মৃণালকান্তি ছায়াকে কখনও খুব দূরে নিয়ে যেতে চেয়েছে, ছায়া রাজি হয়নি। মনে হয় নানা পরিবেশে সে ছায়াকে দেখতে চাইত। কি দেখতে চাইত মৃণালকান্তি! ঠিক কি চাইত তা আমি জানি না, তবে তার আত্মজীবনীর কোনও এক জায়গায় আমি পড়েছিলাম, একদিন লিন্ডসে স্ট্রিটের এক দোকানের পাশ দিয়ে যেতে-যেতে কাঁচের শো-কেসে একটা মেয়ের ‘ডামি’ দেখে মুখটা খুব পরিচিত মনে হওয়ায় সে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে লিখেছে ‘ইহাকে আমি কোথায় দেখিয়াছি! এইরূপ প্রাণহীন প্রস্তরবৎ মূর্তি নয়, আমি অবশ্যই ইহার কণ্ঠস্বর শুনিয়াছি, ইহাকে হাসিতে ও কথা বলিতে দেখিয়াছি। ইহাকে আমি বিষাদগ্রস্ত ও নিঃসঙ্গ অবস্থায় দেখিয়াছি। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ে না। এমন মাঝে-মাঝে হয় গতকালের কথা কতবার ভুলিয়া গিয়াছি। স্টেটবাসে কে আমার পাশে বসিয়াছিল–তার মুখ দেখি নাই, কন্ডাকটরের হাতে পয়সা গুনিয়া দিয়া টিকিট লইয়াছিল–কই কোনও কন্ডাকটরের মুখ তো মনে পড়ে না! মনে হয় কতকাল মানুষের সহিত আমি কিছুই বিনিময় করি নাই।’ তারপর মৃণালকান্তি লিখছে, ‘মনে হয় এই মুখে কোথাও বিষণ্ণতা ছিল। দীর্ঘকাল কাঁচের আবরণে ঢাকা থাকিতে–থাকিতে সেই আবরণ ভাঙিয়া বাহিরে আসিবার ইচ্ছা জন্মায় নাই বলিয়া কি এই বিষাদ! মনে পড়ে যাহাদের মুখে বিষণ্ণতা ছিল তাহাদের সহিত কখনও আমার বন্ধুত্ব হয় নাই। বোধকরি সেইজন্যই সুবলের মুখ আমি ভুলিয়া যাই নাই।’ এরপর মৃণালকান্তি সুবলের কথা অনেকটা লিখেছে। সুবল চমৎকার গল্প বলতে পারত। স্কুলে অনেকে সুবলকে ঘিরে বসে গল্প শুনত। বলতে-বলতে সে ইচ্ছামতো গল্পটাকে বড় কিংবা ছোট করতে পারত, বদলে দিতে পারত, গল্পটা যেদিকে যাচ্ছিল ঠিক তার উলটোদিকে নিয়ে যেতে পারত। তার গল্প শুনে সবচেয়ে যে বেশি মুগ্ধ হয়ে যেত সে ছিল। মৃণালকান্তি। সুবলের গায়ে নানা জায়গায় কতগুলি দীর্ঘস্থায়ী ঘা ছিল–যা কখনও শুকোত না; মাঝে-মাঝে ঘা বেয়ে রক্ত পড়ত, প্রায়ই খোস পাঁচড়ায় ভুগত সুবল, এবং কাছ থেকে কথা বললে সুবলের মুখ থেকে বিশ্রী পচা গন্ধ পাওয়া যেত। মৃণালকান্তি তাকে ঘেন্না করত। সেই সুবল একবার তার ঠোঁটে চুমু খেয়েছিল। মৃণালকান্তি লিখছে, ‘সহসা আমার ভিতরে সে কী সঞ্চার করিয়াছিল! চকিত বিস্ফোরণের আলোয় আমি কী দেখিতে পাইয়াছিলাম! মনে পড়ে না। সুবলকে দেখিতাম–স্কুলের সিঁড়িতে সে একা বসিয়া আছে, গ্রাম্য মেঠো পথ দিয়া একা-একা ফিরিতেছে। আমি আর তাহার কাছে যাই নাই।’ দীর্ঘদিন প্রায় আঠারো–উনিশ বছর পর সুবলকে সে আবার দেখেছিল, কলকাতায় সিনেমা হলের কর্মীরা মিছিল বের করলে সেই মিছিলে সুবলের মুখ চকিতে ভেসে যাচ্ছিল। সুবল কোনও সিনেমা হলে ‘গেট–কিপার’ হয়েছিল। সে লিখছে, ‘একদা ছেলেবেলায় মুখোমুখি হইয়া সহসা শূন্য বোধ করিলে যাহা আমরা করিয়াছিলাম তাহার স্মৃতি আমাকে গভীর আহত করিল। আজ আবার দেখা হইলে আমরা পরস্পর কি বিনিময় করিব! কিন্তু এতদিন পর সুবলকে আমি পুনরায় হাজার লোকের মিছিলে হয়তো চিনিয়া বাহির করিয়াছি। আমি কী দেখিয়াছিলাম! মনে হয় সুবলের মুখের সেই বিষাদ কখনও পালটায় নাই, মনে হয় একাকী, কিংবা বহুজনের সঙ্গে মিলিয়া বরাবরই সুবলের কী একটা কথা বলিবার ছিল –ছেলেবেলায় তাহার গল্পের ভিতর দিয়া, চুম্বনের ভিতর দিয়া, শেষ যৌবনে আর্ত স্লোগান ও উৎক্ষিপ্ত বাহুর ভিতর দিয়া সে সেই কথাই বলিয়া চলিয়াছে। আমি তাহাকে ঠিক চিনিয়াছিলাম। দেখা হইলে আজ আমরা পুনরায় চুম্বন না বিষণ্ণতা বিনিময় করিব! ভিড়ের ভিতরে আত্মগোপন করিতে–করিতে আমার মনে হইল আজ আমি পুনরায় সুবলকে ভালোবাসিতে পারিতেছি।’
তেমন করে মৃণালকান্তিকে ছায়ার কিছু বলবার ছিল কি? যতদূর জানি বিষণ্ণতা ছায়ার ভিতর কোথাও ছিল না। বিভিন্ন চুম্বনের আলাদা আস্বাদ মৃণালকান্তি টের পেত কিনা আমি জানি না। সুবলের কথা শেষ করে মৃণালকান্তি লিখছে, ‘কিন্তু বাস্তবিক ভালো করিয়া চাহিয়া দেখিলাম–এই ডামির মুখে আনন্দ বা বিষাদ কিছুই নাই। প্রাণহীনতা আছে মাত্র। এই প্রতিমার মতো মুখের সহিত অলৌকিক চিত্ত–বিনিময় সম্ভব নহে। দুর্গা প্রতিমার বিসর্জনের বাজনায় কেবল ইহার তাৎক্ষণিক বিষণ্ণতা ধ্বনিত হয়।’
মনে হয় ছায়ার ভিতর তবু কিছু খুঁজে পেয়েছিল মৃণালকান্তি যা তার ডামির মুখের বিষণ্ণতার মতো তাৎক্ষণিক। মৃণালকান্তি আত্মজীবনী থেকে জানতে পারি কোনও শনিবার ময়দান থেকে বেরিয়ে ফিরবার পথে বৃষ্টি নামলে ছায়া ওর আগে–আগে দ্রুত হাঁটছিল। ছায়া কোনও ‘শেড’ খুঁজছিল–মৃণালকান্তি ওকে দাঁড়াতে দিল না। ওরা সাবধানে হাঁটছিল। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে ভিজছিল। ছায়ার শাড়ির কলপ ভিজে গিয়ে শাড়িটা ওরা রোগা শরীরের সঙ্গে লেপ্টে যাচ্ছিল। পিছন থেকে ওকে দেখাচ্ছিল হঠাৎ চোপসানো, ভেজা একটা চড়াই পাখির মতো। ময়ূর তার পেখম গুটিয়ে নিলে হঠাৎ তার পিছনে যে শূন্যতা দেখা দেয়–মৃণালকান্তি লিখছে, ‘ছায়ার সমুখে সেইরূপ শূন্যতার ভিতর দিয়া দেখা গেল একজন ট্রাফিক পুলিশ একটা কানা ভিখিরির ছেলেকে হাত ধরিয়া রাস্তা পার করিয়া দিতেছে। ছায়া এইসব কিছুই দেখিল না। দেখিল না তাহার সমুখে ক্ষণস্থায়ী সেই কম্পমান দৃশ্যের পশ্চাদভূমিতে তাহার ঘাড়ের তিনটা হাড় উঁচু হইয়া আছে, চূর্ণ চুলের ওপর জলের ফোঁটায় সহসা প্রলয় প্রতিভাত হইতেছে। আমি মনে-মনে তাহার নিকট প্রার্থনা করিতেছিলাম–এখন তোমার চতুর চোখ আমার দিকে ফিরাইও না, সোজা হাঁটিয়া যাও-আমি তোমার পিছনে এইরূপে শাশ্বতকাল হাঁটিতে থাকিব। কিন্তু কোথায় যেন বিসর্জনের বাজনা বাজিতে ছিল। ছায়া মুখ ফিরাইয়া আমাকে কি বলিতেছিল–আমি শুনি নাই। শুধু চূর্ণ দৃশ্যের উপর, জলে প্রতিভাত বিম্বের উপর হইতে ডামির মুখের ক্ষণস্থায়ী বিষণ্ণতা ভাঁটার টানে নামিয়া যাইতেছিল।’
