‘কেন গো?’
‘বুঝতে পারছি না জেগে আছি কি না।’
‘আহা।’ গিন্নি বললেন।
‘দ্যাখো না!’
গিন্নি ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসিটা চমৎকার, দুপাশে দুটি ছোট-ছোট আক্কেল দাঁত দেখা যায়–এখনও বুকের ভিতর তোলপাড় করে ওঠে বিধুভূষণের। তিনি দুই ব্যগ্র হাত বাড়িয়ে দিতেই গিন্নি ছুটে পালালেন।
বিধুভূষণ হাই তুললেন। লাইট জ্বাললেন। তারপর চুপচাপ টেবিলের ওপর অভিযোগ পত্রটার দিকে তাকিয়ে রইলেন : ‘মান্যবরেষু, আমার একটি অভিযোগ আছে…’ ব্যস, আর কিছু লেখা নেই।
গিন্নি চা নিয়ে এলেন কিছুক্ষণ পর। চায়ের কাপটা রেখে সদ্য বাঁধা খোঁপাটা ঠিকঠাক করতে করতে হঠাৎ বললেন, ‘ওঃ, তোমায় বলতে ভুলে গেছি। তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে তখন তোমায় খুঁজতে একটা লোক এসেছিল।’
চায়ের কাপটা প্রায় উলটে ফেলে ঘুরে দাঁড়ালেন বিধুভূষণ, ‘কে?’
গিন্নি হেসে বললেন, ‘কে যেন চিনি না। একটা চিরকুট দিয়ে গেছে।’
‘কেমন চেহারা লোকটার?’ রুদ্ধশ্বাসে বললেন বিধুভূষণ।
‘তেমন লক্ষ করিনি তো! তবে বেশ সুন্দর চেহারা। ফরসা, মোটা–সোটা, ছোট করে ছাঁটা চুল।’
‘পুলিশদের মতো?’
‘না, পুলিশ–টুলিশ মনে হল না তো?’
‘আহা, পুলিশ কে বলছে! বলছি চুলটা কি পুলিশদের মতো?’
‘কী জানি বাপু!’ রসালো ঠোঁট উলটে বললেন গিন্নি। কিন্তু সেদিকে লক্ষ করলেন না বিধুভূষণ, জিগ্যেস করলেন, ‘বাঁ-চোখের পাশে একটা লালচে আঁচিল ছিল? মনে করে দ্যাখো তো?’
গিন্নি খানিকক্ষণ ভেবে বললেন, ‘ঠিক মনে পড়ছে না, তবে হতে পারে। চোখ দুটো যেন কেমন বাপু, এমন হাঁ করে দেখছিল। মনে হচ্ছিল কোথায় যেন…’
‘ম্যানেজার…’ প্রায় আর্তকণ্ঠে বললেন বিধুভূষণ।
‘কে? কার কথা বলছ!’
জবাব দিলেন না বিধুভূষণ, হঠাৎ দু-হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘কই দেখি!’
চমকে দু-হাত পিছিয়ে গেলেন, গিন্নি, বললেন, ‘কী চাইছ? তোমার লজ্জা শরম…’
‘আহা ওসব নয়, চিরকুটটা দেখি!’
