.
দুপুরে খেয়ে একটু ঘুমিয়েছিল দীপ্তিময়। বুবুন এসে ডাকল, ‘বাবা ওঠো তোমাকে একজন। ডাকছে।’ দীপ্তিময় জেগে দেখল বেলা পড়ে এসেছে। প্রায় অন্ধকার হয়ে এল। দুপুরে ঘুমোলে শরীর ভালো লাগে না। তারও শরীর অবশ লাগছিল। উঠে চোখে–মুখে জল দিল দীপ্তিময়। রমা উঠোনের তার থেকে জামা–কাপড় তুলছে। তাকে বলল দীপ্তিময়, ‘চা করো। বাইরে লোক এসেছে।’
বাইরের ঘরে এসে দেখল আলো জ্বালানো হয়নি। পশ্চিমের খোলা জানলা দিয়ে চমৎকার অদ্ভুত লাল একটা আলো এসে ঘরে পড়েছে। ঘরখানা যেন জ্বলছে সে আলোয়। দরজার দিকে পিঠ করে কুঁজো হয়ে বসে আছে, একজন লোক, তার ঘাড়ে চাদর হাতে লাঠি। মুখোমুখি হতেই দীপ্তিময় দেখল লোকটার চোখে ঘরের আলোর আভা পড়েছে। রাঙা দেখাচ্ছে দুখানা খুদে চোখ। ভাঙা চোয়ালে সদ্য দাড়ি কামানোর চকচকে ভাব, অযত্নের গোঁফ শুয়োপোকার মতো দেখাচ্ছে। পাতলা নাকখানা একটু বাঁকা, মাথায় অনেক কাঁচাপাকা চুল। সেই চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা। গায়ে। সাদা শার্ট, পরনে ধুতি। লোকটার বয়স পঞ্চাশ আর ষাটের মাঝামাঝি। মুখে দারিদ্র্য আর দুশ্চিন্তার ছাপ। কিন্তু তাকানোর ভঙ্গিতে কোনও বিনয় বা দীনতা নেই। দীপ্তিময়কে দেখে সোজা হয়ে বসল–‘তুমি দীপু, না?’
দীপ্তিময় বলল , ‘হ্যাঁ, আমি দীপ্তিময়।’
দীপ্তিময় লক্ষ করল লোকটার হঠাৎ সোজা হয়ে বসার মধ্যে একটা তেজের ভঙ্গি আছে। এককালে লোকটি খুবই দাম্ভিক আর দাপুটে ছিল। এখন হয়তো সংসারের নানা ধাক্কায় খানিকটা দুর্বল হয়ে গেছে।
লোকটি হেসে বলল –’আমাকে তোমার মনে নেই। একসময়ে তোমাদের ঢাকার বাড়িতে আমি যেতাম। তোমরা আমাকে ফুলকাকা বলে ডাকতে।’
একটু অবাক হল দীপ্তিময়। ফুলকাকা বলতে যে মাগুনে চেহারার একটা লোককে ভেবে রেখেছিল সে, এ ঠিক তেমন নয়। যদিও রোগা, বুড়ো এবং চেহারা আর পোশাকে বেশ গরিব, তবু রমার বর্ণনার সঙ্গে অনেকটা তফাত তার চোখে পড়ল। তফাতটা কী বা কেমন তা সে পরিষ্কার বুঝতে পারল না। তবু আছে। লোকটাকে ভালো করে দেখার জন্য সে বাতি জ্বেলে দিল। মুখোমুখি বসল। তারপর বলল , ‘রমা–আমার স্ত্রী বলছিল। কিন্তু আমার ঠিক মনে পড়ছে না।’
‘আমার নাম হরেন গাঙ্গুলি। তোমার জ্যাঠতুতো দাদা রতনের সঙ্গে আমি জগন্নাথ কলেজে কিছুদিন পড়েছি। তখন স্বদেশি যুগ, তাই আমার বেশিদূর পড়া হয়নি।’
লোকটা গাঙ্গুলি–অর্থাৎ ব্রাহ্মণ জেনে দীপ্তিময় একবার ভাবল, উঠে একটা প্রণাম করবে কিনা। তারপর দ্বিধায় পড়ে বসেই রইল। লোকটাকে সত্যিই তার মনে নেই। সে বলল , ‘সেজদা আমার চেয়ে অনেক বড় ছিলেন। প্রায় বাইশ বছরের বড়।’
