অনেক উঁচু থেকেই সে একতলা আর দোতলার মাঝামাঝি যেখানে সিঁড়িটা বাঁক নিয়েছে, সেখানে সিঁড়ির রেলিঙে হেলান দিয়ে রাপার গায়ে একটা লোক দাঁড়িয়ে। মাথা মুখ ঢাকা, তলায় ময়লা ধুতি দেখা যাচ্ছে। বোধহয় ভিখিরি।
আস্তে-আস্তে নামছিল দীপ্তিময়। গত সপ্তাহে তার রক্তের চাপ বেড়েছিল। এই অল্প বয়সেই এতটা হওয়ার কথা নয়। ডাক্তার তার খাওয়া–দাওয়ার চার্ট তৈরি করে দিয়ে গেছে। পরিশ্রম কম করতে বলে গেছে। দীপ্তিময় একটু হাসে। তার হাওড়ায় লোহার কারখানার স্ট্রাইক চলছে, সাপ্লাইয়ের ব্যাবসাতেও একটু মন্দা, তিন-চারটে সরকারি কন্ট্রাক্টের জন্যও তাকে ঘুরতে হচ্ছে খুব। বিশ্রামের উপায় নেই। সে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নামে, মাথাটা একটু ঘোরে। সে রেলিঙে হাত রেখে নামতে থাকে। দূর থেকে অন্যমনে দেখে একতলা আর দোতলার মাঝখানে সিঁড়িতে হেলান দিয়ে কালো রং্যাপার মুড়ি দিয়ে একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে-মাঝে দীপ্তিময়ের মনে হয় এত লোভ বুঝি ভালো নয়। সে যথেষ্ট রোজগার করেছে, এবার অন্যদের জন্য ব্যাবসা ছেড়ে দেওয়া যাক, একটু বেড়িয়ে আসা যাক বাইরে কোথাও, মানুষের সঙ্গে আরও একটু মেশা যাক। তারপরই মনে পড়ে কলকাতায় কেনা জমিটার ওপর চমৎকার একটা ফ্ল্যাটবাড়ি তুলতে হবে। প্রতি ফ্ল্যাটের ভাড়া হবে ছশো থেকে হাজার। কিংবা এমনি আরও চিন্তা। তখনই সব ছেড়ে দেওয়ার নামে বুক কেঁপে ওঠে। না, যথেষ্ট হয়নি, একেবারেই যথেষ্ট হয়নি। আরও অনেক কিছু করার আছে… নামতে–নামতে সে দেখতে পায় ভিখিরির মতো লোকটা একতলা আর দোতলার মাঝখানে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। সে নামতে থাকে। তিনতলা থেকে দোতলায় নেমে আসে। থেমে একটা সিগারেট ধরায়… সামনের মাসের প্রথম দিকেই গাড়িটা পাওয়া যাবে। বিদেশি গাড়ি, চল্লিশ হাজার দাম পড়ল। লম্বা একটা ট্যুর দিতে হবে এবার। চলে যাবে দেওঘর, রাঁচি, হাজারিবাগ, পরেশনাথ। সঙ্গে থাকবে রমা, পিন্টু আর বুবুন। বাড়িতে থাকার জন্য কাউকে এনে রাখতে হবে…সে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে। তিন-চার ধাপ ওপর থেকে সে দেখে লোকটা রেলিঙে হেলান দিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। কালো র্যাপারে তার মাথা মুখ শরীর ঢাকা, নীচে ময়লা ধুতি, আর পায়ে লাল রঙের কেডস দেখা যাচ্ছে। এই এজমালি অফিস বাড়িটায় সারাদিন উমেদার, ফড়ে দালালদের যাতায়াত, আর ভিখিরি। দীপ্তিময় চত্বরে নেমে অন্যমনে লোকটাকে পেরিয়ে গেল। তার গাড়িটার কথাই ভাবছিল সে। চমৎকার আকাশি নীল রং…
‘দীপ্তিময়!’ গম্ভীর গলায় কাছ থেকে কে যেন ডাকল।
চমকে ঘুরে দাঁড়াল দীপ্তিময়, কালো রং্যাপার মোড়া সেই লোকটা। ঘোমটার মধ্যে তার মুখ। ভালো বোঝা যায় না। অস্পষ্টভাবে দেখা যায় লোকটা অনেকদিন দাড়ি কামায়নি। তার বুকের মধ্যে ধক করে ওঠে। যদিও আবছা, ঢাকা মুখখানা ভালো বোঝা যায় না, তবু মনে হয় এ মুখ সে যেন কবে কোন বাল্যে বা কৈশোরে বহুবার দেখেছিল। স্পষ্ট মনে নেই। তবু মনে পড়ে।
