চায়ের কাপ তুলে নিল হরেন গাঙ্গুলি, বলল আমি এভাবে এসেছি বলে তুমি বোধ হয় খুশি হওনি, তাই না?’
দীপ্তিময় চুপ করে থাকে। তারপর এক সময়ে বলে–’আপনি অনেক দূর থেকে এসেছেন, আপনাকে আমি কিছু ভিক্ষে দেব। তবে…’
কথা শেষ করার আগেই হরেন গাঙ্গুলি দ্রুত চায়ের কাপটা রেখে সোজা হয়ে বসে দীপ্তিময়ের দিকে কঠিন চোখে তাকাল, ‘ভিক্ষে দেবে?’
দীপ্তিময় অবাক হয়ে বলল –’আপনিই তো তা চাইলেন।’
‘আমি ভিক্ষে চাইব ঠিকই। আমার দিক থেকে ওটা ভিক্ষেই। কিন্তু তুমি ভিক্ষে হিসেবে দেবে কেন?’
উত্তরটার অর্থ ভালোবুঝল নাদীপ্তিময়, কিন্তু যথেষ্ট রেগে গেল, ‘একে ভিক্ষে ছাড়া কী বলে?’
ঘরে আর শেষবেলার লাল আলো ছিল না। তবু দীপ্তিময় দেখল লোকটার চোখে অস্তসূর্যের লাল আভা। চোয়াল শক্ত হয়ে এসেছে লোকটার, তবু শান্ত গলায় বলল , ‘ভগবান তোমাকে অনেক দিয়েছেন। জীবনে তুমি স্বার্থত্যাগ কমই করেছ, কেবল নিজের জন্যই তুমি উপার্জন করেছ, হয়তো তার সবটাই সৎ উপায়ে নয়। তোমার কাছ থেকে আর একটু বিনয় এবং শ্রদ্ধা আশা করেছিলাম। দরিদ্র দেশে তুমি সুখে আছ কিন্তু তোমার সেজন্য কোনও লজ্জা নেই কেন! আমি ভিক্ষে চাইলাম বলে তুমি ভিক্ষেই দেবে?
প্রথমটায় স্তম্ভিত হয়ে গেল দীপ্তিময়। লোকটার চেহারা, আচরণ খুব সামান্য একটু পালটে গেছে, কিন্তু তাতেই তার শরীরে আগুন ধরে গেল। সে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল, ‘গেট আউট! গেট আউট!’
হরেন গাঙ্গুলি কুটিল একটু হেসে উঠে দাঁড়াল, ‘যদি কখনও লোকে তোমার বুকে ছোরা ধরে যথাসর্বস্ব চায়, তখন এই মেজাজ দেখিও বাপু।’
হরেন গাঙ্গুলি আর ফিরে তাকাল না। মাথা উঁচু রেখে বেরিয়ে গেল।
.
দীপ্তিময় ব্যাপারটাকে মন থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করল অনেকক্ষণ। পারল না। একটা উটকো লোক, ভিখিরি, বাড়ি বয়ে এসে তাকে যা খুশি বলে গেছে–এ চিন্তা তার সুখ নষ্ট করে দিচ্ছিল। রমাকে ডেকে সে সাবধান করে দিল, ‘আমি না থাকলে কোনও অচেনা লোককে ঘরে ঢুকতে দেবে না।’ বলার দরকার ছিল না, রমা বুঝেই নিয়েছিল। সে কিছু জিগ্যেস করল না দীপ্তিময়কে। কেবল ঘাড় নাড়ল।
রাতে মা যখন ভিতরের হলঘরের এক কোণে বসে খই দুধ খাচ্ছে, তখন দীপ্তিময়ের কী খেয়াল হল, মাকে গিয়ে জিগ্যেস করল–’মা, হরেন গাঙ্গুলি বলে কাউকে চিনতে?’
ঘোমটার ভিতর থেকে মা বোকা চোখে তাকাল, বলল –’কে?’
‘হরেন গাঙ্গুলি। স্বদেশিকরত, ঢাকায়।’
খানিকক্ষণ চেয়ে রইল মা, তারপর হঠাৎ বলল ‘নাটকা? হরেন তো আমাদের সনাতন পণ্ডিতের ছেলে নাটকা।’
নাটকা শুনে দীপ্তিময় একটু চমকে গেল।
মা ঘাড় নাড়ে, ‘নাটকা ছিল ডাকাত। স্বদেশি ডাকাত। বোমা বন্দুক নিয়ে ঘুরে বেড়াত। খুব গুন্ডা ছিল। রতনের সঙ্গে পড়ত। খুন করে জেলে যায়। বেরিয়ে আবার ডাকাতি করত।’
‘লোকটা ভালো ছিল না, না?’
