গণেশের বউ চন্দ্রিমা বেশ মোটাসোটা আহ্লাদী চেহারার মেয়ে। রকমসকম খানিকটা পোষা বেড়ালের মতো। দাঁত নখ লুকিয়ে রেখে চোখ বুজে ন্যাকা-ন্যাকা ভাব করে বটে, তবে দরকারের সময় কোনো অস্ত্র বের করে আনে।
তা মোটা গিন্নি খায় ভালো। সারাদিনই খাচ্ছে। কচর-মচর খানিক চানাচুর চিবোলো, টাউ টাউ করে বাটিভর তেঁতুল-পান্তা মারল, দুধের সরটা আঙুলে আলতো তুলে মুখে ফেলে দিল, এক কোষ আচার চাটল হয়তো। তার ওপর হোটেল রেস্টুরেন্টে গিয়ে গণেশের ট্যাঁক ফাঁক করা তো আছেই। আজকাল নফরকে ফাঁকি দিয়ে বাড়তি পদ খাওয়া শুরু হয়েছে।
নফরচন্দ্র মশাটা আর খুঁজে পেল না। ভরাভরতি পেট নিয়ে শালা যাবে আর কোথায়! কিন্তু নফরের তেমন ইচ্ছেও করল না বেশি খুঁজতে। সেই কোন সন্ধেবেলা চাট্টি লেইভাত খেয়েছিল, এখন খিদের চোটে পেটের মধ্যে হাঁড়ি-কলসি ভাঙছে। রায়বাড়ির মুরগি রাত-বিরেতে বেলা ভুল করে ডেকে ওঠে। আজও ডাকছে ওই।
নফরচন্দ্রের ঘুম আসে না। ঘুম এলেই আজকাল একটা ফালতু লোক এসে বড় ঝামেলা করে। সেই কবে কোন ছোকরা বয়সে রাগের মাথায় কী করে ফেলেছিল তারই জের টানতে মেলা ঝামেলা বাধায় এসে লোকটা।
নফরের তেমন দোষ ছিল না। তখন দেশের গাঁ কালীগঞ্জে থাকত। অকালের বছর। চারদিকে চোর ছ্যাঁচড়ার বড় উৎপাত। লক্ষ্মীঠাকুরুণের মতো এক মা ছিল নফরের, রোগাভোগা খিদে পাওয়া মানুষ দোরগোড়ায় এলে প্রায় সময়েই পাত পেড়ে খাওয়াতো। এক দুপুরে তেমনি পেট টান করে খেয়ে একটা মাঝবয়েসি লোক যাওয়ার সময় একটা কাঁসার বাটি আর দুটো ধুতি মেরে চলে গেল। ঘটনার হপ্তাখানেক বাদে কালীগঞ্জের খাল ধরে নৌকো বেয়ে নফর যখন মাছ ধরতে বড় গাঙের দিকে যাচ্ছিল তখনই শ্মশানের ঘাটে লোকটাকে বসে থাকতে দেখে। পাশে পুঁটুলি। চোরটাকে দেখে নফর বেদিশা হয়ে নৌকো ভিড়িয়ে লগির একখানা ঘা লাগিয়েছিল জোর। লোকটা হাত তুলল না, চেঁচাল না, ঘা খেয়ে যেন বড় ঘুম পেয়েছে এমন ভাব করে শুয়ে পড়ল। কেউ সাক্ষী ছিল না। নফর নৌকোয় কেটে পড়ল তৎক্ষণাৎ। পরদিন হাটে-বাজারে কিছু কথাবার্তা শুনল লোকের মুখে। শ্মশানের ঘাটে একটা লোক মরে পড়ে আছে। তা কে আর একটা মড়া নিয়ে মাথা ঘামায়। তখন কত মরছে চারদিকে!