লোকটা মাথা নাড়ল–’অন্য সম্পর্কে আমি তোমার কাকা। তোমরা আজকালকার ছেলে, সেসব গোলমেলে সম্পর্ক ঠিক বুঝবে না। তা ছাড়া ও সম্পর্কের আর কোনও জোর নেই। আমাদের অনেক আপন পর হয়ে গেছে।’
দীপ্তিময়ের মনে হল লোকটা সত্যিই বড় দুঃখিত হয়ে পড়ছে সম্পর্কের দুর্বলতার কথা ভেবে। সে বিরক্ত বোধ করছিল একটু। পুরোনো আমলের কথা, সম্পর্কের কথা একবার শুরু হলে সহজে থামতে চায় না। সে সহজ স্পষ্টভাবে বোঝে যে, এ লোকটার সঙ্গে তার কোনও সম্পর্কই সত্যিকারের নেই, কেবলমাত্র একই সমাজে বসবাসকারী ছাড়া। আত্মীয়তার জটিলতা এবং তার প্রয়োজন দীপ্তিময় কখনও বোঝে না। সে ধীরে ধীরে বলল –’আমার কিছুই অবশ্য জানা নেই। মনেই নেই।’
লোকটা মাথা নাড়ল—’ঠিকই তো। গতকাল রাঙা বউদিকে প্রণাম করে যাব, কথা বলে যাব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বউমা বলল , উনি কাউকেই এখন চিনতে পারেন না। কথা বললে বিব্রত হন। তাই আমি আর তাঁর সঙ্গে দেখা করিনি। উনি সুস্থ থাকলে ঠিক চিনতে পারতেন।’
দীপ্তিময় এবার হাসল–’না চিনলেই বা কি? আপনি যা বলছেন তা তো আর মিথ্যে নয়।’
দীপ্তিময়ের কথাটুকুর মধ্যে একটা কিছু ছিল যাতে লোকটা একটু চুপ করে রইল! তারপর আস্তে-আস্তে বলল ,–’না, মিথ্যে নয়। আজকাল অবশ্য অনেকে নকল পরিচয় দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’
দীপ্তিময় এ কথার উত্তর দিল না। চেয়ে রইল। লোকটা হঠাৎ ময়লা একটা রুমাল বের করে মুখটা মুছল, চোখের কোণে একটু চেপে রাখল রুমালটা, তারপর সরিয়ে নিল। তার চোখের নীচের জায়গাটা ফোলা–ফোলা। মুখে অনেক ভাঁজ আর দাগ। লোকটা হাসল একটু–’তোমাকে আমি অনেক কোলে নিয়েছি। তুমি ছেলেবেলায় দেখতে বড় সুন্দর ছিলে। মেয়েদের মতো এক গা গয়না পরিয়ে রাখা হত তোমাকে।’
সেই কবেকার দীপ্তিময়কে মনে করতে গিয়ে লোকটা অন্যমনস্ক রইল একটু। তারপর অন্যমনে বলল , ‘তখন তোমাদের টিকাটুলির বাসায় মাঝে-মাঝে যেতাম। তারপর স্বদেশি করার জন্য জেলে চলে যেতে হল। আমার ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে।’ বলেই সে হাসল, ‘আমিও, অবশ্য লোকের ওপর কম অত্যাচার করিনি।’
দীপ্তিময়ের একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করছিল। হরেন গাঙ্গুলির সামনে সেটা খাওয়া ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছিল না। যদিও একে সমীহ করার সত্যিই কোনও মানে হয় না। নিতান্তই তুচ্ছ লোকটা। অসফল। তাছাড়া সম্পর্কেও যে তেমন কিছু নয় তা বোঝা যাচ্ছে। তবু সে সিগারেটের প্যাকেট আর দেশলাই বের করে হাতের মধ্যে নাড়াচাড়া করল। লোকটা সেদিকে চেয়েও দেখল না।
দীপ্তিময় হঠাৎ জিগ্যেস করল, ‘আমার ঠিকানা কোথায় পেলেন?’
