তাহলে এসব কী হচ্ছে! বিধুভূষণ চোখ বুজে ভেবে দেখবার চেষ্টা করলেন। ছেলেবেলায়। লজিকে চান্স আর প্রব্যাবিলিটির যে কথা পড়েছিলেন তা মনে করবার চেষ্টা করে দেখলেন। কিছুই মনে পড়ল না। একবার সন্তর্পণে চোখ খুলে দেখলেন লোকটা তেমনি অন্যমনস্ক, বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। বিধুভূষণ যে পাশে আছেন তা জানে বলে মনে হল না। বিধুভূষণ লক্ষ করলেন লোকটার মুখের বাঁ-পাশেঠিক চোখের কাছেই একটা লালচে আঁচিল রয়েছে।
তারপর ময়দানের খোলা হাওয়া লাগতেই বিধুভূষণের একটু ঢুলুনি এল। বারকয়েক ঝুঁকে পড়ল মাথা। নিজেকে এইভাবে ঘুমিয়ে নিতে দেন তিনি! জানেন, ঠিক স্টপেজে গাড়ি থামলেই তাঁর ঘুম ভেঙে যাবে। এই কোনওদিন অন্যথা হয়নি। এর সঙ্গে পাভলভের কন্ডিশনড রিফ্লেক্সের কোনও সম্পর্ক আছে কি না তা বিধুভূষণ ভেবে দেখেননি। কন্ডিশনড রিফ্লেক্সের কথা আবছাভাবে শুনেছেন তিনি। একটা কুকুরকে নিয়ে এই ধরনের পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। কিন্তু পৃথিবীর কোনও কুকুরের সঙ্গেই আজ পর্যন্ত তিনি নিজের সাযুজ্য খুঁজে পাননি।
আজও ঠিক স্টপেজে ঘুম ভাঙল এবং বিধুভূষণ ভাতঘুম থেকে জেগে উঠে আজকের যাবতীয় ঘটনার কথা ভুলে গিয়ে অফিসের দিকে হাঁটতে লাগলেন। ঘাড়ে মাথায় ময়দানের খোলা বাতাস লাগছিল। ভারী খুশি হয়ে উঠলেন তিনি।
অফিসে গিয়েই তিনি একগ্লাস জল খান। আজও খেলেন। হাজিরা খাতায় সই করলেন হাতঘড়ি দেখে। ঠিক পঁচিশ মিনিট লেট! তাই লিখে দিলেন। তারপর চক্রবর্তীর মুখোমুখি একই টেবিলে বসলেন বিধুভূষণ। চক্রবর্তী মাথা গুঁজে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে একটা ফাইল খুলে দেখছিল যা সে কখনও করে না। চক্রবর্তী মুখ তুলেই খুব নীচু গলায় বলল , ‘আজই লেট করলেন!’
‘কেন! আজ কী!’ জিগ্যেস করেন বিধুভূষণ।
‘আজ নতুন ম্যানেজার চার্জ নিয়েছে যে! বম্বে অফিসের লোক একটু কড়া ধাতের।’
হাসলেন বিধুভূষণ। সে হাসিতে আত্মপ্রত্যয় ছিল–চক্রবর্তী আড়চোখে দেখল।
দিনটা যেমন খারাপ যাবে বলে প্রথমটায় মনে হয়েছিল বিধুভূষণের তেমনটা হল না। লাঞ্চ পর্যন্ত বেশ কেটে গেল। বাকিটাও যাবে–এই ভেবে তিনি দুটি কলা দু-খানা বিস্কুট ও এক কাপ চায়ের টিফিন সেরে এসে চেয়ারে বসতেই বেয়ারা একটা চিরকুট নিয়ে এল। তাতে লেখা ‘ব্যাপারটা জরুরি। তাড়াতাড়ি আসুন।’ নীচে অস্পষ্ট সই। তার নীচে লেখা–’ম্যানেজার।’ একটু ভড়কে গেলেন বিধুভূষণ। গত আঠারো বছরে তিনি তিনবার মাত্র ম্যানেজারের ঘরে গিয়ে তাঁর। মুখোমুখি হয়েছেন–তার মধ্যেও প্রথমবার সেই ইন্টারভিউয়ের সময়। দেখলেন চিরকুটটিতে সই ছাড়া আর বাদবাকি অংশ সুন্দর ঝরঝরে টাইপ করা। বুঝলেন–নতুন ম্যানেজার কাজের লোক কোনও বিষয় অস্পষ্ট রাখতে চান না। বেয়ারার মুখে সেলাম পাঠালেও হত–কিন্তু তা তিনি করেননি।
