–কেন? আমি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললুম–আসলে দু-একটিই ভালোবাসার মুহূর্ত থাকে আমাদের। না? বলেই হাসলুম–ছেলেবেলার তুমি মাত্র একবারই ভালোবেসেছিল আমায়।
শুনে ভিনি অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল –আমি জানি তুমি আমাকে তেমন ভালোবাসো না মন। তেমন মুহূর্ত তোমার কখনও আসেনি।
শুনে বড় চমকে উঠলুম। হেসে বললুম–পাগলি।
ও চুপ করে আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল –তাকে কিছু আসে যায় না। আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।
আমি হেসে গলা নামিয়ে বললুম–ভিনি তোমার গায়ে জন্মদাগটা কোথায়?
অবাক হয়ে ভিনি বলল –কেন?
বললুম–তোমার গায়ের ভোলা দাগটা খুঁজে পাইনি।
একটু চুপ করে থেকে ভিনি হঠাৎ লাল হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল–এঃ মাগো, বিচ্ছু কোথাকার…তোমার…তোমারটা কোথায়?
তারপর অনেক রাতে ভিনি আমাকে তার জন্মদাগ দেখতে দিয়েছিল।
তিন বছরে আমাদের দুটি ছেলেমেয়ে হল। আর আমরা অল্প একটু বুড়ো হয়ে গেলুম।
মাঝে-মাঝে আমি ভিনিকে বলি–ভিনি, আমার মন ভালো নেই।
–কেন?
–কি জানি।
–শরীর খারাপ নয়তো? বলতে-বলতে সে এসে আমার কপালে তার গাল ছোঁয়ায়, বুকে হাত দিয়ে দেখে গা গরম কি না।
–না, শরীর খারাপ নয়। আমি বলি।
–রাতে দুঃস্বপ্ন দেখেছিলে?
–না।
–তবে কী?
–কি জানি! আমি বলি–মন ভালো নেই।
ভিনি হাসে-পাগল কোথাকার।
–আমার বড় একা লাগছে ভিনি।
ভিনি চমকে উঠে–কেন আমরা তো আছি।
আমি শূন্য চোখে চেয়ে থাকি। কথার অর্থ বুঝবার চেষ্টা করি। পকেট হাতড়ে খুঁজি সিগারেট আর দেশলাই।
.
গত আশ্বিনে আমি আমার চৌত্রিশের জন্মদিন পার হয়ে এলুম। আমি জানি আমি খুব দীর্ঘজীবী হব–আমার কুষ্ঠিতে সেই কথা লেখা আছে। ত্রিশের ঘরে বসে আমি তাই সামনের দীর্ঘ জীবনের দিকে চেয়ে অলস ও ধীরস্থির হয়ে আছি। বিছানায় শুয়ে হাত বাড়ালেই যেমন টেবিলের ওপর সিগারেটের প্যাকেট, দেশলাই, জলের গ্লাস কিংবা ঘড়ি ছোঁয়া যায়, মৃত্যু আমার কাছে ততটা সহজে ছোঁয়ার নয়। মাঝে-মাঝে জ্যোৎস্না রাতে আমার জানালা খুলে চুপ করে বসে থাকি। হালকা বিশুদ্ধ চাঁদের আলো আমার কোলে পড়ে থাকে। ক্রমে–ক্রমে আমার রক্তের মধ্যে ডানা নেড়ে জেগে ওঠে একটি মাছ ছোট্ট আঙুলের মতো একটি মাছ–শরীর ও চেতনা জুড়ে তার অবিরল খেলা শুরু হয়। আমার চেতনার মধ্যে জেগে ওঠে একটি বোধ, আমারই ভিতর থেকে কে যেন বড় মৃদু এবং মায়ার স্বরে ডেকে দেয়, ‘সুমন, আমার সুমন।’ অকারণে চোখের জল ভেসে যায়। আস্তে-আস্তে জানলার চৌকাঠের ওপর মাথা নামিয়ে রাখি। মায়ের হাতের মতো মৃদু বাতাস আমার মাথা থেকে পিঠ পর্যন্ত স্পর্শ করে যায়। তখন মনে পড়ে–সুমন, তোমার জীবন খুব একার হবে।
আমেরিকা
