‘স্যার…’ বিধুভূষণ প্রায় লিত কণ্ঠে বলবার চেষ্টা করলেন ‘বাসের সেই ব্যাপারটা।’
‘আপনাকে একটা অফিসিয়াল পরীক্ষাতেও পাশ করতে হবে।’ বিধুভূষণের কথায় কান না দিয়ে ম্যানেজার বললেন।
‘…ব্যাপারটার জন্য আমি দুঃখিত।’ বিধুভূষণ তাঁর কথা শেষ করেন।
‘কোন ব্যাপারটা?’ ভ্রূ কোঁচকালেন ম্যানেজার।
‘কলেজ স্ট্রিটে পৌনে দশটা–না, দশটা বাজতে সতেরো মিনিটের সময়…’
‘কী হয়েছিল?
বিধুভূষণ অসহায়ভাবে মেঝের কার্পেটের দিকে চোখ রেখে বললেন, ‘ব্যবহারটা খুবই খারাপ হয়েছিল স্যার–আমি স্বীকার করছি। আপনাকে চিনতে পারিনি!’
‘কখন? কোথায়?’
‘কলেজ স্ট্রিটে স্যার, পৌনে দশটায়না,দশটা বাজতে সতেরো মিনিটের সময়…’
‘পৌনে দশটা! কলেজ স্ট্রিট!’ ম্যানেজারকে খুব অন্যমনস্ক দেখাল, ‘কিন্তু আমি তো অনেক আগে অফিসে এসেছি! সাড়ে ন’টায়।’ বলেই সকৌতুকে বিধুভূষণের দিকে তাকিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হাসলেন ম্যানেজার, ‘আপনি আমাকে পেলেন কোথায়? আর আমার ফ্ল্যাট তো বালিগঞ্জে!’
বিধুভূষণ কথা খুঁজে পেলেন না। কিন্তু তাঁর মনে হচ্ছিল এর উত্তরে উপযুক্ত যে কথাগুলো বলা যায় সেগুলো তাঁর মাথার চারপাশে বাতাসের ভিতরে বিজবিজ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তারই দু-একটা ধরবার জন্য তিনি মাথা ঝাঁকালেন, কান চুলকোলেন, হাত দিয়ে মশা তাড়ানোর মতো বাতাসে ঝাঁপটা মারলেন। শেষপর্যন্ত তাঁর মুখ দিয়ে বেরোল, ‘ভুল স্যার…সবই ভুল…’
‘Crasy?’ হাসলেন ম্যানেজার, ‘কিন্তু ব্যাঙ্কিংটা ভুললে চলবে না। মনে থাকবে?
অসহায় বিধুভূষণ মাথা নাড়লেন–থাকবে।
‘আর দেখছি–আপনি আজ পঁচিশ মিনিট লেট!’ বলে সোনার চেনে বাঁধা গাড়ির চাবিটা বোঁ করে ঘোরালেন ম্যানেজার। বিধুভূষণের মনে পড়ল ম্যানেজারের গাড়ি আছে–অফিস থেকেই গাড়ি দেওয়া হয়। চাবিটা ঘোরাতে–ঘোরাতেই ম্যানেজার বললেন, ‘এরকম যেন আর না হয়।’
কি না হওয়ার জন্য বলেছেন ম্যানেজার, তা না বুঝেই বিধুভূষণ মাথা নাড়লেন–হবে না।
‘আপনি আসুন তাহলে…’ ম্যানেজার বললেন, তাঁর হাতে তখনও চাবিটা ঘুরছে, তিনি অস্ফুট গলায় বললেন, ‘পৌনে দশটা! কলেজ স্ট্রিট!’
বিধুভূষণ ফিরে আসছিলেন, কী একটা শব্দে পিছন ফিরে দেখলেন ম্যানেজারের হাত থেকে চাবিটা ছিটকে প্রথমে গ্লাসটপ টেবিলের ধারে লেগে মেঝের কার্পেটের ওপর পড়ে গেল। অন্যমনস্ক ম্যানেজার সেটা তুলতে নীচু হতেই ভীষণ চমকে উঠলেন বিধুভূষণ। তাঁর মনে হল ম্যানেজারের পিছন দিকটা কলকবজায় ভরা। রেডিওর পিছনের ঢাকনাটা খুলে ফেলল ভেতরটা যেমন দেখায়, অনেকটা তেমনি। মনে হল কোমরে একটা প্লাগ লাগানো আছে যার তার কোনও গুপ্ত প্লাগ পয়েন্ট পর্যন্ত গেছে! বিস্ময়ে ঘুরে দাঁড়ালেন বিধুভূষণ। এক পলকের ভুল সংশোধন করে ম্যানেজার আবার সোজা হয়ে বসেছেন তখন, গম্ভীর মুখ, চোখ অন্যমনস্ক। ধীরে বললেন, ‘আপনি আসুন।’
বিধুভূষণ কিছুই বললেন না। তাঁর মনে হল তিনি এক অদৃশ্য বেতার সংকেত পেলেন, ম্যানেজারের দূরমনস্ক চোখ যেন বলল , ‘কী করা যাবে বলুন, চাবিটা পড়ে গেছে–সুতরাং সেটা কুড়িয়ে নেওয়াই নিয়ম! একটা ভুল হয়ে গেছে–আপনি আমার কলকবজা দেখে ফেলেছেন। কিন্তু আমার কি করার ছিল?
