লোকটা বলে—সে আমি শুনব কেন বলো! আমার পাওনা আমাকে মিটিয়ে দেবে, তবে অন্য কথা।
বলে লোকটা চলে যায়।
জেগে গিয়ে নফরচন্দ্র মশার পুন-ন-ন শুনতে পেয়ে উঠে বসে। কোথা দিয়ে যে মশারির মধ্যে ঢোকে শালারা। মশা মারবার জন্য বাতি জ্বালতে গিয়ে নফরের ভুল ভাঙে। ও হরি! এ যে বেহান হয়ে গেল! কাক ডাকতে লেগেছে।
ছেলের সঙ্গে এই ভোররাতেই একবার চোখের দেখা হয়। গণেশ বারান্দায় ঘুরে-ঘুরে দাঁতন করে এ সময়টায়। চোখাচোখি হলেও কোনও কথা হয় না। কথার আছেটা কী? গণেশ তার সব কথা বরাবর মাকে বলে এসেছে। এখন বউকে বলে বোধহয়। বাপের সঙ্গে কোনওদিনই তেমন বাক্যালাপ করে না। আজও ভোর রাতে বারান্দায় দেখা হল। কলঘর থেকে ঘুরে এসে নফর বলল– আমার মশারিটা বড্ড ছিঁড়ে গেছে। একটা কিনে দিবি?
—দেব’খন। এ মাসটা জোড়াতাড়া দিয়ে চালিয়ে নাও।
গণেশ ছেলে খারাপ না। বউটা খচ্চড়।
না কি বউটাও খারাপ না, সে নিজেই খচ্চড়! কোনটা যে কী তা বলা মুশকিল। গণেশের মা চারু বরাবর বলে এসেছে, নফরচন্দ্রের মতো এমন শয়তান নাকি দুটো হয় না। কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। ভেবে দেখবার মতো কথা।
আহ্লাদী বউ যখন উঠে হালুয়ার কড়াই বসিয়েছে তখন গণেশের স্নান সারা। ভাজা সুজিতে জল পড়ল ছ্যাঁকাৎ করে। রায়বাড়ির মুরগি ডাকছে। চড়াই পাখির ডানার শব্দ কানের পাশ দিয়ে সড়াৎ করে চলে যায়। গণেশ রামপ্রসাদি গাইতে-গাইতে খেতে চাইল। মোটা গিন্নি বলল— দিচ্ছি।
নফরকেও দেবে। তবে সে একটুখানি। বাসি রুটি গণেশ ছ’খানা খায়, মোটা গিন্নি ক’খানা তা নফর জানে না। তবে তার ভাগ্যে দুখানা। চাইলে বলে—আর তো নেই!
ডাক্তারেরও নাকি বারণ আছে। কিন্তু নফর তার শরীরের গতিক কিছু বোঝে না। বেশ আছে। তবে কাল রাতে একটা পেটমোটা মশা তার হাত ফসকে পালিয়েছে, সেটা ভাববার কথা।
বউ মরে বড় জ্বালাতন হয়েছে। চারু মুখ করত বটে, কিন্তু সে কাছে থাকতে নফরের হাতে মশা ফসকাত না। আর ন্যাড়ামাথার সেই পাওনাদারটাও কাছে ঘেঁষেনি কোনওদিন।
সূর্যটা তার ন্যাড়ামাথা নিয়ে ভুস করে উঠে পড়ল ওই। গণেশ বেরিয়ে গেলে মোটা গিন্নি আবার গিয়ে বিছানা নেবে। ঝি আসে অনেক বেলায়। বড় ফাঁকা লাগে নফরের। গণেশের যদি একটা ছানা হত।
মশারি চালি করে বিছানা গুটিয়ে বসে থাকে নফর। দুটো রুটি গরম হালুয়ার সঙ্গে পেটের মধ্যে বেড়াতে গেছে। গণেশ কাজে বেরোল। মোটা গিন্নি একটা মস্ত হাই তুলে বিছানা নিল পাশের ঘরে।
পুবের জানালা দিয়ে একটা বেঁটে দেয়াল দেখা যায়। দেয়ালের ওপর তারকাঁটার তিনটে লাইন। তার ফাঁকে একটা ন্যাড়ামাথার মতো সূয্যি ঠাকুর। পাখি ডাকে।
চারু খুব জপ করত এসময়। জপের মালা রেলগাড়ির চাকার মতো বনবন করে ঘুরে যেত। সংসারের কাজকর্ম শুরু করবার আগে বরাদ্দ জপ এগিয়ে রাখত যতটা পারে। নফরের সে-সবও নেই। খামোখা বসে অং বং জপের চেয়ে অন্য কথা ভাবলে কাজ হয়।