‘এমনিতে ভালো। তবে রাগলে খুব ভয়ঙ্কর! ওর বাবাও ছিল ওইরকম। সনাতন পণ্ডিতকেও কারা যেন খুন করেছিল বিক্রমপুরের এক গ্রামে। নাটকার তখন সতেরো–আঠারো বছর বয়স।…তারপর কী যেন হয়েছিল! কী যেন…মা সামান্যক্ষণের জন্য আবার অন্যমনস্ক হয়ে তারপর বলল –’ব্রাহ্মণ, হ্যাঁ ব্রাহ্মণ ছিল তারা।’
‘কারা?’
‘যারা সনাতন পণ্ডিতকে খুন করেছিল। ওদেরই যজমান।’
‘নাটকা কী করল?’
‘রামদা দিয়ে দুজনকে কেটেছিল মাঠের মধ্যে আর একজনকে টাকা দিয়ে। পুলিশ ওকে ধরতে পারত না।’
আর জানার দরকার ছিল না দীপ্তিময়ের। নাটকার গল্প সে অনেক শুনেছে। ছেলেবেলায় নাটকা একসময়ে তার বীর ছিল। জ্ঞান হওয়ার পর সে লোকটাকে চোখে দেখেনি। গল্প শুনত যে সেই বিখ্যাত নাটকার কোলে উঠেছে অনেকবার।
মনটা একটু দমে গেল দীপ্তিময়ের। লোকটা বলছে যোগাযোগের ওপরেই পৃথিবী চলছে। যোগাযোগটা খুবই অদ্ভুত।
লোকটা পরোক্ষভাবে তাকে দায়ী করে গেল। যে দীপ্তিময় সারাজীবন নিজের জন্যই যা কিছু করেছে। একা বাঁচতে চাইছে, ইত্যাদি।
দুরকম চিন্তা দীপ্তিময়কে আচ্ছন্ন করে রইল।
বড় হঠাৎ ঘটে গেল ব্যাপারটা। এরকমটা না হলেই ভালো ছিল যেন। তবু সে ভেবে দেখে লোকটাকে অপমান করে ভালোই করেছে। সেই বিখ্যাত ডাকাত নাটকা তো আর নেই। লোকটা এখন ভিখিরি। হয়তো বার বার তার কাছে উমেদার হয়ে আসত। হাত পেতে সাহায্য নিত, আর গরিবের দাম্ভিকতা থেকে মনে মনে তাকে অভিশাপ দিয়ে যেত। এই অভিমানটুকু হয়তো লোকটার কাজে লাগবে। হয়তো এই বুড়ো বয়সে পাপী লোকটা নিজের জন্য ভিক্ষে ছাড়া আরও কিছু করবে এবার।
রাতে পাশে শুয়ে রমা বলল , ‘আমার কেমন ভয়-ভয় করছে গো!’
‘ভয় কীসের!’
‘ওরকম বিশ্রী একটা লোক! বুড়ো হোক, যাই হোক এককালে ডাকাত ছিল–সে লোকটার সঙ্গে তোমার ঝগড়া হয়ে গেল…’
‘দূর! ওসব কিছুনা। লোকটা এখন ভিখিরি।’ বলে পাশ ফিরে রমাকে জড়িয়ে ধরল দীপ্তিময়। চুমু খেয়ে বলল , ‘গাড়িটা বোধহয় সামনের মাসেই পেয়ে যাব।’ পেলে সবাই মিলে খুব লম্বা একটা ট্যুর দেব, বুঝলে!’
.
অফিসের কাজ শেষ করতে প্রায়ই রাত হয়ে যায় দীপ্তিময়ের। যখন বেরোয় তখন প্রায়ই দেখা যায় সাতটা বেজে গেছে। ডালহৌসি থেকে ট্যাক্সি নিয়ে সে, হাওড়ায় আসে। ট্রেনে আসে উত্তরপাড়া।
একদিন অফিসের কাজ শেষ করে ঘড়ি দেখল দীপ্তিময়। দেখল রাত সাড়ে সাতটা। মাথা অল্প ধরে আছে। জলতেষ্টা পেয়েছে, সিগারেট খাওয়া হয়নি অনেকক্ষণ। মাথা ভরতি হাজার চিন্তা। ঘর থেকে করিডোরে বেরিয়ে এসে সে দেখল চারদিক ফাঁকা। অন্য সব সারি সারি অফিসগুলোর দরজায় তালা। শূন্য করিডোর। সে দারোয়ানকে ডাক দিয়ে অফিসের দরজা বন্ধ করতে বলল । তারপর সিঁড়ি বেয়ে চারতলা থেকে নামতে লাগল।