বিধুভূষণ কাউকে কিছু বললেন না। ব্যাপারটা গোপন রেখে তিনি দোতলা থেকে তিনতলায় উঠে এলেন। তিনতলায় মাত্র দুখানা ঘর–একখানা কমিটি রুম, অন্যটি ম্যানেজারের। দুটিই এয়ারকন্ডিশন করা–করিডোরে দাঁড়িয়েও সেই ঠান্ডা ভাব টের পাওয়া যায়। বিধুভূষণের প্রায় শীত ধরে গেল।
নিজের নামধাম লিখে একটা চিরকুট ভিতরে পাঠানোর পরও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। দুজন লোকসুটপরা–ম্যানেজারের ঘর থেকে বেরিয়ে আসবার পর তাঁর ডাক পড়ল। বিধুভূষণ প্রকাণ্ড দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকলেন। দরজাটা তাঁর পিছনে আবার নিঃশব্দে বন্ধ হয়ে গেল।
সবকিছুই প্রকাণ্ড দেখলেন বিধুভূষণ। প্রকাণ্ড জানলা, প্রকাণ্ড শেলফ, প্রকাণ্ড টেবিল–সবকিছুই খুব চকচকে ঝকঝকে। দেখলেন আরও অনেক আসবাব রয়েছে যার নাম তাঁর জানা নেই। এত কিছুর ভিতরে লোকটাকে চোখেই পড়ে না।
লোকটা–নতুন ম্যানেজার–কিন্তু মুখ তুলল না, বিধুভূষণের নামধাম লেখা চিরকুটটার দিকে চোখ রেখে বলল , ‘আপনি ব্যাঙ্কিংয়ের কিছু জানেন?’
বিধুভূষণকে কেউ একবার শূন্যে তুলেই নামিয়ে দিল–কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তার ওজনটা চুরি করে নিল। নিজেকে খুব হালকা অনুভব করলেন বিধুভূষণ–পাছে পাখার বাতাসে উড়ে যান সেই ভয়ে সামনের চেয়ারে পিছনটা চেপে ধরতেই তাঁর খেয়াল হল–এই ঘরে পাখা নেই।
চেয়ারটা চেপে ধরতে গেলে কোনও শব্দ হয়ে থাকবে। ম্যানেজার তাঁর অন্যমনস্ক চোখ তুলে বিধুভূষণকে দেখলেন। আবার একে না-দেখাও বলা যায়। সে দৃষ্টি বিধুভূষণকে ভেদ করে গেল। কোনওখানে বাধা পেল না। কিন্তু বিধুভূষণ দেখলেন বাঁ-চোখের পাশে সেই লালচে আঁচিল–মাথার চুল পুলিশদের মতো ছোট করে ছাঁটা, চর্বির পাহাড়। কী করে সম্ভব হল! আশ্চর্য!
‘স্যার…!’ বিধুভূষণ বললেন।
‘আমাদের কাজের সঙ্গে ব্যাঙ্কিংয়ের যোগাযোগ বেশি। আমার মনে হয়, আপনার ব্যাঙ্কিংটা শিখে নিতে হবে।’ ম্যানেজার বললেন, ‘আপনার বয়স কত?
‘আজ্ঞে?’ বিধুভূষণ কোনওরকমে মাথা ঠিক রেখে বললেন, ‘তেতাল্লিশ।’
‘তা এমন আর বেশি কী? এই বয়সেও অনেকে শেখে।’ ম্যানেজারকে একটু চিন্তিত দেখাল, ‘কিন্তু আপনাকে আরও বুড়ো দেখায়। ধরুন পঞ্চাশ টঞ্চাশ!’ একটু হাসলেন ম্যানেজার
সার্টিফিকেটের বয়স তা হলে তেতাল্লিশ?’
‘মানে, আমার আসল বয়সও…’
“ঠিক আছে।’ হাত তুলে বিধুভূষণকে থামালেন ম্যানেজার ‘কয়েকটা বই আপনাকে পড়তে হবে।’ ম্যানেজার খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। বিধুভূষণকে দেখেও দেখলেন না। কিন্তু চোখ দুটো বিধুভূষণের দিকেই রাখা আছে।
