বেরিয়ে পড়লেন বিধুভূষণ। বেরিয়েই একটা ট্যাক্সি ধরলেন। পিছনের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে বললেন, ‘কলেজ স্ট্রিট–না, না, কলেজ রো…’
ট্যাক্সি দ্রুত চলল। হুহু করে হাওয়া লাগছিল বিধুভূষণের চোখে–মুখে। মুহূর্তেই ভাতঘুমটা ফিরে আসতে চাইছে টের পেয়ে যেন আধাস্বপ্নের ভিতর হাসলেন বিধুভূষণ। অনেক কিছুর শখ ছিল তাঁর। নিজের এমনি একটা গাড়ি থাকলে এমনি ঘুমিয়ে–ঘুমিয়ে অফিসে আসতে পারতেন তিনি, ঘুমিয়ে যেতেও পারতেন। না, কিছুই হয় না নিজের মনোমতো, কখনওই হয় না। কিন্তু কেন?
সামান্য চোখ খুলে তিনি বাইরের দিকটা দেখলেন। খানিকক্ষণ দেখেই চমকে উঠলেন তিনি –এ তো রেড রোড। আশ্চর্য! এ রাস্তায় তো তাঁর আসবার কথা নয়। ঝাঁঝিয়ে উঠলেন তিনি ‘এটা কী হল, অ ট্যাক্সি ড্রাইভার?’ ‘এটা তো রেড রোড…ধর্মতলা যে…’ ট্যাক্সিওয়ালা মুখ ঘোরাতেই খানিকটা থতমত খেয়ে আমতা-আমতা করে বিধুভূষণ বললেন, ‘ভুল স্যার…সবই ভুল…’ তিনি চোখ বুজে ফেললেন। কেন না ততক্ষণে ট্যাক্সি ড্রাইভারের বাঁ চোখের পাশে লালচে আঁচিলটা। দেখে ফেলেছেন, সেই পুলিশদের মতো ছোট করে ছাঁটা চুল, পরনে পাঞ্জাবি। আশ্চর্য! আর কিছুই দেখতে চাইলেন না বিধুভূষণ। শুধু আর-একবার বিড়বিড় করলেন ‘ভুল স্যার…’
ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে নিলে অনেকক্ষণ পর আর-একবার অতি সন্তর্পণে চোখ খুললেন বিধুভূষণ। টেলিভিশন তিনি কখনও দেখেননি। কিন্তু তাঁর হঠাৎ মনে হল সামনের উইন্ডস্ক্রিন। জুড়ে ছবি ভেসে উঠেছে, অচেনা পথঘাট, অচেনা গাছ, অদেখা বাড়ি–ঘর, লোকজন। এ কি বিদেশ! এত সহজে বিদেশ! এত অল্প সময়ে! না কি টেলিভিশন! মোটা ফরসা ম্যানেজারের কাঁধের পাশ দিয়ে কিছুক্ষণ সেই টেলিভিশন দেখে তিনি আর-একবার বলবার চেষ্টা করলেন ‘ভুল স্যার..সবই ভুল…’ম্যানেজার–এখন ড্রাইভার–তাঁকে লক্ষই করল না।
চোখ বুজে হঠাৎ পরম আরামে ঘুমিয়ে পড়লেন বিধুভূষণ।
কলেজ রো–তে নেমে ট্যাক্সি ভাড়া মিটিয়ে দিলেন তিনি। ভাড়াটা সরাসরি ম্যানেজারের হাতে দিতে একটু লজ্জা করছিল তাঁর। ম্যানেজার সেদিকে ক্ষেপও করল না, তাঁর দিকেও তাকাল না। এমন কি ভাড়ার এক টাকা কুড়ি পয়সা গুনেও নিল না। বিধুভূষণ বিনীতভাবে নমস্কার করলেন তাঁকে।
ট্যাক্সিটা চলে গেল। সেইদিকে চেয়ে রইলেন বিধুভূষণ। আশ্চর্য!
বাড়িতে ঢুকতেই একটা হইচই পড়ে গেল। বড় দুই ছেলেমেয়ে ছুটে এল, গিন্নি নেমে এলেন হাঁপাতে-হাঁপাতে, ‘কি গো, কী হয়েছে তোমার? শরীর–টরীর?
মৃদু হেসে বরাভয়ের ভঙ্গিতে হাত তুলে তাদের নিরস্ত করলেন বিধুভূষণ, ‘কিছু হয়নি।’
‘তাহলে অফিস?’
