বাইরে একটা কোকিল ডাকল। যন্ত্রের কোকিল। বুড়ো দুজনের দিকে তাকাল। তারপর দুজনের মাঝখানের শূন্যতার দিকে চেয়ে বলল—আমার মাথাটা একশো বছরের পুরোনো। খুব ধোঁয়াটে। তবু বলি দশ বছর আগে বিয়ে বেআইনি ছিল। মন্ত্র নেই, পুরুত নেই, রেজিস্ট্রার নেই, তবে আপনাদের বিয়ে হয়েছিল কীভাবে?
—হয়নি। বিপুল বলে।
–হয়েছিল। ধরিত্রী চেঁচিয়ে বলল—আমরা ফুলের মালাবদল করেছিলাম, আর তুমি কয়েকটা সংস্কৃত মন্ত্র বলেছিলে, যেগুলোর অর্থ আমি বুঝিনি। কিন্তু তবু সেটা বিয়েই।
–ধরিত্রী।
বিতর্ক শুনে বুড়ো মাথা চুলকোয়। বিড়বিড় করে বলে—আমার হৃদযন্ত্র নতুন, ফুসফুস নতুন, কিন্তু মাথাটা পুরোনো। বড্ড ধোঁয়াটে। কিছু বুঝতে পারছি না। তবে এভাবেও বিয়ে হতে পারে। আগে হত।
—এখন হয় না! বিপুল বলল।
ধরিত্রী কথা বলতে পারল না। কিন্তু ফুলগুলি বুকে চেপে চেয়ে রইল। বিপুল তার দিকে চেয়ে বলল—ধরিত্রী, আমাদের কিছুই লুকিয়ে রাখা যাবে না। তার চেয়ে তুমি চলে যাও।
বুড়ো মাথা চুলকোচ্ছিল। বিড়বিড় করে বলল—আরও হয়তো পঁচিশ বছর এরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। বারবার শরীরের যন্ত্র বদলে দেবে। আমি সব ভুলে যাব। অন্য মানুষ, ফের অন্য মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে। ভীষণ মুশকিল।
বুড়োর কথা কেউ শুনছিল না। বিপুল চেয়ে আছে ধরিত্রীর দিকে, ধরিত্রী বিপুলের দিকে।
জানলার বাইরে একটা লাল রঙের ভেলা এসে থেমেছে। ভেলার গায়ে লেখা—অনুসন্ধান। ভেলা থেকে চারজন লোক জানলাটপকে ভিতরে এল। এনকোয়ারি কমিশন।
বুড়ো সেই চারজনকে দেখে সরে এল জানলার কাছে। একটু কষ্টে নিজের ছোট সাদা ভেলাটায় চড়ে বসল। তারপর ভেসে যেতে লাগল। মাথাটা বড্ড ধোঁয়াটে। অনেক কালের কথা জমে পাথর হয়ে আছে। শিগগির এই মাথাটা তার থাকবে না। একদম অন্যরকম হয়ে যাবে। বুড়ো ভাবল—আমাকে কোথাও চলে যেতেই হবে। এরা আমাকে কেবলই বাঁচিয়ে রাখবে। যতদিন এদের খুশি। কিন্তু মরাটাও যে ভয়ংকর দরকার তা এরা কবে বুঝবে?