‘ওঃ! যেন খানিকটা হতাশ হলেন গিন্নি। আঁচলের গেরো খুলে চিরকুটটা দিলেন বিধুভূষণের হাতে। চলে যেতে-যেতে প্রায় হতাশ অস্ফুট গলায় বললেন, ‘কী যে হয়েছে তোমার…’
চিরকুটটা খুলে স্তব্ধ হয়ে গেলেন বিধুভূষণ। ঝকঝকে টাইপ পরা ছোট্ট একটু চিঠি : ‘এতদ্বারা শ্ৰীবিধুভূষণ সরকারকে জানানো যাইতেছে যে আমরা তাহার অভিযোগপত্রটির প্রাপ্তি স্বীকার করিতেছি…’
তাড়াতাড়ি আবার টেবিল হাতড়ে দেখলেন বিধুভূষণ–অভিযোগপত্রটা তখনও লেখাই হয়নি, শুধু পাঠটুকু লেখা আছে: মান্যবরেষু, আমার একটি অভিযোগ আছে…।’
আস্তে-আস্তে আবছাভাবে বুঝলেন বিধুভূষণ–এই অদ্ভুত খানাতল্লাশি থেকে তাঁর কোনও রেহাই নেই। আবছাভাবে তিনি ম্যানেজারের পিছনের সেই কলকবজা, প্লাগ ও গুপ্ত প্লাগ পয়েন্ট, বেতার সংকেত ও টেলিভিশনের অর্থ ধরতে পারলেন।
হতাশভাবে বসে রইলেন বিধুভূষণ। না, তাঁর আর কিছুই করবার নেই।
ভেলা
বিশশো পঁচাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসের এক সকালে আচমকা কোকিলের ডাক শোনা গেল।
ধরিত্রী তার দুশো তলার ওপরকার ফ্ল্যাটের ঘরদোর পরিষ্কার করছিল। তার হাতে একটা টর্চের মতো ছোট যন্ত্র। সুইচ টিপলে যন্ত্র থেকে একটা অত্যন্ত ফিকে বেগুনি প্রায় অদৃশ্য রশ্মি বেরিয়ে আসে। সেই রশ্মি চারদিকে ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে ফেললেই ঘর পরিষ্কার হয়ে যায়, জীবাণু থাকে না। ঘর জীবাণুমুক্ত করার পর দেওয়ালে একটা সুইচ টিপল ধরিত্রী। কোনও শব্দ হল না, কিন্তু ছাদের গায়ে লাগানো মৌচাকের মতো একটা যন্ত্র জীবন্ত হয়ে উঠল ঠিকই। দুশো তলার ওপরে বদ্ধ ফ্ল্যাটে কোনও ধুলো বালি নেই। তবু ওই যন্ত্রটা তার প্রবল বায়বীয় প্রশ্বাসে ঘরের যাবতীয় সূক্ষ্ম ধুলো ময়লা টেনে নিতে লাগল।
এইসব ঘরের কাজ শেষ করে ধরিত্রী তাদের খাওয়ার ঘরে এল। খাওয়ার ঘরের উত্তরদিকে দুটো দরজা। একটা দরজা ধরিত্রী হাত দিয়ে ছোঁয়ামাত্র সরে গেল দেওয়ালের মধ্যে। ওপাশে অবিরল একটা কনভেয়ার বেল্ট বয়ে যাচ্ছে। খুব ধীর তার গতি। তার ওপর থরেথরে খাবার সাজানো। যা খুশি তুলে নেওয়া যায়। একরাশ ডিম চলে গেল, এক ঢিবি মাখন, কিছু আপেল একটার পর একটা। ধরিত্রী খুব বিরক্তির সঙ্গে চেয়ে রইল। অন্তহীন খাবার বয়ে যাচ্ছে, কিন্তু কোনওটাই তার ছুঁতে ইচ্ছে করল না। দরজাটা বন্ধ করে সে দ্বিতীয় দরজাটা খুলল। দরজার ওপাশে অগাধ শূন্যতা, দুশো তলার ওপর থেকে নীচে পর্যন্ত একটা ভারী বাতাস থম ধরে আছে। ধরিত্রী একটু ঝুঁকে চারদিকে তাকাল। জলে যেমন নৌকো ভাসে তেমনি বাতাসে ইতস্তত কিছু ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই বাতাসী ভেলার একটা খুব কাছ দিয়েই ভেসে যাচ্ছিল, তাতে এক বুড়ো হালের মতো একটা যন্ত্রের হাতল ধরে বসে আছে। লোকটা একবার ধরিত্রীর দিকে উদাস চোখে তাকাল। ধরিত্রী তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে।
লোকটা হাতলটায় সামান্য চাপ দিতেই ভেলাটা মুখ ঘুরিয়ে ভেসে এল ধরিত্রীর দিকে। ব্যাটারিচালিত ভেলাটায় কোনও শব্দ নেই। নিঃশব্দে স্থির হয়ে হালকা ধাতুর তৈরি সাদা গোল লাইফ বেল্টের মতো দেখতে যানটি দরজার গায়ে লেগে রইল।
বুড়ো লোকটা কথা বলল না, ধরিত্রীর দিকে চেয়ে একটু হাসল মাত্র। খুব নিরাবেগ হাসি।
ধরিত্রী বলল—আমার কিছু ফুল দরকার। আসল ফুল।
লোকটা মাথা নাড়ল। তারপর একটু ভারী গলায় বলল—কোন ঋতুর ফুল?