বিধুভূষণ একটু ইতস্তত করলেন। কিন্তু ম্যানেজারের পিছন দিকটা আর দেখা গেল না। এবার উনি খুব সতর্ক। বিধুভূষণকে উঁকিঝুঁকি দিতে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার?
‘কিছুনা স্যার!’ বিধুভূষণ খানিকটা দুঃসাহসে ভর করে হাসলেন, ‘আপনার পিছনটা…’
‘আমার পিছনটা..! ম্যানেজার হাঁ করে বিধুভূষণকে দেখতে লাগলেন।
‘আজ্ঞে, আমি দেখে ফেলেছি!’ দুষ্টু ছেলের মতো মুখ করলেন বিধুভূষণ।
কী দেখেছেন?’ প্রশ্ন করলেন ম্যানেজার।
‘আপনার পিছনে…’বলতে গেলেন বিধুভূষণ।
প্রায় লাফিয়ে উঠলেন ম্যানেজার, ‘কী? কাঁকড়াবিছে? আরশোলা?’ উঠে দাঁড়ালেন ম্যানেজার।
বিধুভূষণ দেখলেন। না, কলকবজা কিছুই নেই। পাঞ্জাবির সাদা পিঠ দেখা যাচ্ছে। এ কি চোখে দেখবার ভুল। নিজের চোখ কচলালেন বিধুভূষণ। কোনওক্রমে বললেন, ‘ভুল স্যার…সবই ভুল…’
মুহূর্তেই ম্যানেজারের ফরসা মুখ রাঙা হয়ে গেল। তিনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। দু-হাতে পাঞ্জাবির পিছন দিকটা ঝাড়বার চেষ্টা করেছিলেন। হঠাৎ বিধুভূষণের কথা শুনে তিনি যেন আরশোলা বা কাঁকড়াবিছে খুঁজে না পেয়ে ভয়ংকর রেগে গিয়ে বললেন, ‘নাউ গেট ইওরসেলফ আউট! ইউ…ইউ…!’
বিধুভূষণ নিঃশব্দে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলেন। আসতে-আসতে শুনলেন ম্যানেজার চাপা রাগের গলায় বলছেন, ‘কলেজ স্ট্রিট…পৌনে দশটা…আমার পিছনটা…কাঁকড়াবিছে…আরশোলা! এর মানে কী?’
‘ভুল…স্যার…সবই ভুল…’ বিধুভূষণ মনে-মনে বললেন। বাইরে এসে করিডোর ধরে এগিয়ে গেলেন তিনি। চাকরিটা বোধহয় আর রাখা গেল না। কিন্তু কেন? কেন? কোথায় ভুল হচ্ছে।
নিজের সিটে এসে বসবার কিছুক্ষণ পরেই সেকশন ইনচার্জ-এর একটা চিরকুট পেলেন বিধুভূষণ। তাতে লেখা : ‘ম্যানেজারের আদেশ মতো আপনাকে জানানো হচ্ছে যে, ম্যানেজার মনে করেন আপনি আজ খুব সুস্থ নন। আপনাকে অফিস ছেড়ে যাওয়ার এবং বিশ্রাম নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। আজ এখন আপনার ছুটি।’ নীচে অস্পষ্ট সই। তার নীচে লেখা ‘সেকশন ইনচার্জ।’
মুহূর্তেই খুশি হয়ে উঠলেন বিধুভূষণ। গত আঠারো বছর চাকরিতে এই প্রথম তিনি একা ওপরওয়ালার ইচ্ছেয় ছুটি পেয়েছেন। কাউকে কিছু বললেন না বিধুভূষণ, চক্রবর্তীকেও না। তাড়াতাড়ি ফাইলে কাগজপত্র বেঁধে–হেঁদে রাখলেন। আশ্চর্য! তাঁর বিশ্রাম দরকার! কথাটা তাঁর নিজেরও অনেকবার মনে হয়েছে। আশ্চর্য!