ভেবে দেখলে, খুনের জন্যে তো মারতে যায়নি নফর। চোরের সাজা দিতে গিয়েছিল। কত মাথা ফাটাফাটি করেও লোকে বেঁচে থাকে। কিন্তু সেই কমজোরি লোকটার যে ফুলের ঘায়ে মূৰ্ছা। যাওয়ার অবস্থা তা কে জানত! নফরের মন-মেজাজ কয়েকদিন বিগড়ে রইল ঠিকই, কিন্তু নিজেকে তেমন দোষ দিতে পারল না।
বহুকাল হয়ে গেছে। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর আগেকার বৃত্তান্ত। লোকটাকে ভালো মনেও নেই তার। মাথাটা ন্যাড়া ছিল, সেটা বেশ মনে পড়ে। গলায় একটা রুদ্রাক্ষের মালা ছিল মনে হয়। খালি গা ছিল, পরনে একটা হাকুচ ময়লা কাপড়। একদম ফালতু লোক। দুনিয়াতে ওরকম দু চারটে লোক না থাকলে কেউ টেরও পাবে না। পায়ওনি। লোকটার জন্য থানা পুলিশ হয়নি, কান্নাকাটি হয়নি।
কিন্তু মুশকিল হল এখন মাঝে-মাঝে লোকটা এসে নফরচন্দ্রকে ঘুম থেকে তুলে বলে– ন্যাড়া মাথা বলেই বড্ড লেগেছিল হে।
নফর বিরক্ত হয়ে বলে—তাহলে পাগড়ি পরে থাকলেই পারতে।
লোকটা বলে—হুঁঃ তখন জামা জোটে না তো পাগড়ি। তা তুমি লগি চালাবে জানলে পাগড়িই পরতাম। ন্যাড়া মাথাটায় বড্ড লেগেছিল হে।
–ন্যাড়া হয়েছিলে কেন মরতে?
—সে আর এক কেচ্ছা। মজিলপুরে এক মুদির দোকান থেকে এক থাবা বাতাসা চুরি করেছিলাম বলে তারা মাথা কামিয়ে দিলে, ঘোলের বড় দাম বলে ঘোল ঢালেনি। কিন্তু কোমরে দড়ি বেঁধে গাঁয়ে ঘুরিয়েছিল।
নফরচন্দ্র বলে—তাহলে তোমারই দোষ বলো।
—তা ছাড়া আর কার? আমার মাথায় খুব ঝুপসি চুল ছিল তখন। মাথাটা একটা বোঝার মতো দ্যাখাত। তার ওপর লগির ঘা পড়লে বোধহয় তেমন লাগত না। ন্যাড়া মাথা বলে লেগেছিল। না খেয়ে-খেয়ে তখন শরীরটা তো মরেই আসছিল। ব্যথাটা সইল না।
—আমার তবে দোষ কী বলো।
–দূর ছাই, তোমার দোষ কে দিচ্ছে? এতকাল পরে সেসব তুচ্ছ কথা ঘাঁটাঘাঁটি করতে আসি বলে ভাবো না কি? তুমি না মারলেও মরণ আমার লেখাই ছিল। আমি তা বুঝতে পেরে কাজ এগিয়ে রাখতে শ্মশানের ধারে গিয়ে বসে থাকতাম।
—তাহলে আমাকে দোষী করছ না তো! ঠিক করে বলো বাপু ন্যায্য কথা।
—আরে না। তবে বলি বাপু, তোমার কাছে আমার কিছু পাওনা হয়। সেই যে মেরেছিলে তারও তো একটা দেনা আছে।
—দেনা! বলে আঁতকে ওঠে নফর। বলে—এর মধ্যে আবার দেনা-পাওনার কথা ওঠে কোত্থেকে?
—ওঠে। যখনই আমাকে মারলে তুমি তখনই তোমার সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক হল তো।
—সে আবার কীরকম?
লোকটি মিটিমিটি হেসে বলে—হয়। সে এমন সম্পর্ক যে এক জন্মে আর কাটান-ছাড়ান নেই। সেই সম্পর্কের জোরেই তোমার কাছে আমার কিছু পাওনা হয়।
—পাওনা হলেই বা দিই কোত্থেকে। সংসারের অবস্থা তো দেখছ। ওই গণেশটা আমার একমাত্র অন্ধের নড়ি। কোথায় যেন যন্ত্র চালায়। আয় ভালোই, কিন্তু বুড়ো বাপকে দেয় কী? সব ওই মোটা গিন্নির শরীরের আহ্লাদে খরচ হচ্ছে। তার ওপর মাগি আবার বাঁজা। একটা নাতকুড় হলেও আমার একটা সুখ ছিল। সেও হল না। সংসারের সব আদর মোটা গিন্নি নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে।
