রাস্তা গিলতে গিলতে দোতলা বাসগুলো একটার–পর–একটা আসছিল। বিধুভূষণ সকলের মতো হাত তুলছিলেন, কিন্তু অতিরিক্ত বোঝাই ছিল বলে বাসগুলো থামল না। ড্রাইভার হাত নেড়ে পরের বাস–এ ইঙ্গিত করে গেল। এইভাবে পরপর তিনবার।
বিধুভূষণ একবার আড়চোখে দেখে নিলেন এখানকার পুরোনো বাসস্টপটা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে কি না। না, সেরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি। হাতে সময় ছিল। তিনি নিশ্চিন্তভাবে অপেক্ষা। করতে লাগলেন।
অবশেষে একটা বাস থামল। ‘নামতে দিন আগে–’ হাঁকল কন্ডাক্টর। সে দিকে কান না দিয়ে বিধুভূষণ সকলের সঙ্গে একজোটে ঢেউয়ের মতো ঝাঁপ খেলেন। কে নামল, কে উঠল তা তিনি বুঝলেন না, কিন্তু বাসটা ছেড়ে দেওয়ার পর বুঝলেন যে, তিনি উঠতে পারেননি। দু তিনজন লোক হইহই করে বাসটার পিছনে ছুটল। তিনি সেরকম কিছু না করে সতর্কভাবে হাত ঘড়ি, চশমা, মানিব্যাগ ঠিকঠাক আছে কি না দেখে নিয়ে শান্তভাবে অপেক্ষা করতে লাগলেন। আবছাভাবে তাঁর মনে হল একটা মোটা মতো লোক তাঁর সামনে পা–দানিটা আড়াল করেছিল–নইলে তিনি উঠতে পারতেন।
পরের বাসটাও এসে থামল। ‘নামতে দিন আগে–’ কন্ডাক্টর হাঁকল। সকলে ঢেউয়ের মতো ঝাঁপ খেল। সেই ভিড়ে বিধুভূষণ ইঁদুরের মতো দ্রুত চেষ্টায় একটা গর্ত খুঁড়ে নিলেন। এবারে হ্যান্ডেলটা ধরতে পারলেন তিনি। কিন্তু পা–দানিতে পা রাখতে পারলেন না। বাসটা ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি হ্যান্ডেল ছাড়লেন এবং বুঝলেন এবারও তিনি উঠতে পারেননি। এবারও তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন, কেন না এখনও সতেরো মিনিট সময় আছে। কিন্তু এবার তাঁর স্পষ্ট মনে হল একটা মোটামতো লোক–পাঞ্জাবি–পরা, ঘাড়ের চুল পুলিশদের মতো ছোট করে ছাঁটা–তাঁর পথ আটকে ছিল। তিনি দু-একবার চোখ বুলিয়ে লোকটাকে খুঁজলেন, সম্ভবত লোকটা উঠে গেছে। তিনি বিরক্তিকর ভিড় থেকে চোখ তুলে ল্যাম্পপোস্টে লটকানে চৌকো বাক্সের গায়ে একটা সিনেমার পোস্টার দেখতে লাগলেন। ‘এই তো আমাদের জাতীয় চরিত্র’–ভাবলেন তিনি–’মানুষের পথ আটকে রাখা, নিজে উঠে যাওয়া–এই সব।’
পরের বাসটা আসতে দেখে এবার সর্তক হলেন। এ বাসটাও থামল। ‘নামতে দিন আগে’–হাঁক কন্ডাক্টর। এবার তিনি ঢেউয়ে গা ছাড়লেন না। আগে থেকে সতর্ক ছিলেন বলে শক্ত থেকে কৌশলে তিনি হ্যান্ডেল ধরলেন। বারবার তিনবার। এইবার তিনি পাদানিতে পা রাখলেন।
কিন্তু নিয়তি। টের পেলেন কে যেন পিছন থেকে তাঁর কোমর ধরেছে। লোকটা টাল খাচ্ছে–তার নিশ্বাস বিধুভূষণের ঘাড়ের ওপর পড়ছিল। ‘আমি পড়ে যাচ্ছি যে, ও মশাই’ বিধুভূষণ। আর্তকণ্ঠে বললেন–’আমার কোমরটা ছেড়ে দিন।’ বিধুভূষণকে অবশেষে নামতে হয়। লোকটাই টেনে নামায় তাঁকে।
