লোকটি–হরেন গাঙ্গুলি একটু লাজুক হাসল, ‘তোমার ঠিকানা পাওয়া তো শক্ত কিছু নয়। কলকাতায় অনেকে চেনে, যাদবপুরে তোমার মেজপিসিমা থাকেন, আমি তাঁর কাছে মাঝে-মাঝে যাই। তিনি প্রথম তোমার খোঁজ দেন। তারপর তোমার অফিসেও একদিন গিয়েছিলাম। তোমার দেখা পাইনি। তারপর ভাবলাম অফিসের চেয়ে বাসায় দেখা করাটাই ভালো; অফিসে তো তোমার কথা বলার বা শোনার সময় হবে না!’
‘কথাটা কী?’ দীপ্তিময় মৃদু গলায় জিগ্যেস করল। ছোট্ট প্রশ্ন, কিন্তু তাতেই ঘরে একটা স্তব্ধতা তৈরি হয়ে গেল। লোকটা চোখ নিচু করে রইল একটুক্ষণ।
দু’হাতে ধরা লাঠিটার কাছ বরাবর মাথা নেমে এল। দু-হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরে ঢুকল। রমা, মাথায় বড় ঘোমা, পিছনে বুবুন, তার হাতে বিস্কুটের প্লেট, লোকটা মাথা নুইয়ে ছিল, তার সামনে চায়ের কাপ রেখে রমা একবার দীপ্তিময়ের দিকে চাইল। তারপর লোকটাকে বলল , ফুলকাকা, আপনার চা। সোজা হয়ে বসল হরেন গাঙ্গুলি–’এই যে বউমা, আজই চলে এলাম। ছুটির দিন। নইলে তো দীপুকে পাওয়া যেত না।’
‘বেশ করেছেন।’
লোকটা হাসল, ‘ওর আমাকে মনে নেই। থাকার কথাও নয়। সম্পর্ক তো তেমন কিছু ছিল না, যারা চিনত আমাকে তারা তো সব কে কোথায় ছড়িয়ে রয়েছে।’
অপ্রাসঙ্গিক কথা, দীপ্তিময় বিরক্ত হল, চোখের ইঙ্গিত করে রমাকে চলে যেতে বলল !
রমা হেসে বলল , ‘আপনারা কথা বলুন। আমি আসি।’
রমা চলে গেলে হরেন গাঙ্গুলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে বসল, দীপ্তিময়ের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল , ‘আমার বড় অভাব চলছে দীপু। এই বুড়ো বয়সে আমি দুবেলা খেতে পাই না।’
দীপ্তিময় সোজা লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। দেশজোড়া খিদের গল্প। দীপ্তিময় অনেক শুনেছে। তাই তার কোনও ভাবান্তর হল না, সে সহজ চোখেই চেয়ে রইল।
হরেন গাঙ্গুলি আবার বলল , ‘বেশি বয়সে বিয়ে করেছিলাম। আমার দুটো ছেলে নাবালক, মেয়ের বয়স ষোলো। রোজগার বলতে গেলে কিছুই করি না। সংসারে অচল। অত সব তোমার শুনে কাজ নেই। তোমার ভালোও লাগবে না। আমি তোমার কাছে কিছু ভিক্ষে চাইতে এসেছি।’
সিগারেট ধরাতে দীপ্তিময়ের আর কোনও বাধা রইল না। এখন আর লোকটাকে শ্রদ্ধা না করলেও চলে। কেননা লোকটা ভিক্ষে চাইছে। দীপ্তিময় সিগারেটটা টেবিলে ঠুকে জ্বালিয়ে নিল, লোকটা চেয়ে রইল।
দীপ্তিময় বলল , ‘আপনি কী করেন?’
‘একটা দোকান ছিল হালতুতে। মালপত্র কিনতে পারি না বলে সেটা প্রায় উঠে যাচ্ছে। সস্তা জিনিসপত্র বেচি। চলে না। এসব করার তো কোনও অভ্যাস নেই।’
দীপ্তিময় হঠাৎ বলল , ‘আমার খোঁজ না পেলে কী করতেন?