এক সময় চাষবাষ করত, পরের দিকে একটা দোকানে আধাআধি বখরায় ব্যাবসা করত। সে খোঁড়া ব্যাবসাতে রোজ দু-পাঁচ টাকা আয় হত। অধৈর্য হয়ে একদিন দোকানের কিছু মাল সরিয়ে কেটে পড়ল। আবার হয়তো অন্য কারবারে হাত দিল একদিন। জীবনটা ফেরেববাজিতে গেছে। গণেশ কম বয়সে যেই চাকরিতে ঢুকল অমনি নফরচন্দ্র হাত ধুয়ে ঘরে থিতু হল। আর কাজ কারবারে যায়নি। গেলে আজ দুটো পয়সা নাড়াচাড়া করতে পারত। তার বদলে নফরের অন্য সব ব্যাপারে মাথা খুলতে লাগল বেশি। চমৎকার মশা মারত, বাগান করত, কয়লা ভাঙত, পান। সাজত। বসে থাকলে কত বাতিক হয় মানুষের।
মোটা গিন্নি ঘুমোলে নফর চুপিচুপি উঠে রান্নাঘরে আসে। ঝি এখনও আসেনি। গত রাতের এটোকাঁটা পড়ে আছে। উঁকিঝুঁকি দিয়ে নফর দেখে মাংসের হাড়টাড় পড়ে আছে ডাঁই হয়ে। কম গেলেনি দুজনে। হাড়গোড়ের পরিমাণ দেখলে তাজ্জব মানতে হয়। একটা লুচির টুকরোও দেখা যাচ্ছে। তবে কাল রাতে লুচিও ভেজেছিল।
শ্বাস ফেলে নফর ঘরে আসে, ঘর পেরিয়ে একদম সদরের বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। উদোম। পৃথিবী চারদিকে ছড়ানো। একবার ইচ্ছে হয়, যায় চলে যেদিকে দু-চোখ যায়। লুচি-মাংসের ব্যাপারটা আজ বড় দাগা দিয়েছে তাকে। কিছুদূর খামোখা ঘোরঘুরি করে ফিরে আসে নফর। বিবাগি হয়ে যেতে এ বয়সে বড় ভয় করে। কাল রাতে একটা মশা ফসকে গেল। ন্যাড়ামাথার লোকটা রোজ আসছে আজকাল।
ঘরে ফিরে এসে নফর মোটা গিন্নির বকুনি খেল একচোট। আহ্লাদী বউ বলল–কী আক্কেল আপনার বলুন তো, সদর দরজা হাট-খোলা রেখে বেড়াতে বেরিয়েছেন, কে না কে ঢুকে যে সব ফরসা করে নিয়ে যেত। এক ডাঁই কাঁসার বাসন পড়ে আছে, আরও কত দামি জিনিস। এই তো সেদিন চুরি গেল এক কাঁড়ি।
বড় দুঃখ হল নফরের। সে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেই বুঝি ভালো ছিল।
চারু মরে যাওয়ার পর পরই নফর একটা বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছিল। খড়কাটা কলের মালিক হরেকৃষ্ণ পালের একটা হাবাগোবা বোন আছে। তার বয়স অনেক। হাঁ করে চেয়ে থাকে, মুখ থেকে অবিরল নাল ঝরে। ওরিয়েন্ট সেলুনের নরহরি নফরের চুল ছাঁটতে-ছাঁটতে একদিন বলেছিল—নফরবাবু শ’পাঁচেক টাকা জোগাড় করতে পারেন তো বিয়েটা লাগিয়ে দিতে পারি।
হাবাগোবা যাই হোক একটা বউ তো হত। টাকাটাই বখেরা বাধালে। তা-ও চেষ্টা করেছিল। ঘরের কিছু জিনিসপত্র হাতছিল্প করে বাজারে বিক্রি করে কিছু পয়সা পেল। মোটা গিন্নির সোনার জিনিস কিছু হাতাতে পারলে হত। কিন্তু সে আর হয়নি, ঘরের জিনিস কিছু খোয়া যাওয়াতে চন্দ্রিমা এমন হই-হুল্লোড় বাধালে যে নফর আর কিছু সরাতে সাহস করল না। তার ওপর কানাঘুষোয় তার বিয়ের ব্যাপারটাও গণেশের কানে এসে পৌঁছেছিল। কী লজ্জা! আজকাল পাড়ার ছেলেরা তাকে রাস্তায় দেখলে উলু দেয়।