আমেরিকায় নামবার আগে ভালো করে দাঁত মেজে নিও। কারণ তোমার দাঁতে প্রাচ্যদেশিয় বীজাণু থাকতে পারে। হাতঘড়ির সময়টাও মিলিয়ে নাও। কারণ আমেরিকায় সবকিছু ঘড়ি ধরে চলে। তোমার জুতোর তলায় রয়েছে প্রাচ্যদেশিয় ধুলো–ময়লা। রুমালে সেগুলো সাবধানে মুছে নাও। আমেরিকাকে নোংরা কোরো না। এবার প্রস্তুত হও। সিটবেল্ট বাঁধো। সিগারেট নিভিয়ে ফেলো। আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা কেনেডি এয়ারপোর্টে নামছি।
এসব আমার জানাই ছিল। অনেক আগেই আমি দাঁত মেজে, হাতঘড়ি মিলিয়ে এবং জুতো পরিষ্কার করে বসে আছি। আমার পাশে বসা একটা খুনখুনে তিব্বতি বুড়ি ভাঙা হিন্দিতে বিড়বিড় করে আমাকে বলল , আমার দাঁত নেই, হাতঘড়ি নেই, রুমাল নেই! বাঁচলাম। নীচে ওই যে জঙ্গলের মতো দেখা যাচ্ছে, মস্ত-মস্ত উঁচু গাছ অথচ ডালপালা নেই ওটা কী জায়গা বলল তো?
চুপ–চুপ। আমি চাপা গলায় বলি, ওটাই নিউইয়র্ক।
নিউইয়র্ক! বুড়ি চোখ কপালে তুলে বলল , কিন্তু কার্পেটটা দেখতে পাচ্ছি না কেন বলো তো! আমার ছেলে নিউইয়র্ক থেকে লিখেছিল গোটা আমেরিকাই একটা মস্ত কার্পেট দিয়ে মোড়া।
আমিও শুনেছি।
শুনেছ। যাক বাঁচালে। বলে বুড়ি বিড়বিড় করতে করতে তার পোঁটলাপুটলি গোছাতে লাগল।
প্লেন নামল। থামল। দরজা খুলে হোসটেস বলল , প্রাচ্যবাসীগণ, তোমাদের সামনে স্বর্গের দরজা খোলা। এখানে সব কিছুই অফুরন্ত। ডলার, মেয়ে, ফরেন গুডস, যাও কয়েকদিন লুটেপুটে খাওগে। ইউরোপীয়গণ, আমেরিকা তোমাদের কাছে স্বর্গ না হলেও চমত্তার এক চারণভূমি। যাও দ্বিতীয় এই স্বদেশকে বারবার আবিষ্কার করো। আমেরিকানগণ, তোমাদের কাছে আমেরিকা সম্পর্কে নতুন কিছু বলার নেই। এই সেই নরক, যেখানে মরতে তোমাদের ফিরে আসতে হয়।
আমি নামলাম। এবং নেমেই তাজ্জব হয়ে গেলাম। আমেরিকায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই যেন আমেরিকা আমাকে তার কোলে তুলে নিল। আদর করে কানে-কানে বলল , বাছা রে, গরিবের ঘরে পথে ধুলো–কাদা ঘেঁটে বড় হয়েছিস। ভালো জিনিস চোখে দেখিসনি, জিবে ঠেকাসনি, ভোগ করিসনি। আয় বাছা, ক’দিন ভোগ–সুখ করে যা।
কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল এল। আমি গোপনে রুমালে চোখের জল মুছে নিলাম।
আমেরিকায় কাঁদা বারণ। তবে আমেরিকা সম্পর্কে আমি যা–যা শুনেছিলাম, তা সবই সত্যি। দেশটা আগাগোড়া মহার্ঘ কারপেটে মোড়া। সেই কার্পেটের ওপর কোথাও ঘাস এবং কোথাও কংক্রিট বসানো। এক অতি উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে এখানকার আকাশকে আরও একটু বেশি নীল করা হয়েছে। প্রাচ্যের সংবাদপত্রগুলো ঠিকই বলে, আমেরিকার মাধ্যাকর্ষণ বল কিছু কম। ফুরফুর করে হাঁটা যায়, কষ্ট হয় না। এখানকার বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণও বেশি। পানীয় জল জীবাণুমুক্ত এবং ভিটামিনযুক্ত।