সেই রাতে বুড়ো একটা চমৎকার স্বপ্ন দেখল। তার বাবা রাস্তা সমান করার রোলার চালাত। ঘট-ঘটাং করে প্রচণ্ড শব্দে সেই রোলারটা পুরোনো পৃথিবীর রাস্তাঘাট সমান করত। বুড়ো দেখল, সেই রোলারটায় সে আবার চড়েছে। প্রচণ্ড শব্দে সে রোলারটা চলছে। সামনে শূন্য প্রান্তর, মাঝখানে অফুরান মুক্তির মতো রাস্তা। পিছনে তাড়া করে আসছে বাতাসী ভেলা, রকেট, সন্ধানী আলো, মৃত্যুরশ্মি। বুড়ো ডাকল—বাবা! রোলার চালাতে-চালাতে বাবা একবার পিছু ফিরে চেয়ে বললেন—ভয় নেই! আমরা ওদের ছাড়িয়ে যাব। বুড়ো একটু হাসল, তারপর নিশ্চিন্তে চোখ বুজল।
মশা
রক্ত খেয়ে মশাটা টুপটুপে হয়ে আছে। ধামা পেটটা নিয়ে মশারির দেওয়ালে বসে আছে ওই। এইবেলা টিপে দিলে ফাঁক করে খানিক কাঁচা রক্ত ছিটকে গলে যাবে শালা।
নফরচন্দ্র জীবনে মশা মেরেছে অনেক, আর মানুষ মেরেছে একটা। মানুষটার কথা এখন আর মনে পড়ে না। অল্প বয়স ছিল তখন। সময়ের তফাতে ভুল পড়ে গেছে। তবে মশাদের কথা যদি কেউ শুনতে চায়, তবে ঢের কথা শোনাতে পারে নফরচন্দ্র। একটা জীবন মশা মেরেই তো গেল। তার বউ চারু পর্যন্ত মরবার আগে তার কোনও গুণের কথা না বলুক এটা জোর গলায় বলে গেছে—পারোও বাপু তুমি মশা মারতে।
তা পারে নফরচন্দ্র। যত মশা তত মারার আনন্দ।
লোমের মতো সরু হাত-পা ওলা মশাটা কী পরিমাণ রক্ত টেনেছে দেখ! পেটটা একটা ধানের মতো বড় দেখাচ্ছে। ওই হাতে পায়ে আর ফিনফিনে পাখনায় এত বড় পেটটা নিয়ে ওড়াউড়ি করবে কেমন করে? বড় তাজ্জব লাগে নফরচন্দ্রের। শালারা নিজেদের শরীরের চেয়ে ঢের বেশি ওজনের রক্ত খায়। আখেরের খাওয়া। দু-হাতের পাতা দু-দিকে চড়ের মতো তুলে নফরচন্দ্র আস্তে করে মশাটার দিকে এগোয়। ভরাপেটে মশার চালাকি খাটে না। টলতে-টলতে একটু আধটু নড়েচড়ে ঠিকই, কিন্তু বেশিদূরের দৌড় নয়। নফর জানে।
ঘরের আলোটা কিছু কমজোরি। নাকি বয়সে চোখের দৃষ্টিতেই ভাঁটা পড়েছে? কিছু একটা হবে। চোখের সামনে বিন্দু-বিন্দু কী সব ভেসে বেড়ায় আজকাল নোংরার মতো। সেই বিন্দুগুলোকেও প্রথম-প্রথম মশা বলে ভুল করত সে।
দু-হাতে ফটাস করে তালি বাজাল। কিন্তু রক্ত ছিটকালো না। মশাটা সটকেছে।
নফরচন্দ্র নিজের হাতের দিকে চায়। আঙুলের জোড়ে-জোড়ে গিট পড়ার মতো ভাব। বুড়ো চামড়ায় কুঁচি পড়েছে। বিনা কারণে আঙুলগুলো ত্যাড়াবাঁকা হয়ে যাচ্ছে ইদানীং। এসবই কি হওয়ার কথা ছিল?
বিছানায় হাঁটু গেড়ে বসে নফর ময়লা মশারির চারদিকে তাকিয়ে রক্তচোষাটাকে খোঁজে। আছে খুব কাছেপিঠেই, বেশি ওড়াউড়ি করার মতো ক্ষমতা নেই। এক্ষুনি বসবে কোথাও। কিন্তু চড়টা ফসকাল—সেটাই ভাবনার কথা। এতকাল মশা মারতে কদাচিৎ ফসকেছেনফর।
বাড়ি নিঝুম হয়ে গেছে খানিক আগে। নফর টের পেয়েছে, তার ছেলে গণেশ আজ খেয়ে উঠে আঁচাতে অনেক সময় নিল। একবার যেন বউয়ের কাছে খড়কেও চেয়েছিল। কিন্তু খড়কে দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করার মতো খাওয়া-দাওয়া তো ছিল না আজ! নফরকে সন্ধের মুখে গণেশের বউ মুলো দিয়ে রান্না মটরের ডাল, বাসি বাঁধাকপির ঘন্ট, আর ট্যাংরার চচ্চড়ি খাইয়ে দিয়েছে। সে খাওয়ায় খড়কে লাগে না। নফরের আজকাল সন্দেহ হয়, তাকে ফাঁকি দিয়ে গণেশ আর গণেশের বউ গোপনে দু-চারটে বাড়তি পদ খায়। নফরচন্দ্র খেয়ে আসার পর বেশ খানিক বাদে। একটা মাংস রান্নার বাস খুব মাত করেছিল পাড়া। নফর ভেবেছিল রায়েদের বাড়ি রান্না হচ্ছে। তা নয় তবে।