কখনও যা করেন না-এমনিতেই ভিতু, শান্তপ্রকৃতির বিধুভূষণ হঠাৎ তাই করলেন। ‘এটা কী হল?’ বলে লোকটার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দেখলেন এই সেই লোক–পরনে পাঞ্জাবি, মাথার চুল পুলিশের মতো ছোট করে ছাঁটা–চর্বির পাহাড়। কোনও উত্তর দিল না লোকটা বিধুভূষণের দিকে চেয়েও দেখল না। অলসভাবে পান চিবোচ্ছিল। আধখোলা চোখ দুটো দেখে হঠাৎ মনে হয় লোকটা ঘুমিয়ে আছে।
এত রেগে গিয়েছিলেন বিধুভূষণ যে, তিনি তার পুরোনো হাঁপানির চাপটা অনুভব করলেন। তাঁর গলা আটকে আসছিল এবং হাত পা কাঁপছিল। মনে পড়ল তাঁর প্রেসার সম্প্রতি দু-শোর খুব কাছাকাছি গিয়েছিল–কোনওরকম উত্তেজনা ডাক্তারের বারণ। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে বিধুভূষণ ঠান্ডা হয়ে গেলেন। রাস্তাঘাটে হাঙ্গামা উত্তেজনা তিনি সব সময়ে এড়িয়ে চলেন–তা ছাড়া তাঁর ভয় আছে হঠাৎ করোনারি অ্যাটাক হতে পারে। দুম করে মরে যেতে তিনি চান না।
বিধুভূষণ সরে এলেন। লোকটার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে তিনি দাঁড়িয়ে দেখলেন পরপর তিনখানা একই নম্বরের বাস আসছে। তিনি সাবধানে লোকটাকে দূর থেকে একবার দেখে নিলেন। আশ্চর্য! বিধুভূষণের মনে হল তাঁর কোনও কথাই লোকটার কানে যায়নি। লোকটা বিধুভূষণ যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেদিকে তাকাল–কিন্তু বিধুভূষণকে দেখল বলে মনে হল না। যেন বিধুভূষণের দেহ ভেদ করে লোকটার দৃষ্টি সরে গেল। কোথাও বাধা পেল না। নির্বিকার লোকটির দিকে বিধুভূষণ তাকিয়ে রইলেন, আশ্চর্য!
তৃতীয় বাসটাতে জায়গা পেলেন বিধুভূষণ। যদিও ঠেলাঠেলি ভিড় ছিল তবু ভিতরে ঢুকতে পারলেন এবং রড ধরে দাঁড়ালেন। তাঁর অফিস পার্কস্ট্রিটে, ডালহৌসিতে বাসটা খালি হয়ে গেলে পার্কস্ট্রিট পর্যন্ত বসে যাওয়া যাবে। ঘড়ি দেখলেন বিধুভূষণ–প্রায় কুড়ি মিনিট কিংবা তারও কিছু বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। তা হোক! আঠারো বছরের পুরোনো পোষা। চাকরি তাঁর–এটুকু খাতির তিনি পেতে পারেন–পানও।
ডালহৌসিতে বাসটা খালি হতে শুরু করল। ঠিক বিধুভূষণের সামনের সিট থেকে দুজনেই উঠে গেল–তাদের যাওয়ার জায়গাটা করে দিতে গিয়ে একটু কাত হলেন বিধুভূষণ। জানলার ধারের সিট বিধুভূষণের প্রিয়। লোকদুটো বেরিয়ে যাওয়া এবং বিধুভূষণের বসবার চেষ্টা করার ভিতরে যেটুকু সময়ের এবং দুরত্বের ব্যবধান ছিল তারই এক ফাঁক দিয়ে কী করে যে তা বিধুভূষণ বুঝলেন না-একটা মোটা মতো লোক ঢুকে গেল এবং জানলার ধারে বসে পড়ল। বিধুভূষণ তাকিয়ে দু-চোখকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। আশ্চর্য! এ সেই লোকটা মোটামতো, পাঞ্জাবি পরা ঘাড়ের চুল পুলিশদের মতো ছোট করে ছাঁটা! মুহূর্তেই অন্যমনস্ক হয়ে গেল লোকটা, জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল, বিধুভূষণের দিকে ফিরেই তাকাল না। কার পাছার ধাক্কা খেয়ে বিধুভূষণ লোকটার পাশেই বসে পড়লেন।
