাঁড়াতেই ছেলেগুলো রুখে মুখ ফেরায়।
—কে?
এ পাড়ারই ছেলে। তাকে চিনতে পারে। একজন এগিয়ে এসে বলে—আমরা কাকাবাবু। আপনি কী খুঁজছেন—সেই সাপটাকে? ওটাকে কি আর পাবেন? বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
সুবিনয় টর্চের আলো ফেলে দেয়ালে, বলে—এসব কী লিখছ?
—তেমন কিছু না। আপনি বাড়ি যান কাকাবাবু। আমরা লিখি।
সুবিনয় লেখাগুলো পড়ে! ঠিকঠাক কিছু বুঝতে পারে না।
লিখছ! আচ্ছা লেখো। বলে সুবিনয় আবার এগোয়। রেলরাস্তা পর্যন্ত চলে যায়। আবার ফিরে আসে। চারদিকেই অন্ধকার, নির্জনতা।
দিন কেটে যায়।
তখনো অন্ধকার ঝুলে আছে চারদিকে, ভোর রাত্রে পরাগের চন্দনা পাখিটা ডাক দেয়—পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
পরাগের আলস্যজড়িত ঘুম ভাঙে। উঠতে ইচ্ছে করে না। পাখিটা ডাকে, ডাকতেই থাকে। বিরক্ত পরাগ পাশ ফিরে ধমক দেয়—এই, চুপ!
পাখিটা ডানা ঝাপটায়, কিন্তু আবার ডাকে, পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
উঠতে ইচ্ছে করে না। সকালের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি আর দেখা যায় না। মুনিয়াদের বাগানে মুনিয়া। কী হবে বড় হয়ে আর? পরাগের আর বড় হতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে তার বুকের ভেতরে এক গ্রীষ্মের প্রান্তরে হু-হু করে হাওয়া বয়ে যায়।
পরাগ পাশ ফিরে শোয়। সিগারেটে এখন তার অভ্যাস হয়ে গেছে। বালিশের পাশেই থাকে প্যাকেট। সে শুয়ে শুয়ে সিগারেট খায়। কিন্তু পাখিটা ডাকতেই থাকে—পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
পরাগ চুপ করে থাকে। একবার ভাবে, উঠব না—খেলোয়াড় হয়ে আমার কী হবে! আর একবার ভাবে, উঠি। ভাবতে ভাবতে তার শীত করে। লেপটা মুড়িসুড়ি দিয়ে শোয়। মুনিয়াদের বাগানে আর মুনিয়াকে দেখা যাবে না। তাই শুয়ে সিগারেট টানে পরাগ। এই অনিয়ম দেখে তার চন্দনা পাখিটা রেগে গিয়ে ডানা ঝাপটায় আর ডাকে। ডানা ঝাপটায় আর ডাকে।
হঠাৎ মাথার ভেতরে একটি ঘন সবুজ মাঠের দৃশ্য ফুটে ওঠে। উঁচুতে একটা সাদা বল। সেই বলের দিকে লাফিয়ে উঠছে কয়েকজন লাল-সোনালি নীল-লাল জার্সি পরা খেলোয়াড়। হঠাৎ উষ্ণ একটা রক্তস্রোতে পরাগের শরীর ভেসে যায়। এ বছর পরাগকে ডেকেছে কলকাতার বড় একটা ফুটবল ক্লাব।
ভাবতে ভাবতে পরাগের শরীর চনমন করে। সে উষ্ণস্রোতে তার শরীরের শীতভাব দূর করে দেয়। সে উঠে তার শর্টস পরে, পরে নেয় কেডস, তার পাখিটা চুপ করে দেখে। খুশি হয়।
মুনিয়াদের বাগানে আর মুনিয়াদের দেখা যাবে না।
পরাগ এ বছর কলকাতার বড় একটা ক্লাবে খেলবে।
ভোরবেলা বহুদূরে এক কারখানার ভোঁ বাজতে থাকে।
সুবিনয় চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। রমলা একটা সেলাই মেশিন কিনবে। দুজনের চলে যাবে কোনোক্রমে। সারা দিন এবং রাত পর্যন্ত সাপটাকে খোঁজে সুবিনয়। ঘুম আসে ভোর রাত্রে।
দাড়িওয়ালা, স্মিতমুখ কার্ল মার্কসের ছবিখানা এখনো তার শিয়রে টাঙানো, মাঝে মাঝে সে ঘুম-জড়ানো চোখে ছবিখানার দিকে চায়। অস্ফুট গলায় বলে—আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতুম আমার মুনিয়াকে। আর কিছুকে নয়, আর কাউকে নয়। আমার এ অপরাধ ক্ষমা করো।
ক্রমে কার্ল মার্কসের ছবিখানায় ধুলো পড়ে। এক দুঃসাহসিক মাকড়সা লাফ দিয়ে উঠে আসে, তারপর স্মিতহাস্যময় সেই মুখের ওপর তার অমোঘ জালখানা বুনতে শুরু করে।
মৃণালকান্তির আত্মচরিত
মৃণালকান্তি আমাকে অনেক গলিখুঁজি, চোরাপথ, ভাঁটিখানা, বেশ্যাদের আস্তানা, হিজড়েদের আড্ডা চিনিয়েছিল। এইভাবে চেনা রাস্তা ভুলিয়ে অচেনা রাস্তায় সে বহুবার আমাকে নিয়ে গেছে। মনে আছে অনেকদিন মৃণালকান্তির সঙ্গে শিয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মের রিফিউজিদের বিবাহ, সঙ্গম, জন্ম এবং মৃত্যু দেখব বলে দাঁড়িয়ে থেকেছি। উপকরণের খোঁজে এইভাবে সে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াত। যতদূর জানা যায় মৃণালকান্তি তখন তার আত্মজীবনী রচনায় ব্যস্ত ছিল। তার সেই আত্মজীবনীর কিছু কিছু পৃষ্ঠা আমি পড়ে দেখেছি। সদ্যলব্ধ অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও স্বপ্ন এই ছিল তার আত্মজীবনীর উপকরণ এবং এইসব নিয়ে সে এত বেশি উত্তেজিত থাকত যে, কখনও রাস্তায় ঘাটে হঠাৎ দেখা হয়ে গেলে সে তার মধ্যমা ও বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠে কপাল টিপে রেখে এমনভাবে তাকাত যেন চিনতে পারছে না। তার রুক্ষ চোয়াল, গাল–ভাঙা মুখের ওপর নীল শিরাগুলি দেখা যেত। কখনও আমি তাকে বলতাম, ‘তোমাকে মাঝে-মাঝে ভীষণ অচেনা মনে হয় হে মৃণালকান্তি, বাস্তবিক!’ পকেট থেকে জাদুকরের মতো নিমেষে একটা রুমাল বের করে মৃণালকান্তি তার মুখের বিষণ্ণতা ও ক্লান্তি চাপা দিয়ে বলত, ‘কোথায় যাচ্ছ!’ কিংবা ‘খুব ব্যস্ত কি?’ আমি ‘না’ জানালে সে বলত ‘তবে এসো, একটু চা খাওয়া যাক।’ নির্জন অচেনা নিঃশব্দ কোনও রেস্তরাঁয় আমরা মুখোমুখি বসতাম আর তখন মৃণালকান্তি কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে সদ্যলেখা তার আত্মজীবনীর পৃষ্ঠাগুলি বের করে আমাকে পড়তে দিত।