‘ছুটি হয়ে গেল আজ।’
‘কেন গো?’
হঠাৎ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বিধুভূষণ, ‘একজন কেরানি মারা গেল হঠাৎ। তাই..’ একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমাকে বিরক্ত কোরো না কেউ। আমি একটু ঘুমোব।’ বলে সিঁড়ি ভেঙে নিজের ঘরে এলেন বিধুভূষণ। সন্তর্পণে দরজা বন্ধ করে ছিটকিনি তুলে দিলেন।
কী করে, কোন পথে গেলে লোকটাকে এড়ানো যায়–তা বিধুভূষণ ভেবে পেলেন না। চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঘরে বসে থাকবেন! কিন্তু সেটা কেমন দেখাবে? তা ছাড়া তাঁর ছেলেমেয়েরাও বড় হয়নি–বুড়ো মা-বাবাকে টাকা পাঠাতে হয়–গিন্নিকে নিয়ে তাঁর সাধআহ্লাদ এখনও মেটেনি। কী করবেন বিধুভূষণ?
অনেক ভেবে–টেবে দেখলেন বিধুভূষণ। তাঁর মনে হল এ ব্যাপারটা কাউকে জানিয়ে দিলে হয়। কাকে জানাতে হবে তার কিছুই তিনি জানেন না। তবু আবছাভাবে তাঁর মনে হল এ ব্যাপারে একটা যুক্তিপূর্ণ অভিযোগ তিনি খাড়া করতে পারেন।
কিছুই জানেন না বিধুভূষণ কাকে জানাবেন কী জানাবেন–এবং কীভাবে জানাবেন–তবু তিনি গোটা দুই ফুলস্ক্যাপ কাগজ তাঁর ছেলের লম্বা খাতা থেকে ছিঁড়ে নিলেন। তারপর কলম বাগিয়ে বসলেন তিনি।
পাঠ লিখলেন : ‘মান্যবরেষু।’
তারপর লিখলেন : আমার একটি অভিযোগ আছে…
তারপর কী লিখবেন ভেবে না পেয়ে কলম কামড়ে ধরে জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কোথায় কী একটা গোলমাল রয়েছে, ষড়যন্ত্র রয়েছে যা কিছুতেই ধরতে পারছেন না তিনি। উঠে খানিকক্ষণ পায়চারি করলেন। আবার বসলেন, খানিকটা আঁকিবুকি করলেন কাগজটার ওপর। আরও কাগজ ছিড়লেন খাতা থেকে। তারপর টেবিলে মাথা রেখে আস্তে-আস্তে ঘুমিয়ে পড়লেন বিধুভূষণ।
ঘুম ভাঙল গিন্নির ডাকে। ধড়মড় করে উঠে দেখলেন অন্ধকার হয়ে এসেছে। দরজা খুলে দিতেই গিন্নি বললেন ‘এত ঘুম!’ বেঁকিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন বিধুভূষণ হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল। এতক্ষণ অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন তিনি। স্বপ্ন দেখেছেন যে একটা স্বপ্ন দেখে তাঁর ঘুম ভেঙে গেছে–কিন্তু আশ্চর্য হচ্ছে এই যে সেই ঘুম ভাঙাটাও আসলে স্বপ্নের ভিতরেই ঘটেছে–তারপর আরও একবার ঘুম ভাঙল, তাঁর মনে হল আগের জেগে ওঠাটাই স্বপ্ন ছিল। এইভাবে একটার–পর একটা স্বপ্ন ভাঙছিল তাঁর আরও মনে হচ্ছিল আগের স্বপ্নটাই ছিল স্বপ্ন, আগের ঘুমটাই ছিল ঘুম। স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন, তার ভিতরে স্বপ্ন এবং প্রতিটি স্বপ্নই ভেঙে যাওয়ার স্বপ্ন। এই ভাবে ঘুমের ভিতরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার স্বপ্ন এবং তারও ভিতরে ঘুম ভেঙে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে-দেখতে কতদূর তলিয়ে গিয়েছিলেন বিধুভূষণ? ভেবেই উত্তেজিত হলেন বিধুভূষণ। রক্তচাপ বেড়ে গেল। গিন্নিকে বললেন, ‘আমায় একটা রামচিমটি কাটো তো! প্রথম-প্রথম যেমন কাটতে!’