লোকটা চুপ করে কিছুক্ষণ তার কথার অর্থ বুঝবার চেষ্টা করল। তারপর বলল , ‘ভগবান তোমার খোঁজ দিয়েছেন। যোগাযোগের ওপরেই তো পৃথিবী চলছে।’
দীপ্তিময় হাসে। ‘আমারও কিন্তু এক সময়ে অভাব ছিল। সেসব দিনে আমি কারও কাছে, কোনও আত্মীয়ের কাছে গিয়ে ভিক্ষে করিনি। আমি যা করেছি সব নিজের পরিশ্রমে।’
লোকটা তাড়াতাড়ি বলল , ‘তা তো বটেই।’ তারপর একটু ফাঁক দিয়ে বলল , ‘তবে তোমার বয়স সহায় ছিল, আর ছিল ভাগ্য।’
দীপ্তিময় হেসে বলল , ‘দেশের কাজ করেছেন, কিন্তু নিজের কথা ভাবেননি? দেশ কি পরিবার ছাড়া?’
হরেন গাঙ্গুলি ম্লান হাসে, ‘ঠিক কথা। দেশের কাজ যে খুব একটা করতে পেরেছি তা নয়। কেবল অনেকদিন জেল খেটেছি, মার খেয়েছি। তবে সেসবের মধ্যেও একটা কিছু করেছি বোধ। হয়। আমরা নিজের জন্য কম ভাবতাম।’
‘কিন্তু এখন তো ভাবতে হচ্ছে। আপনি ভাগ্যের কথা বললেন, আমি কিন্তু ভাগ্য বলতে পরিশ্রম বুঝি।’
‘ঠিক।’ হরেন গাঙ্গুলি বুঝদারের মতো মাথা নাড়ে, ‘নিজের ভাগ্য বলতে আমরা কিছু বুঝতাম, দেশের ভাগ্য ফিরলে সকলের সঙ্গে আমারও ফিরবে। দীপু, আমরা ছেলেবেলায় যৌথ পরিবার দেখেছি, সেসব পরিবারে সকলে বড়লোক ছিল না, কিন্তু সকলেই খাবার আর আশ্রয়ের ভাগ পেত। অনেক হীনতা মন–কষাকষি বিবাদও ছিল অবশ্য। তবু আমাদের শিক্ষা ওখান। থেকেই। আমরা খুব দূর আত্মীয়তাও মেনে চলতাম। আমরা খাবার ভাগ করে খেতে শিখেছিলাম।’
মনে-মনে রেগে গেল দীপ্তিময়। নিজের পরিবারে বয়স্ক মানুষদের স্বার্থপরতা আর কুটিলতা সে অনেক দেখেছে। সে জানে এদের মহত্ব নামমাত্র। তবু সে মুখে রাগ দেখাল না, তর্কও করল না, কেবল বলল –’তারপর?’
‘স্বদেশি যখন করেছি তখনও ওইরকমই মনে হত। নিজের জন্য কিছু নয়। সকলের জন্য সব কিছু।’
‘তার ফলে কিছু হয়েছে?’
‘না’, মাথা নাড়ে হরেন গাঙ্গুলি কিছু হয়নি। স্বার্থপরতা আরও বেড়ে গেছে। তবু কিন্তু আমার দাবি থেকে যায়।’
‘কীসের দাবি।’
‘দেশের জন্য আমি করেছিলাম, দেশও আমার জন্য কিছু করুক।’
দীপ্তিময় হাসে-’তবে দেশই করুক।’
ব্যঙ্গটা হজম করে গেল হরেন গাঙ্গুলি, বলল , ‘তুমিও দেশেরই একজন।’ বলেই তাড়াতাড়ি হেসে সামলে নিল, ‘এসব ছেলেমানুষি কথা। তুমি কথা তুললে বলে এসে গেল। আমি প্রাক্তন দেশসেবী হিসেবে তো তোমার কাছে আসিনি। আত্মীয়তার জোরেও না। ছেলেবেলায় তোমাকে কোলেপিঠে করেছিলাম, এখন বুড়ো বয়সে আমি গরিব অসহায়, তুমি যদি দয়া করো সেই আশায় এসেছি।’
ভ্রূ কুঁচকে চায়ে চুমুক দিল দীপ্তিময়। দেখল লোকটা চা বিস্কুট এখনও ছোঁয়নি। সে বলল –’চা–টা খান। ঠান্ডা হয়ে গেল।’