সামান্যক্ষণের জন্য দুজনেই স্থির রইল। তারপর শীর্ণ বাঁ হাতখানা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে লোকটা এগিয়ে এল। বাড়ানো হাতখানার দিকে অর্থহীন অবুঝ চোখে চেয়ে ছিল দীপ্তিময়, হঠাৎ দেখল চাদরের তলা থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বেরিয়ে এল লোকটার ডানহাত। খুবই অবাক হল দীপ্তিময়। সে বড়-বড় চোখ করে দেখতে পেল লোকটা তার পেটের মধ্যে একটা ছোট্ট সুন্দর ঝকঝকে ছোরা ঢুকিয়ে দিল।
‘আঃক’ বলে দীপ্তিময় হেঁচকি ভোলার মতো একটা শব্দ করল। পরমুহূর্তেই সে ‘এটা কী? এটা কেন?’ বলে চিৎকার করতে চাইল–পারল না, বোবার শব্দের মতো সে কয়েকটা অর্থহীন শব্দ করল। দেখতে পেল ছোরার হাতলখানা তার পেটের ওপর উঁচু হয়ে আছে।…প্রথমে দেওয়ালে হেলান দেওয়ার চেষ্টা করল দীপ্তিময়…ভয়ঙ্কর বমির ভাব টের পেল…পেটের ওজন…খুব ওজন…দেওয়ালে হেলানো তার শরীর আস্তে-আস্তে গড়িয়ে পড়ল সিঁড়িতে। শূন্য চোখে দেখল কোথাও সেই কালো চাদরে ঢাকা লোকটা নেই। চলে গেছে।…যেন হঠাৎ নিজের শব্দ করার ক্ষমতা সে ফিরে পেল, চিৎকার করল ‘রমা–আ, মা–আ…।’ দেখল তোক ছুটে আসছে ওপর থেকে নীচে থেকে। পায়ের শব্দ…ভয়ে সে চোখ বোজে। ছোরার হাতলখানা উঁচু হয়ে আছে…সে টের পায় তাকে ভোলা হচ্ছে…বোধহয় একটা গাড়িতে…লোকজন চেঁচাচ্ছে…পেটের ওপর একটা ভার… একটা ওজন…নোনতা স্বাদের বমি উঠে আসছে মুখে…তার পরেই দীপ্তিময়। দেখে বাগান আলো করে সবুজ রং…তার নিজের বাড়ি…। যদিও অর্থহীন তবু তার এলোমেলোভাবে মনে হয় সে পৃথিবী থেকে আলাদা করে তার জমি নিয়ে নিচ্ছে তুলে, দিচ্ছে। ঘেরা পাঁচিল…পাঁচিলের ওপাশে এক অচেনা জগৎ…চালের ওপর বসে দেখতে পায় বাইরের অচেনা অনাত্মীয় মানুষেরা হেঁটে যাচ্ছে…ওরা তার কেউ নয়…হিংসেয় মানুষের বুকে পাথর কেটে যাচ্ছে দীপ্তিময় কেন সুখে থাকবে? দীপ্তিময় চিৎকার করে বলতে চায় কেন আমি সুখে থাকব না? …মনে পড়ে সে কারও জন্য কিছু করেনি। নিজের ঘর তৈরি করেছে কেবল…জগৎ বড় পর হয়ে আছে…অচেনা হয়ে আছে মানুষ…অনাত্মীয়…যোগাযোগ নেই…যোগাযোগ নেই…কেবল রমা, কেবল বুবুন, পিন্টু…আর সে নিজে…আমি, আমি আর আমি… আস্তে-আস্তে দীপ্তিময় ঘুমিয়ে পড়তে থাকে…কে যেন তাকে মারল…কেন মারল? …বস্তুত। কিছুই তো আর সে নিজের মতো নিতে পারল না…না ঘর, বাড়ি, বাগান…গাড়িতে চড়া হল না একবারও…ঘেরা পাঁচিলের ঘেরা পোক্ত বাড়ি তবু নিরাপদ নয়…চারদিক থেকে সাপের মতো অভিশাপ এসে বিষ ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে…না নিরাপদ নয়…সে রমাকে সাবধান করে দেয়–সাবধান, রমা, খুব সাবধান, সদর খুলো না, কাউকে ঢুকতে দিও না…বলে আর দেখে পাঁচিল টপকে চোর ঢুকেছে…সদর ভাঙছে ডাকাত…বলছে ভাগ করে খেতে হয়। তুমি অনেক কেড়ে খেয়েছ…হাল ছেড়ে দেয় দীপ্তিময়।…দেখে তার সেই নীল সুন্দর গাড়িখানা লম্বা ট্যুরে পাড়ি দিচ্ছে। জানালায় তার মুখ তাকেই বিদায় জানাচ্ছে। দীপ্তিময় চেয়ে থাকে…
ভুল
আগস্ট মাসের এক সকালবেলায় বিধুভূষণ নামক চল্লিশ–পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সের এক ভ ভদ্রলোক অফিসে যাওয়ার জন্য কলেজ স্ট্রিটের এক বাসস্টপে দাঁড়িয়েছিলেন।
